খাবারের তালিকায় ফুলকপি কেন রাখবেন, জেনে নিন এর পুষ্টিগুণ ও ৭ উপকারিতা

শীতের সবজির কথা বলতে গেলে সবার আগেই ফুলকপির নাম চলে আসে। ফুলকপির তরকারি, চপ বা ফুলকপি দিয়ে বানানো বিভিন্ন নাশতা আমাদের অনেকেরই ভীষণ পছন্দের। সুস্বাদু এই সবজিটি পুষ্টিগুণেও বেশ সমৃদ্ধ। এতে আছে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফাইবার, ফোলেট, পটাশিয়ামসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান।
কম ক্যালরিযুক্ত এই সবজিটি হজমশক্তি ভালো রাখা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা ও ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করতে পারে। তরকারি, ভাজি, স্যুপ বা সালাদ, বিভিন্নভাবে ফুলকপি খাওয়া যায়। এমনকি ভাত ও আলুর বিকল্প হিসেবেও এটি খেতে পারেন। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় ফুলকপি রাখা খুব ভালো একটি অভ্যাস।
ফুলকপিতে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?
ফুলকপি ও বাঁধাকপি অনেকটা একই জাতের সবজি। এই জাতের অন্য পরিচিত সবজির মধ্যে আছে ব্রকলি, কেল ও ব্রাসেলস স্প্রাউট। ফুলকপির সাদা অংশটি আসলে অপরিণত ফুলের কুঁড়ি, এগুলো ঘনভাবে একসঙ্গে সাজানো থাকে।

এক কাপ ফুলকপিতে প্রায় ২৮ ক্যালরি থাকে। এতে প্রায় ২ গ্রাম ফাইবার, ২ গ্রাম প্রোটিন আর ৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। এ ছাড়া ফুলকপিতে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ভিটামিন বি৬, ফোলেট, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড বা ভিটামিন বি৫, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, হাড়, স্নায়ুতন্ত্র এমনকি বিপাকীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতেও সাহায্য করে।
শুধু সাদা না, বিভিন্ন রঙের ফুলকপিও পুষ্টিগুণে ভরপুর
আমরা সাধারণত সাদা ফুলকপি বেশি দেখি। তবে বেগুনি, সবুজ ও কমলা রঙের ফুলকপিও পাওয়া যায়। এ ছাড়া রোমানেস্কো নামে এক ধরনের ফুলকপি আছে, এর ফুলের অংশগুলো দেখতে অনেকটা সর্পিল আকৃতির।

রঙিন ফুলকপিতে সাধারণ পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি আলাদা কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। যেমন- বেগুনি ফুলকপিতে অ্যান্থোসায়ানিন নামের রঞ্জক পদার্থ থাকে, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য আছে। অন্যদিকে, সবুজ ফুলকপিতে থাকে ক্লোরোফিল। যে রঙেরই হোক, সব ফুলকপিই পুষ্টিগুণের দিক থেকে ভালো।
ফুলকপি খাওয়ার ৭ স্বাস্থ্য উপকারিতা
হজমশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে
ফুলকপিতে থাকা ফাইবার হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এর বড় একটি অংশ অদ্রবণীয় ফাইবার, যা মলের পরিমাণ বাড়ায় ও নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
এর পাশাপাশি ফাইবার অন্ত্রের উপকারি ব্যাকটেরিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফুলকপি খুব বেশি ফাইবারসমৃদ্ধ সবজি না। তাই পর্যাপ্ত ফাইবার পেতে ফুলকপির পাশাপাশি অন্যান্য শাকসবজি, ফল ও শস্যও খাওয়া জরুরি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে
ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতেও সহায়তা করে, যা ত্বক, হাড়, রক্তনালি ও অন্যান্য টিস্যুর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারি
ফুলকপিতে থাকা ফাইবার হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হতে পারে। খাদ্যআঁশ রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

তাই প্রতিদিনের সুষম খাদ্যতালিকায় ফুলকপির মতো সবজি রাখলে হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য ফুলকপি ভালো একটি সবজি। এতে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ কম থাকে। পাশাপাশি ফাইবার ও পানি থাকায় ফুলকপি খেলে পেট ভরা অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যারা কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খেতে চান, তারা ভাত বা আলুর বিকল্প হিসেবে ফুলকপি খেতে পারেন। ফুলকপি কুচি কুচি করে ভাতের মতো রান্না করেও খাওয়া যায়। তবে শুধু ফুলকপি খেলেই ওজন কমবে না। এর জন্য সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম করা ও ক্যালরি গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কোষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে
ফুলকপিতে গ্লুকোসিনোলেটস ও সালফোরাফেনের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় এসব উপাদানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে। এসব যৌগের সঙ্গে কোষের সুরক্ষা ও নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমার সম্ভাব্য সম্পর্কও দেখা গেছে। তবে ফুলকপি খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

হাড় ও রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে
ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সহায়তা করে। এ ছাড়া ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, যা হাড় ও অন্যান্য টিস্যুর গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
স্নায়ুতন্ত্র ও শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে
ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন বি৬ স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, ভিটামিন বি৫ বা প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদানকে শরীরের ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।
ফুলকপি কীভাবে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়?
ফুলকপি বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া যায়। এর স্বাদ মৃদু হওয়ায় দেশি-বিদেশি নানা ধরনের খাবারের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়।
সেদ্ধ বা ভাপানো: অল্প সময় ভাপিয়ে খেলে অতিরিক্ত তেল ছাড়াই পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা সম্ভব।
তরকারি: আলু, মটরশুঁটি ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে রান্না করা যায়।
রোস্ট: অল্প তেল ও মসলা দিয়ে ওভেনে বা প্যানে রোস্ট করা যায়।
স্যুপ: ফুলকপি দিয়ে তৈরি স্যুপ পুষ্টিকর খাবারের ভালো বিকল্প।
সালাদ: কাঁচা ফুলকপি ছোট টুকরো করে সালাদে ব্যবহার করা যায়।

ভাতের বিকল্প: ফুলকপি কুচি করে ভাতের মতো রান্না করা যায়।
ফুলকপি অতিরিক্ত সময় পানিতে সেদ্ধ করলে কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন নষ্ট হতে পারে। তাই অল্প পানিতে বা ভাপে রান্না করা ভালো।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
ফুলকপি পুষ্টিকর হলেও সবার শরীর এটিকে একইভাবে গ্রহণ নাও করতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ফুলকপি খেলে পেটে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিএসের সমস্যা থাকলে ফুলকপি খাওয়ার পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে খেয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝতে হবে।
অন্যদিকে, যারা ওয়ারফারিনের মতো রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, তাদের ভিটামিন কে-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। ফুলকপি খাওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে ফুলকপি রাখতে পারেন।
তথ্যসূত্র
Soy Aire: Why cauliflower is the superstar of the vegetable world
Samaa TV: Why cauliflower deserves a place on your dinner table
