মাসের শুরুতেই করুন এই ৭ কাজ, খরচ কমে বাড়বে সঞ্চয়

মাসের শুরুতে বেতন অ্যাকাউন্টে ঢোকার পর মনে হয় হাতে বেশ ভালোই টাকা আছে। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই শুরু হয় হিসাব মেলানোর পালা। কোথায় কত খরচ হলো, কেন এত টাকা কমে গেল, তা অনেক সময় বোঝাই যায় না। বাসাভাড়া, বাজার, বিল, যাতায়াতের খরচের পাশাপাশি অনলাইন কেনাকাটা, বাইরে খাওয়া বা ছোট ছোট দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়েই টান পড়তে শুরু করে।
সমস্যাটা সব সময় কম বেতনের কারণে হয়, বিষয়টা এমন না। অনেক সময় টাকা হাতে আসার পর কীভাবে সেটি ভাগ করে রাখা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে মাসের শেষটা কেমন যাবে। তাই বেতন পাওয়ার পরপরই কিছু নিয়ম মেনে চললে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং নিয়মিত সঞ্চয় করা অনেক সহজ হতে পারে।
চলুন জেনে নিই বেতন পাওয়ার পর টাকা সামলানোর সাতটি কৌশল।
বেতন হাতে এলেই আগে সঞ্চয় করুন
সাধারণত আমরা ভাবি, মাসের সব খরচ মেটানোর পর যে টাকা থাকবে, সেটাই সঞ্চয় করব। কিন্তু বাস্তবে মাসের শেষে হাতে টাকা নাও থাকতে পারে।
তাই উল্টো পদ্ধতিটি কাজে লাগানো যেতে পারে। বেতন অ্যাকাউন্টে আসার পরই একটি নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রাখুন। প্রতিবেদনে বেতনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের জন্য সরিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে সবার আয় ও খরচ এক নয়। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অঙ্ক ঠিক করুন। শুরুতে কম হলেও নিয়মিত সঞ্চয় করার অভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই টাকা এমন একটি আলাদা অ্যাকাউন্টে রাখা যেতে পারে, যেখান থেকে দৈনন্দিন খরচ করা হয় না। এতে অপ্রয়োজনে সঞ্চয়ের টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
মাসের নির্দিষ্ট খরচের টাকা আগে আলাদা রাখুন
কিছু খরচ প্রতি মাসেই করতে হয়। যেমন বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল, ঋণের কিস্তি, সন্তানের স্কুলের ফি বা নিয়মিত কোনো পরিষেবার খরচ।
বেতন পাওয়ার পরই এসব খরচের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আলাদা করে রাখুন। এতে মাসের মাঝামাঝি এসে বড় অঙ্কের কোনো বিল দেওয়ার সময় হঠাৎ চাপ তৈরি হবে না।
একটি সহজ তালিকা তৈরি করতে পারেন। কোন তারিখে কোন বিল দিতে হবে এবং কত টাকা লাগবে, তা লিখে রাখুন। এতে পুরো মাসের আর্থিক চিত্রটাও পরিষ্কার থাকবে।
পুরো মাসের টাকা একসঙ্গে খরচ করবেন না
মাসের শুরুতে হাতে তুলনামূলক বেশি টাকা থাকায় অনেকেই প্রথম সপ্তাহেই বেশি খরচ করে ফেলেন। পরে মাসের শেষ দিকে প্রয়োজনীয় খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যায়।
এটি এড়াতে নির্দিষ্ট খরচ বাদ দেওয়ার পর হাতে থাকা টাকাকে চার সপ্তাহে ভাগ করে নিতে পারেন। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে কত টাকা খরচ করবেন, তার একটি সীমা ঠিক করুন।
ধরুন, প্রয়োজনীয় খরচ ও সঞ্চয় বাদ দেওয়ার পর আপনার হাতে ২০ হাজার টাকা রয়েছে। তাহলে পুরো টাকা একসঙ্গে খরচ না করে প্রতি সপ্তাহের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা ঠিক করতে পারেন।
কোনো সপ্তাহে কম খরচ হলে পরের সপ্তাহে অতিরিক্ত খরচ করার সুযোগ হিসেবে সেটিকে না দেখে সঞ্চয়ের অংশ হিসেবে রাখাই ভালো।
যে খরচগুলো চোখে পড়ে না, সেগুলো খুঁজে বের করুন
প্রতি মাসে বড় অঙ্কের খরচের হিসাব রাখা সহজ। কিন্তু ছোট ছোট নিয়মিত খরচ অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়।
যেমন এমন কোনো অনলাইন পরিষেবার মাসিক টাকা কেটে যাচ্ছে, যেটি আপনি এখন আর ব্যবহার করেন না। কোনো সংগীত বা ভিডিও দেখার পরিষেবা, জিমের সদস্যপদ কিংবা অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় কেটে নেওয়া খরচের ক্ষেত্রেও এমন হতে পারে। প্রতিবেদনে এসব অপ্রয়োজনীয় স্বয়ংক্রিয় খরচ পর্যালোচনা করে বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মাসে একবার ব্যাংক হিসাব বা কার্ডের লেনদেন দেখে নিন। কোন খাতে নিয়মিত টাকা যাচ্ছে, তা বুঝতে পারলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সহজ হবে।
অনলাইনে কিছু কিনতে চাইলে এক দিন অপেক্ষা করুন
অনলাইনে কেনাকাটা এখন খুব সহজ। পছন্দের কোনো পণ্য দেখলেই কয়েকটি ক্লিকের মধ্যে সেটি অর্ডার করা যায়। সমস্যা হলো, এই সহজ কেনাকাটাই অনেক সময় প্রয়োজনের বাইরে খরচ বাড়িয়ে দেয়।
তাই কোনো পণ্য পছন্দ হলে সঙ্গে সঙ্গে কিনে না ফেলে অন্তত ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারেন। প্রতিবেদনে এই অপেক্ষার পদ্ধতিকে অপ্রয়োজনীয় বা হঠাৎ করে কেনাকাটা ঠেকানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক দিন পর নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই কি জিনিসটি দরকার? এটি কি এখনই কিনতে হবে? নাকি শুধু ছাড় দেখে কেনার ইচ্ছা হয়েছে?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, এক দিন অপেক্ষা করার পর কেনার আগ্রহ আর আগের মতো নেই।
একটি অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিন
সব খরচ একসঙ্গে বন্ধ করার চেষ্টা করলে বরং নিয়ম মেনে চলা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তার চেয়ে প্রতি মাসে একটি অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করুন এবং সেটি কমানোর চেষ্টা করুন।
ধরুন, প্রতিদিন বাইরে থেকে চা বা কফি কেনার অভ্যাস রয়েছে। অথবা সপ্তাহে কয়েকবার খাবার অনলাইনে অর্ডার করেন। আবার অল্প দূরত্বেও গাড়ি বা রিকশা ব্যবহার করেন।
এর মধ্যে একটি অভ্যাস বেছে নিয়ে মাসে অন্তত অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিতে পারেন। প্রতিবেদনে এমন একটি অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করে তা কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ছোট একটি খরচ কম মনে হলেও পুরো বছরে তার পরিমাণ বেশ বড় হতে পারে।
মাসের শেষের জন্য আলাদা টাকা রাখুন
মাসের শেষ কয়েক দিন অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ তখন নিয়মিত খরচের পাশাপাশি হঠাৎ কোনো প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
তাই বেতন পাওয়ার পরই মাসের শেষ পাঁচ বা ছয় দিনের জন্য একটি ছোট অঙ্ক আলাদা করে রাখতে পারেন।
এই টাকা মূল সঞ্চয়ের অংশ না ধরে মাসের শেষের জরুরি খরচের জন্য রাখুন। কোনো অপ্রত্যাশিত যাতায়াতের খরচ, ওষুধ, ছোটখাটো প্রয়োজন বা অন্য জরুরি ব্যয় এলে এখান থেকে ব্যবহার করা যাবে।
তবে এই টাকা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য ব্যবহার না করাই ভালো।
সঞ্চয়ের জন্য বেতন বেশি হওয়া জরুরি নয়
অনেকেই মনে করেন, আয় একটু বাড়লেই সঞ্চয় শুরু করবেন। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে যদি খরচও একই হারে বাড়তে থাকে, তাহলে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি নাও হতে পারে।
বরং অল্প আয় থেকেই খরচের হিসাব রাখা এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আলাদা করে রাখার অভ্যাস করা ভালো। আগে থেকেই বাজেট তৈরি করলে কোন খরচ জরুরি এবং কোনটি কমানো সম্ভব, তা বোঝা সহজ হয়।
এ ক্ষেত্রে নিজের আয় অনুযায়ী বাস্তবসম্মত বাজেট করা জরুরি। অন্য কারও সঞ্চয়ের নিয়ম হুবহু নিজের জীবনে প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই।
ছোট খরচের হিসাবও রাখুন
মাস শেষে বড় খরচগুলো মনে থাকে। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট খরচের হিসাব অনেক সময় হারিয়ে যায়। অথচ চা, নাশতা, খাবার সরবরাহের খরচ, যাতায়াত বা ছোটখাটো অনলাইন কেনাকাটা মিলিয়ে মাসে উল্লেখযোগ্য টাকা চলে যেতে পারে।
তাই অন্তত এক মাস প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখার চেষ্টা করুন। মাস শেষে হিসাবটি দেখলে কোথায় বেশি টাকা যাচ্ছে, তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী খরচের সীমা ঠিক করুন।
সঞ্চয় মানে শুধু টাকা জমিয়ে রাখা নয়
সঞ্চয়ের মূল উদ্দেশ্য শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা বাড়ানো নয়। হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরির সমস্যা, পরিবারের জরুরি প্রয়োজন বা বড় কোনো খরচ এলে যেন অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সেই নিরাপত্তাও সঞ্চয়ের একটি বড় উদ্দেশ্য।
তাই নিয়মিত সঞ্চয়ের পাশাপাশি ধীরে ধীরে একটি জরুরি তহবিল তৈরি করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে সেই তহবিল কোথায় এবং কীভাবে রাখা হবে, তা নিজের আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
মাসের শুরুতেই যদি হিসাব ঠিক থাকে
বেতন পাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা প্রথম দিনটিই পুরো মাসের খরচের দিক নির্ধারণ করতে পারে। আগে সঞ্চয়, এরপর প্রয়োজনীয় বিল, তারপর সপ্তাহভিত্তিক খরচ, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং মাসের শেষের জন্য কিছু টাকা আলাদা রাখা, এই অভ্যাসগুলো অনুসরণ করলে টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সঞ্চয়কে মাসের শেষে বেঁচে যাওয়া টাকা হিসেবে না দেখে মাসের শুরুতেই পরিকল্পনার অংশ করা।
সূত্র:ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা



