ইলিশ আর পহেলা বৈশাখ, একে অন্যের কতটা আপন

বৈশাখ এখনও মাস পেরোনোর হিসেব মিলিয়ে আসেনি। তেতে ওঠা গরম অবশ্য এরই মধ্যে বৈশাখের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। তার চেয়েও বেশি উত্তাপ সম্ভবত ইলিশ মাছের দামে। একদিকে মধ্যবিত্তের মাসের মাঝেই পকেটে টানটান আনাগোনা করছে, অন্যদিকে ইলিশের দিকে চোখ মেলে তাকাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। আবার বছরের একটাই দিন, পান্তা-ইলিশ না হলে তো বৈশাখের শুরুটা ঠিক হয়েই উঠল না! ইলিশের সাথে বৈশাখ শুরু না করলে কি বাংলা সংস্কৃতির ব্যাকরণ এড়ানো হয়ে যায়?
সংস্কৃতি একটি নিয়ত পরিবর্তনশীল বিষয়। অঞ্চল-আবহাওয়া-সমসাময়িকতার সঙ্গে সঙ্গেই তার নিয়ত বাঁকবদল। বাংলা আর বাঙালির ইতিহাস বিস্তৃত নদীর মতোই বহমান, যেখানে সময়ে সময়ে একেকদিকে গতিপথ নিয়েছে নানা শাখা-প্রশাখা। বর্ষবরণের নানা উপলক্ষে ইলিশ নেহাতই সাম্প্রতিক ‘এলিট সংযোজন’, তবে পান্তার সঙ্গে আমাদের আদিবাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থার একান্ত সম্পর্ক বহুদিনের।
সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও পরিবর্তন
ইতিহাসে চোখ ফিরে তাকালে, মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে মূলত পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। প্রথমে এটি ‘ফসলি সন’ হিসেবে পরিচিত ছিল। নতুন বছরের বর্ষপঞ্জির নাম প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’এবং পরবর্তীতে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গাব্দ’নামে প্রচলিত হয়।
অতীতে হালখাতা (পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন হিসাব খোলা) এবং বৈশাখী মেলা ছিল এ উৎসবের প্রধান অংশ। বাংলাদেশে ১৯৬৭ সালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও ইউনেস্কো স্বীকৃত মঙ্গল শোভাযাত্রা এর অন্যতম আকর্ষণ।
পান্তা-ইলিশের এ সংস্কৃতি মূলত ঢাকার রমনায় নববর্ষ উদযাপনের সময় স্টল বসানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতি পেতে শুরু করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল সাংস্কৃতিক পরিসরের নিজস্ব পদক্ষেপ। এরই সঙ্গে মধ্যবিত্ত সমাজেও পান্তা-ইলিশের কালচারাল কাটতি হয়ে ওঠে জমজমাট। বৈশাখের সকালে খাবারের পাতে পান্তার সঙ্গে ইলিশ হয়ে ওঠে কম্পোলসারি সাবজেক্ট।
গণমাধ্যমকর্মী ও ফুডভ্লগার মীর রায়হান মাসুদ অবশ্য পহেলা বৈশাখে ইলিশের এই আবশ্যকতাকে সেভাবে প্রয়োজনীয় মনে করেন না, তবে পান্তার বিষয়ে সংস্কৃতির সংযুক্তি নিয়ে তিনি একমত। ‘পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশের যে সংস্কৃতি এটা অনেকটাই আরোপিত এবং করপোরেট কালচারের অংশ। পান্তার ক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা কথা। আমাদের দেশটা কৃষিনির্ভর, কৃষকরা গায়ে শক্তির জন্য সকাল শুরু করে রাতে ভিজিয়ে রাখা ভাত বা পান্তা দিয়ে। কাজেই এটার সাংস্কৃতিক সংযুক্তি রয়েছে।
ইলিশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিকে ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ, স্বাদ ও দামের কারণে এর আভিজাত্যও আলাদা। তাই পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ একটা আবহ নিয়ে আসে। তবে মনে রাখা দরকার, এ সময়টা মোটেও ইলিশের মৌসুম না। এ সময় ফ্রোজেন ইলিশই বেশি বিক্রি হয়।
ইলিশের দাম নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রেস্তোরাঁগুলো কখনো কখনো ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত প্যাকেজ বিক্রি করে। আর এ সময় এটি এতো হাইপে থাকে যে, অনেকেরই তা না খেলেই নয় টাইপ অনুভূতি হয়।’
বর্তমানে পান্তা-ইলিশ অনেকটাই একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে উঠেছে। রেস্টুরেন্টগুলো এই দিনে বিশেষ মেনু তৈরি করে, অনেক জায়গায় এর দামও বেশ চড়া থাকে। ফলে এটি একদিকে যেমন ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়, অন্যদিকে এটি একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আজরিন আফরিন বৈশাখের উদযাপন বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখনকার সময় আসলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয় এর উৎসবমুখরতার জন্যই। অনেকেই এখন আর পান্তা-ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতি মানেন না। আর এটা আসলে আমাদের কোনো ঐতিহাসিক সংস্কৃতি না। এটি মূলত করপোরেট সংস্কৃতির অংশ। ইলিশ মাছ বরাবরই তুলনামূলক দামি এবং উৎসবমুখী খাবার। এর সঙ্গে আমাদের গ্রামীণ বাংলার সাধারণ খাবার পান্তার কোনো সম্পর্ক নেই।’

পহেলা বৈশাখের মূল ঐতিহ্য খাবারের চেয়ে বেশি ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক। মুঘল আমলে এই দিনে খাজনা আদায় সহজ করার জন্য বাংলা সনের প্রচলন করা হয়। সেই সূত্রে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ খুলতেন, পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা শুরু করতেন। গ্রাহকদের মিষ্টি খাওয়ানো, শুভেচ্ছা বিনিময়—এসবই ছিল দিনের প্রধান আকর্ষণ। আর এর মধ্যে ইলিশের আনাগোনা সেভাবে পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাসে নজর দিলে দেখা যায়, পান্তা ভাত বাঙালির জীবনে বহু পুরোনো। গ্রামীণ বাংলায় এটি ছিল দরিদ্র ও পরিশ্রমী মানুষের সাধারণ খাবার। সারাদিন মাঠে কাজ করা কৃষকরা আগের দিনের ভাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে তা খেতেন এবং এখনও খান। এর সঙ্গে লবণ, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ বা কখনো শুঁটকি মাছের ভর্তা। গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্যও পান্তা ভাত ছিল খুবই উপকারী।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ সংরক্ষণ নিয়েও আলোচনা বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে প্রায় ১১% এবং জিডিপিতে ১% অবদান রাখে। বিশ্বের প্রায় ৮০% ইলিশের প্রাপ্তিস্থান বাংলাদেশ। পরিবেশগত পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, বাঁধ নির্মাণ, দূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে ইলিশ উৎপাদন কমেছে। বিশেষ করে জাটকা ও মা ইলিশ ধরা এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বড় সমস্যা। তাই উৎপাদন বাড়াতে সংরক্ষণ, অবৈধ জাল নিষিদ্ধ করা এবং কঠোর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

পান্তা-ইলিশ পুরোপুরি প্রাচীন বাংলা সংস্কৃতি না হলেও এটি এখন আমাদের আধুনিক সাংস্কৃতিক চর্চার একটি অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি বদলায়, নতুন কিছু যোগ হয়, পুরোনো কিছু হারিয়ে যায়; এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই পান্তা-ইলিশ আজকের অবস্থানে এসেছে।