logo
Advertisement

মুরগির রান নাকি বুকের মাংস, কোন অংশে বেশি পুষ্টি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মুরগির রান নাকি বুকের মাংস, কোন অংশে বেশি পুষ্টি

মুরগির মাংস আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত একটি অংশ। ঝোল, ভুনা, কষা কিংবা গ্রিল, নানা ভাবে মুরগি রান্না করা হয়। তবে মুরগি কিনতে গেলে অনেকেরই পছন্দ আলাদা। কেউ বুকের মাংস পছন্দ করেন, আবার কেউ রানের মাংস ছাড়া মুরগি খেতেই চান না।

Advertisement

কিন্তু স্বাদের বাইরে পুষ্টির কথা ভাবলে কোন অংশ এগিয়ে? মুরগির বুকের মাংস নাকি রানের মাংস?

সহজ উত্তর হলো, দুটিই পুষ্টিকর। তবে দুটির পুষ্টিগুণে কিছু পার্থক্য আছে। বুকের মাংসে সাধারণত প্রোটিন বেশি এবং চর্বি কম। অন্যদিকে রানের মাংসে চর্বি কিছুটা বেশি হলেও আয়রন, জিংকসহ কয়েকটি খনিজের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য উপাদানবিষয়ক তথ্যেও চামড়া ছাড়া কাঁচা মুরগির বুকের মাংসে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২২.৩ গ্রাম প্রোটিন এবং রানের মাংসে প্রায় ১৯.২ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া গেছে। রানের মাংসে চর্বির পরিমাণও বেশি।

তাহলে কোনটি আপনার জন্য ভালো? উত্তরটি নির্ভর করবে আপনার খাবারের প্রয়োজন এবং কীভাবে মাংসটি রান্না করছেন তার ওপর।

বুকের মাংসে প্রোটিন বেশি

যারা শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন নিতে চান, তাদের কাছে মুরগির বুকের মাংস বেশ জনপ্রিয়। কারণ এতে তুলনামূলক কম চর্বির সঙ্গে ভালো পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের খাদ্য উপাদানের তথ্য অনুযায়ী, চামড়া ছাড়া কাঁচা মুরগির বুকের মাংসে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২২.৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে। একই পরিমাণ পায়ের মাংসে থাকে প্রায় ১৯.২ গ্রাম।

অর্থাৎ শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বিবেচনা করলে বুকের মাংস কিছুটা এগিয়ে।

এ কারণে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, পেশি ধরে রাখতে চান কিংবা খাবারে কম চর্বির সঙ্গে বেশি প্রোটিন রাখতে চান, তাদের খাদ্যতালিকায় চামড়া ছাড়া বুকের মাংস রাখা সুবিধাজনক হতে পারে।

পায়ের মাংসে চর্বি বেশি

পায়ের মাংসের রং বুকের মাংসের তুলনায় গাঢ়। এর কারণ এতে মায়োগ্লোবিনের পরিমাণ বেশি এবং এটি মাংসপেশির এমন অংশ, যা তুলনামূলক বেশি কাজ করে।

পায়ের মাংসে সাধারণত বুকের মাংসের চেয়ে চর্বি বেশি থাকে। একটি গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না করা মুরগির রানের মাংসে প্রায় ১২.৫ গ্রাম চর্বি পাওয়া গেছে, যেখানে বুকের মাংসে ছিল প্রায় ৩.৬ গ্রাম। একই গবেষণায় পায়ের মাংসে ক্যালরিও বেশি পাওয়া গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রানের মাংস অস্বাস্থ্যকর। বরং আপনার খাবারে মোট কতটা চর্বি ও ক্যালরি যাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে ওজন কমাতে চাইলে বুকের মাংস?

অনেক ক্ষেত্রে হ্যাঁ।

ওজন কমানোর সময় সাধারণত তুলনামূলক কম ক্যালরি ও কম চর্বির খাবার বেছে নেওয়া সুবিধাজনক। সেই হিসেবে চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংস ভালো একটি বিকল্প হতে পারে।

তবে শুধু মুরগির কোন অংশ খাচ্ছেন সেটিই ওজন কমানোর বিষয়টি ঠিক করে না। মাংসটি কীভাবে রান্না করছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং এর সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একই মুরগির মাংস যদি প্রচুর তেলে ভেজে বা ঘন ঝোল ও বেশি তেল দিয়ে রান্না করা হয়, তাহলে খাবারের মোট ক্যালরি অনেক বেড়ে যেতে পারে।

রানের মাংসে আয়রন ও জিংকও আছে

রানের মাংসের একটি সুবিধা হলো এতে কিছু খনিজের পরিমাণ বুকের মাংসের তুলনায় বেশি হতে পারে।

চামড়া ও হাড় ছাড়া কাঁচা মুরগির পায়ের মাংসের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১.৩ মিলিগ্রাম আয়রন এবং ২.৭ মিলিগ্রাম জিংক পাওয়া যায়।

আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। আর জিংক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ক্ষত সারানোসহ বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজে প্রয়োজন।

তাই রানের মাংসকে শুধু বেশি চর্বিযুক্ত অংশ হিসেবে দেখলে এর অন্য পুষ্টিগুণগুলো চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

বুকের মাংসও কিন্তু পুষ্টিতে সমৃদ্ধ

বুকের মাংসে শুধু প্রোটিনই নেই। এতে সেলেনিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং নিয়াসিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।

সেলেনিয়াম শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি৬ ও নিয়াসিন শরীরের বিপাকীয় বিভিন্ন কাজে প্রয়োজন।

অর্থাৎ কম চর্বির খাবার চাইলে বুকের মাংস বেছে নেওয়া মানে পুষ্টির দিক থেকে দুর্বল কোনো খাবার খাওয়া নয়।

মুরগির চামড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

মুরগির মাংসের পুষ্টি নিয়ে কথা বলার সময় চামড়ার কথা আলাদা করে বলতে হয়।

চামড়ায় চর্বির পরিমাণ বেশি। তাই বুক বা রানের মাংসের সঙ্গে চামড়া খেলে মোট চর্বি ও ক্যালরি বেড়ে যায়। বিশেষ করে যারা ওজন, কোলেস্টেরল বা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখছেন, তাদের জন্য চামড়া ছাড়া মাংস খাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।

অবশ্য সুস্থ মানুষের জন্য মাঝে মধ্যে চামড়াসহ মুরগি খাওয়া মানেই ক্ষতিকর, এমন নয়। এখানে মূল বিষয় হলো পরিমাণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস।

রান্নার ধরনেই অনেক পার্থক্য তৈরি হয়

ধরুন, আপনি চামড়া ছাড়া বুকের মাংস কিনলেন। কিন্তু সেটি প্রচুর তেলে ভেজে খেলেন। অন্যদিকে কেউ রানের মাংস অল্প তেলে ঝোল করে খেলেন।

এ ক্ষেত্রে শুধু মাংসের অংশ দেখে কোন খাবার বেশি স্বাস্থ্যকর তা বলা কঠিন।

মুরগির মাংস রান্নার সময় অতিরিক্ত তেল, মাখন, লবণ এবং বেশি চর্বিযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করলে খাবারের ক্যালরি ও চর্বি বেড়ে যেতে পারে।

তাই স্বাস্থ্যকরভাবে খেতে চাইলে ভাজা বা অতিরিক্ত তেলযুক্ত রান্নার বদলে ঝোল, সেদ্ধ, ভাপে বা অল্প তেলে রান্না করা ভালো বিকল্প হতে পারে।

রানের মাংস কি তাহলে এড়িয়ে চলতে হবে?

একেবারেই নয়। রানের মাংস স্বাদে নরম ও রসালো হওয়ায় অনেকের পছন্দ। এতে প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন, জিংকসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও রয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য উপাদানের তথ্যেও পায়ের মাংসে প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজের উপস্থিতি দেখা যায়।

তাই শুধু চর্বি কিছুটা বেশি বলে রানের মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আপনি যদি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খান, তাহলে পরিমাণ ঠিক রেখে রানের মাংসও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে কী হবে?

শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য প্রোটিন, আয়রন, জিংকসহ বিভিন্ন পুষ্টি প্রয়োজন। মুরগির মাংস এসব পুষ্টির একটি ভালো উৎস হতে পারে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির পরিমাণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই সহজে খাওয়া যায় এমন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় থাকা দরকার।

তবে শিশু, বয়স্ক কিংবা অন্য কারও জন্য খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করা উচিত।

হৃদ্‌রোগ বা কোলেস্টেরল থাকলে কোনটি ভালো?

যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মোট চর্বি এবং বিশেষ করে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সেই হিসেবে চামড়া ছাড়া বুকের মাংস সাধারণত রানের মাংসের তুলনায় কম চর্বিযুক্ত হওয়ায় সুবিধাজনক হতে পারে। গবেষণাতেও রান্না করা রানের মাংসে বুকের মাংসের তুলনায় বেশি চর্বি ও কোলেস্টেরল পাওয়া গেছে।

তবে শুধু মুরগির অংশ বদলালেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হবে না। সারাদিনের খাবার, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধও গুরুত্বপূর্ণ।


মুরগির রান আর বুকের মাংসের মধ্যে তাহলে কে এগিয়ে?

এক কথায় কাউকে বিজয়ী বলা কঠিন।

বুকের মাংস এগিয়ে যখন-

  • বেশি প্রোটিন এবং কম চর্বি চান
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ করছেন
  • খাবারের ক্যালরি কম রাখতে চান
  • কম চর্বিযুক্ত প্রোটিনের উৎস খুঁজছেন

রানের মাংস ভালো বিকল্প যখন-

  • স্বাদ ও নরম মাংস বেশি পছন্দ করেন
  • প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন ও জিংকের মতো খনিজও পেতে চান
  • খাদ্যতালিকায় কিছুটা বেশি চর্বি রাখার সুযোগ আছে

বাংলাদেশের খাদ্য উপাদানবিষয়ক তথ্যেও দেখা যায়, বুকের মাংসে প্রোটিন কিছুটা বেশি হলেও পায়ের মাংসে চর্বি বেশি।

কোনটা কিনবেন?

বাজারে মুরগি কিনতে গিয়ে যদি আপনার মূল লক্ষ্য হয় কম চর্বিতে বেশি প্রোটিন, তাহলে বুকের মাংস বেছে নিতে পারেন।

আবার যদি স্বাদকে গুরুত্ব দেন এবং সামান্য বেশি চর্বি নিয়ে সমস্যা না থাকে, তাহলে রানের মাংসও ভালো পছন্দ।

সবচেয়ে ভালো হয়, একই অংশ প্রতিদিন না খেয়ে খাবারে বৈচিত্র্য রাখা। কখনো বুকের মাংস, কখনো রানের মাংস, সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মাছ, ডাল, ডিম ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখতে পারেন।

মুরগির রান নাকি বুকের মাংস, কোনটি বেশি পুষ্টিকর, এর একক কোনো উত্তর নেই। দুটিই পুষ্টিকর, তবে পুষ্টির ধরন ও পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে।

বুকের মাংসে সাধারণত প্রোটিন বেশি এবং চর্বি কম। রানের মাংসে চর্বি কিছুটা বেশি হলেও আয়রন, জিংকসহ কিছু খনিজের পরিমাণ ভালো।

তাই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী অংশ বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ওজন কমানো বা কম চর্বিযুক্ত খাবার চাইলে চামড়া ছাড়া বুকের মাংস সুবিধাজনক। আবার রানের মাংসও পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মুরগির কোন অংশ খাচ্ছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটা খাচ্ছেন এবং কীভাবে রান্না করছেন। কম তেল, পরিমিত লবণ এবং পর্যাপ্ত সবজি দিয়ে রান্না করলে মুরগির মাংস সহজেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবারের অংশ হতে পারে।

সূত্র:ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা