logo
Advertisement

প্রতিদিনের যে কাজে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিনের যে কাজে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে
ছবি: ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ক্যানসার রিসার্চ

গরমে ঠান্ডা কোমল পানীয়, দুপুরে বোতলজাত মিষ্টি পানীয় কিংবা ব্যায়ামের পর স্পোর্টস ড্রিংক। ব্যস্ত জীবনে এসব পানীয় অনেকেরই নিয়মিত খাবারের অংশ হয়ে গেছে। তৃষ্ণা মেটাতে বা একটু সতেজ হতে অনেকে প্রতিদিনই এসব পানীয় পান করেন।

Advertisement

কিন্তু নতুন এক গবেষণা এই অভ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়ার কারণ দেখিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত একবার চিনি মেশানো পানীয় পান করেন এমন মানুষের পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মাসে একবারেরও কম এসব পানীয় পান করেন এমন মানুষের তুলনায় বেশি ছিল।

তবে গবেষকেরা নিজেরাও সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফল থেকে মিষ্টি পানীয় সরাসরি পাকস্থলীর ক্যানসার ঘটায়, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় সম্পর্কটি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কারা ছিলেন গবেষণায়?

গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য গবেষণার ১ লাখ ১২ হাজার ২৮৪ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যের তথ্য কয়েক দশক ধরে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

এই দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণে ২৭৮ জনের পাকস্থলীর ক্যানসার শনাক্ত হয়। গবেষকেরা এরপর অংশগ্রহণকারীদের মিষ্টি পানীয় পান করার অভ্যাসের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের আগস্টে Gastro Hep Advances সাময়িকীতে।

কোন পানীয়কে মিষ্টি পানীয় বলা হয়েছে?

গবেষণায় চিনি মেশানো বিভিন্ন ধরনের পানীয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল কোমল পানীয়, লেমনেড, ফলের পানীয়, পাঞ্চ এবং স্পোর্টস ড্রিংক।

অর্থাৎ শুধু বোতলজাত কোমল পানীয় নয়, বাড়তি চিনি থাকা বিভিন্ন ধরনের পানীয়ই এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে।

শুধু পানীয়র নাম দেখে সেটিকে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ছবি: ডেইলি জ্যাং
শুধু পানীয়র নাম দেখে সেটিকে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ছবি: ডেইলি জ্যাং

অনেক সময় আমরা ফলের পানীয় বা স্পোর্টস ড্রিংককে কোমল পানীয়ের তুলনায় স্বাস্থ্যকর মনে করি। কিন্তু এসব পানীয়তেও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়তি চিনি থাকতে পারে। তাই শুধু পানীয়টির নাম দেখে সেটিকে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

দিনে একটি পানীয়তেই কেন এত ঝুঁকি?

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত একটি ৮ আউন্স বা প্রায় ২৪০ মিলিলিটারের চিনি মেশানো পানীয় পান করতেন, তাদের পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি ছিল ২ দশমিক ৪৫ গুণ।

অন্যদিকে যারা মাসে একবারেরও কম এসব পানীয় পান করতেন, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

নারীদের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি আরও বেশি ছিল। প্রতিদিন মিষ্টি পানীয় পান করা নারীদের পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি দেখা গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ ছিল। তবে পুরুষদের ফলাফল তুলনামূলকভাবে সীমান্তবর্তী ছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

চিনি কীভাবে পাকস্থলীর ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে?

গবেষকেরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি, মিষ্টি পানীয় কীভাবে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলা হয়েছে।

অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় নিয়মিত পান করলে ওজন বাড়তে পারে এবং শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টিতে পরিবর্তনের মতো বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে। এসব পরিবর্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে এগুলো এখনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। মিষ্টি পানীয় থেকে পাকস্থলীর ক্যানসার হওয়ার নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ফ্রুকটোজ নিয়েও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

গবেষণায় শুধু মিষ্টি পানীয় নয়, খাবার থেকে পাওয়া ফ্রুকটোজের পরিমাণের সঙ্গেও পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে।

ফ্রুকটোজ হলো এক ধরনের চিনি, যা বিভিন্ন মিষ্টি পানীয় ও খাবারে পাওয়া যায়। গবেষকেরা দেখেছেন, বেশি ফ্রুকটোজ গ্রহণের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক ছিল। নারীদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট ছিল।

তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি একটি সম্পর্কের তথ্য, সরাসরি কারণ প্রমাণ নয়।

কৃত্রিম মিষ্টি দেওয়া পানীয়ের ক্ষেত্রে কী দেখা গেছে?

গবেষণায় কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার করা পানীয়ও আলাদাভাবে দেখা হয়েছে।

গবেষকদের বিশ্লেষণে কৃত্রিম মিষ্টি দেওয়া পানীয় পান করার সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কৃত্রিম মিষ্টি দেওয়া সব পানীয় দীর্ঘমেয়াদে পুরোপুরি নিরাপদ। এই গবেষণায় শুধু পাকস্থলীর ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্ক দেখা হয়েছে। অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলাদা গবেষণা রয়েছে।

Helicobacter pylori-এর বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পাকস্থলীর ক্যানসারের অন্যতম পরিচিত ঝুঁকির কারণ হলো Helicobacter pylori বা H. pylori নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।

গবেষকেরা তাই দেখতে চেয়েছিলেন, মিষ্টি পানীয় পান করার সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেটি H. pylori সংক্রমণের কারণে তৈরি হয়েছে কি না।

কিছু অংশগ্রহণকারীর H. pylori সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। সেই তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও মিষ্টি পানীয় ও পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্পর্ক পুরোপুরি চলে যায়নি। তবে গবেষকদের মতে, H. pylori নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।

তাহলে কি কোমল পানীয় একেবারেই খাওয়া যাবে না?

একটি গবেষণার ফল দেখে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে মিষ্টি পানীয় নিয়মিত পান করার কোনো স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনও নেই। পানি, চিনি ছাড়া চা বা অন্যান্য কম চিনিযুক্ত পানীয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

গবেষণার প্রধান গবেষকও বলেছেন, মিষ্টি পানীয় পান করেন এমন বেশির ভাগ মানুষ চাইলে এর পরিমাণ কমাতে বা অন্য পানীয় দিয়ে বদলে নিতে পারেন। বিশেষ করে এসব পানীয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের সম্পর্ক আগে থেকেই জানা আছে।

শুধু ক্যানসার নয়, আরও অনেক ঝুঁকি আছে

মিষ্টি পানীয় নিয়ে উদ্বেগের কারণ শুধু পাকস্থলীর ক্যানসার নয়।

নিয়মিত বেশি পরিমাণে চিনি মেশানো পানীয় পান করলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে ওজন বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের এই অভ্যাস টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তৃষ্ণা পেলে পানি পান করার অভ্যাস করুন। ছবি: হেল্থলাইন
তৃষ্ণা পেলে পানি পান করার অভ্যাস করুন। ছবি: হেল্থলাইন

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি বড় পর্যালোচনাতেও চিনি মেশানো পানীয়ের সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্যানসারের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে পাকস্থলীর ক্যানসারের বিষয়ে প্রমাণ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

অর্থাৎ মিষ্টি পানীয় কমানোর পক্ষে শুধু এই একটি গবেষণাই কারণ নয়। সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনায়ও এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ভালো অভ্যাস।

গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও আছে

মনে রাখতে হবে, গবেষণার ফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।

প্রথমত, এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে মিষ্টি পানীয়ই পাকস্থলীর ক্যানসারের কারণ, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত, গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন শ্বেতাঙ্গ এবং তাদের বয়স ছিল মূলত ৩০ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে। ফলে অন্য জাতিগোষ্ঠী বা কম বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

এ ছাড়া পাকস্থলীর ক্যানসারের পারিবারিক ইতিহাস, ক্যানসারটি পাকস্থলীর ঠিক কোন অংশে হয়েছিল এবং অংশগ্রহণকারীদের আগের এন্ডোস্কোপি পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্যও সবার ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।

মিষ্টি পানীয় কমাবেন কীভাবে?

যারা প্রতিদিন কোমল পানীয় বা অন্য কোনো মিষ্টি পানীয় পান করেন, তাদের জন্য একবারে পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলানো সহজ হতে পারে।

প্রথমে প্রতিদিনের বদলে একদিন পরপর পান করতে পারেন। এরপর সপ্তাহে এক বা দুই দিনে সীমিত করার চেষ্টা করা যায়।

তৃষ্ণা পেলে পানি পান করার অভ্যাস করুন। চিনি ছাড়া চা বা অন্যান্য চিনি ছাড়া পানীয়ও বেছে নিতে পারেন।

দোকান থেকে পানীয় কেনার সময় প্যাকেটের পুষ্টি তালিকায় বাড়তি চিনির পরিমাণ দেখে নেওয়ার অভ্যাস করাও ভালো।

পাকস্থলীর ক্যানসারের লক্ষণ কী?

মিষ্টি পানীয় কমানো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হলেও, খেয়াল রাখবেন শুধু পানীয় বাদ দিলেই পাকস্থলীর ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায় না।

পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বদহজম, পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি বা ব্যথা, খাবার গিলতে সমস্যা, অল্প খেয়েই পেট ভরে যাওয়া, বমি বমি ভাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা রক্তপাতের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ অন্য অনেক সাধারণ রোগেও হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে থাকলে নিজে থেকে ক্যানসার ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তবে এই গবেষণা এখনো প্রমাণ করেনি যে মিষ্টি পানীয় সরাসরি পাকস্থলীর ক্যানসার ঘটায়। ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তারপরও নিয়মিত মিষ্টি পানীয় পান করার অভ্যাস কমানো একটি ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ এসব পানীয়ের সঙ্গে শুধু ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়, ওজন বেড়ে যাওয়া, ইনসুলিন প্রতিরোধ ও ডায়াবেটিসের মতো নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্কও রয়েছে।

তাই তৃষ্ণা মেটাতে প্রতিদিনের অভ্যাসে পানি বা চিনি ছাড়া পানীয়কে জায়গা দেওয়া এবং মিষ্টি পানীয়কে যতটা সম্ভব সীমিত রাখাই ভালো।

মূত্র: সামা নিউজ