logo

খাঁটি গুড় চিনুন ৫ উপায়ে

খাঁটি গুড় চিনুন ৫ উপায়ে
ছবি: আজ তাক বাংলা

শীত এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে গুড়ের ব্যবহার বেড়ে যায়। পিঠা-পুলি, পায়েস, মুড়ি বা রুটির সঙ্গে গুড় খেতে পছন্দ করেন অনেকেই। শুধু শীতকালেই নয়, সারা বছরই বিভিন্ন খাবারে গুড় ব্যবহার করা হয়। তবে বাজার থেকে কেনা গুড় খাঁটি কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ থাকে।

গুড়ের রং বেশি উজ্জ্বল হলেই কি তাতে ভেজাল আছে? গুড় পানিতে গুলে তলানিতে কিছু জমলে কি সেটি নকল? নাকি গন্ধ ও স্বাদ থেকেই বোঝা সম্ভব গুড় আসল না নকল?

গুড়ের রং, গন্ধ, স্বাদ ও গঠন দেখে এর গুণমান সম্পর্কে অবশ্যই কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তবে এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটিই খাঁটি বা ভেজাল হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ না। উৎপাদনের পদ্ধতি, আখ বা খেজুরের রসের ধরন এবং সংরক্ষণের অবস্থার কারণেও গুড়ের বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে। তাই গুড় কেনার সময় কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে যাচাই করা ভালো।

গুড়ের রং দেখে কী বুঝবেন?

গুড়ের রং সাধারণত সোনালি-বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি পর্যন্ত হতে পারে। আখের রস বা খেজুরের রস, উৎপাদনের পদ্ধতি এবং জ্বাল দেওয়ার মাত্রার কারণে এই রঙের পার্থক্য দেখা যায়।

কোনো গুড়ের রং অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা কৃত্রিম মনে হলে সতর্ক হতে পারেন। তবে শুধু রং দেখে তাতে কৃত্রিম রং মেশানো হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে, গাঢ় রঙের গুড় মানেই খাঁটি, এমন ধারণাও ঠিক না।

করণীয়: গুড়ের রংয়ের পাশাপাশি গন্ধ, গঠন, প্যাকেটের তথ্য এবং বিক্রেতার নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনা করুন। অস্বাভাবিক রংয়ের সঙ্গে রাসায়নিকের মতো গন্ধ বা অন্য সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে সেটি না কেনাই ভালো।

গুড়ের গন্ধ ও স্বাদ খেয়াল করুন

খাঁটি গুড়ে সাধারণত মিষ্টি ও প্রাকৃতিক ঘ্রাণ থাকে। আখের গুড়ে আখের রস জ্বাল দেওয়ার পরিচিত গন্ধ পাওয়া যেতে পারে। খেজুরের গুড়ের গন্ধও তার নিজস্ব ধরনের হয়।

অন্যদিকে, গুড়ে অস্বাভাবিক রাসায়নিক গন্ধ, তীব্র অপ্রীতিকর গন্ধ কিংবা অস্বাভাবিক স্বাদ থাকলে সতর্ক হওয়া উচিত। তবে গুড়ের ধরন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া অনুযায়ী গন্ধ ও স্বাদে স্বাভাবিক পার্থক্য থাকতে পারে।

করণীয়: সন্দেহজনক গুড় চেখে পরীক্ষা করবেন না। কেনার আগেই গন্ধে অস্বাভাবিকতা বুঝতে পারলে সেটি এড়িয়ে চলুন। স্বাভাবিক গন্ধ বা স্বাদ থাকলেই যে গুড় সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত, তা নিশ্চিত নয়।

গুড়ের গঠন ও পৃষ্ঠ পরীক্ষা করুন

গুড় শক্ত, নরম, আঠালো কিংবা কিছুটা দানাদার হতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্য গুড়ের ধরন, আর্দ্রতা ও সংরক্ষণের ওপর নির্ভর করে।

গুড়ের গায়ে অস্বাভাবিক সাদা আস্তরণ, অতিরিক্ত ময়লা, দৃশ্যমান অপরিচিত কণা কিংবা ছত্রাকের মতো কিছু দেখা গেলে সতর্ক হোন। তবে শুধু শক্ত বা নরম হওয়া দিয়ে গুড় খাঁটি কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না।

করণীয়: গুড় কেনার আগে ভালোভাবে দেখে নিন। খোলা অবস্থায় ধুলাবালি, পোকামাকড় বা আর্দ্রতার সংস্পর্শে থাকা গুড় এড়িয়ে চলুন। প্যাকেটজাত গুড় কিনলে প্যাকেট অক্ষত কি না এবং উৎপাদন ও মেয়াদসংক্রান্ত তথ্য আছে কি না, তা দেখুন।

পানিতে গুলে পরীক্ষা করলে কি ভেজাল ধরা যায়?

অনেকেই গুড়ের একটি ছোট টুকরা পানিতে গুলে দেখেন। তাদের ধারণা, খাঁটি গুড় পানিতে মিশে গেলে খুব বেশি তলানি থাকবে না, আর ভেজাল গুড়ে সাদা বা বালুর মতো পদার্থ জমবে।

এ ধরনের পরীক্ষা থেকে কিছু দৃশ্যমান অমিশ্রণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটি দিয়ে গুড় খাঁটি কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না। কারণ, গুড়ের স্বাভাবিক উপাদান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া কিংবা সংরক্ষণের কারণে পানিতে গুলে যাওয়ার ধরন ও তলানির পরিমাণ বদলাতে পারে। আবার কিছু ভেজাল চোখে দেখা নাও যেতে পারে।

তাই পানিতে গুলে তলানি পাওয়া গেলেই গুড় ভেজাল, কিংবা তলানি না থাকলেই গুড় খাঁটি, এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না।

প্যাকেট, উৎপাদক ও বিক্রেতার তথ্য যাচাই করুন

গুড় কেনার সময় শুধু পণ্যের চেহারা নয়, কোথা থেকে তৈরি ও সরবরাহ করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্যাকেটজাত গুড়ের ক্ষেত্রে উৎপাদকের নাম, ঠিকানা, উপাদান, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং প্রযোজ্য খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য দেখুন। সম্ভব হলে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে গুড় কিনুন।

খোলা গুড় কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার পরিচিতি ও সংরক্ষণের পরিবেশ বিবেচনা করুন। গুড় কোথা থেকে এসেছে, তা জানা গেলে পণ্যের উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

গুড়ে ভেজাল সন্দেহ হলে কী করবেন?

গুড়ে অস্বাভাবিক গন্ধ, দৃশ্যমান অপরিচিত পদার্থ বা অন্য সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে সেটি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। শুধু ঘরোয়া পরীক্ষা করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন না।

ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কিছু নির্দিষ্ট ভেজাল শনাক্ত করার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষার পদ্ধতি প্রকাশ করেছে। তবে এসব পরীক্ষায় ব্যবহৃত রাসায়নিক, যেমন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, ঘরে নিজে থেকে ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সাহায্য নিন।

বাংলাদেশে সন্দেহজনক খাদ্যপণ্য সম্পর্কে প্রয়োজন হলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ বা পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে।

(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ)

গুড় কি চিনির চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর?

গুড়কে অনেকেই চিনির তুলনায় বেশি প্রাকৃতিক বা স্বাস্থ্যকর বিকল্প মনে করেন। গুড়ে কিছু খনিজ উপাদান থাকতে পারে, তবে এর প্রধান উপাদানও চিনি বা শর্করা। তাই গুড় খেলেই বেশি পুষ্টি পাওয়া যাবে কিংবা এটি ডায়াবেটিসের জন্য নিরাপদ, এমন ধারণা ঠিক নয়।

ডায়াবেটিস থাকলে গুড় ও চিনি দুটিরই পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। গুড়ের রং বা প্রাকৃতিক উৎস দেখে এটিকে ইচ্ছেমতো খাওয়া উচিত নয়।

খাঁটি গুড় চেনার জন্য শুধু রং, গন্ধ, স্বাদ কিংবা পানিতে গুলে দেখার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এসব বিষয় থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও ভেজাল নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের প্রয়োজন হয়।

গুড় কেনার সময় পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বেছে নিন, প্যাকেটের তথ্য যাচাই করুন এবং অস্বাভাবিক গন্ধ বা দৃশ্যমান অমিশ্রণ থাকলে তা এড়িয়ে চলুন। সন্দেহজনক গুড় খাওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়াই ভালো।

সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউজ ১৮ বাংলাতে ‘Pure Jaggery Identification: ১ ভুলেই চরম ঠকবেন! দোকানদার আপনার হাতে ধরিয়ে দেবে নকল গুড়...চিনে নিন খাঁটি গুড়ের লক্ষণ’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।