মনে মনে নাকি শব্দ করে, কোন পদ্ধতিতে পড়া বেশি মনে থাকে

পড়াশোনার সময় কেউ চুপচাপ মনে মনে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, আবার কেউ বই খুলে জোরে জোরে না পড়লে ঠিকমতো বুঝতেই পারেন না। ছোটবেলা থেকেই অনেককে বলা হয়, শব্দ করে পড়লে পড়া বেশি মনে থাকে। কিন্তু সত্যিই কি শব্দ করে পড়াই সব সময় ভালো? নাকি মনে মনে পড়লেও একইভাবে শেখা সম্ভব?
আসলে দুটো পদ্ধতিরই আলাদা সুবিধা রয়েছে। আপনি কী পড়ছেন, কেন পড়ছেন এবং আপনার লক্ষ্য বোঝা, শেখা নাকি দ্রুত পড়ে শেষ করা, তার ওপর কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর হবে তা নির্ভর করতে পারে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, শব্দ করে পড়ার কিছু নির্দিষ্ট সুবিধা আছে, বিশেষ করে তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে।
মনে মনে পড়ার সুবিধা কী?
মনে মনে পড়লে প্রতিটি শব্দ মুখে উচ্চারণ করতে হয় না। ফলে সাধারণত দ্রুত পড়া যায় এবং কম সময়ে বেশি লেখা শেষ করা সম্ভব। বড় কোনো অধ্যায় পড়া, গল্প বা সংবাদ পড়া কিংবা পরীক্ষার আগে আগে পড়া বিষয় দ্রুত ঝালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর হতে পারে।
তবে নীরবে পড়ার একটি সমস্যা হলো মন অন্যদিকে চলে যেতে পারে। চোখ বইয়ের পাতায় থাকলেও অনেক সময় আমরা পড়া কথাগুলো আসলে খেয়াল করি না। তাই মনে মনে পড়ার সময় নিজের বোঝাপড়া যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি অংশ পড়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই অংশে কী বলা হয়েছে? মূল বিষয়টি কী? নিজের ভাষায় উত্তর দিতে পারলে বোঝা যাবে যে শুধু চোখ বুলিয়ে যাওয়া নয়, বিষয়টিও বুঝেছেন।
শব্দ করে পড়লে কী সুবিধা হয়?
শব্দ করে পড়ার সময় চোখে লেখা দেখার পাশাপাশি নিজের কণ্ঠও শোনা যায়। অর্থাৎ একই তথ্য একাধিক উপায়ে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। গবেষণায় এই ধরনের সুবিধাকে production effect বলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে শব্দ করে পড়া তথ্য পরে মনে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে নতুন শব্দ, ভাষা শেখা, কবিতা পড়া কিংবা কঠিন কোনো বিষয় অনুশীলনের সময় শব্দ করে পড়া কাজে লাগতে পারে। ছোটদের পড়ার অভ্যাস তৈরিতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো উচ্চারণের ভুল সহজে ধরা পড়ে। বিশেষ করে ইংরেজি বা অন্য কোনো নতুন ভাষা শেখার সময় কোনো শব্দ ভুলভাবে পড়লে নিজের কানে সেটি ধরা পড়তে পারে।
শব্দ করে পড়লেই কি সব বেশি মনে থাকে?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শব্দ করে পড়লে স্মৃতিতে কিছু সুবিধা পাওয়া গেলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ধরনের পড়াশোনায় জোরে পড়াই সেরা পদ্ধতি।
২০২৪ সালে Memory & Cognition জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, শব্দ করে পড়ার ফলে পাঠ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যায়। তবে পাঠের অর্থ বা গভীর বোঝাপড়ার প্রশ্নে একই ধরনের সুবিধা সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কোনো তথ্য হুবহু মনে রাখার জন্য শব্দ করে পড়া সহায়ক হতে পারে, কিন্তু শুধু শব্দ করে পড়লেই বিষয়টি গভীরভাবে বোঝা নিশ্চিত হয় না।
তাই শুধু মুখস্থ করার জন্য জোরে পড়ার বদলে পড়ার পর বিষয়টি নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করার অভ্যাসও তৈরি করা দরকার।
মনে মনে পড়লে কি স্মৃতি কমে যায়?
এমনটা বলা ঠিক নয়। মনে মনে পড়েও ভালোভাবে শেখা ও মনে রাখা সম্ভব। বরং কোনো বড় অধ্যায় বা দীর্ঘ লেখা দ্রুত পড়ে মূল বিষয় বোঝার জন্য নীরবে পড়া সুবিধাজনক।
গবেষণাতেও দেখা যায়, শব্দ করে পড়ার স্মৃতিগত সুবিধা থাকলেও নীরবে পড়া যে অকার্যকর, এমন নয়। কোন পদ্ধতিতে কী ধরনের তথ্য পড়ছেন এবং পরে কীভাবে সেটি মনে করার চেষ্টা করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পড়া মনে রাখার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল কী?
শুধু মনে মনে পড়া বা শব্দ করে পড়ার ওপর নির্ভর না করে পড়ার সঙ্গে active recall বা সক্রিয়ভাবে মনে করার অভ্যাস যুক্ত করা যেতে পারে।
ধরুন, একটি অধ্যায়ের দুই বা তিন পৃষ্ঠা পড়লেন। এরপর বই বন্ধ করে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন-
- কী পড়লাম?
- মূল বিষয় কী?
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো কী?
- আমি কি বিষয়টি নিজের ভাষায় কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারব?
বই বন্ধ করে উত্তর দেওয়ার এই চেষ্টা পড়া তথ্যকে স্মৃতি থেকে বের করে আনার অনুশীলন তৈরি করে। এছাড়াও পড়া শেষ করার পর বই বন্ধ করে কী পড়েছেন তা মনে করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করবেন?
পরীক্ষার পড়ায় একই পদ্ধতিতে পুরো সময় পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং বিষয় অনুযায়ী পদ্ধতি বদলানো যেতে পারে।
বড় অধ্যায় দ্রুত পড়তে: মনে মনে পড়ুন।
নতুন শব্দ বা ভাষা শিখতে: কিছু অংশ শব্দ করে পড়ুন।
কঠিন সংজ্ঞা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখতে: শব্দ করে পড়ার পাশাপাশি লিখে বা নিজের ভাষায় বলার চেষ্টা করুন।
পড়া বোঝা হয়েছে কি না যাচাই করতে: বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন।
পরীক্ষার আগে দ্রুত রিভিশন দিতে: মনে মনে পড়া সুবিধাজনক হতে পারে।
এভাবে একই পড়ার মধ্যে নীরব পাঠ, শব্দ করে পড়া এবং সক্রিয়ভাবে মনে করার কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়।
শব্দ করে পড়ার আরও একটি সুবিধা, মনোযোগ ধরে রাখা
শব্দ করে পড়ার সময় নিজের কণ্ঠ, উচ্চারণ এবং পড়ার গতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মন অন্যদিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নীরবে পড়ার তুলনায় শব্দ করে পড়ার সময় অংশগ্রহণকারীদের mind wandering বা পড়ার সময় অন্য চিন্তায় চলে যাওয়ার প্রবণতা কম ছিল।
তবে সবার ক্ষেত্রে একই ফল হবে এমন নয়। পরিবেশ, পড়ার বিষয় এবং ব্যক্তিগত অভ্যাসও মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলে।
তাহলে কোন পদ্ধতিতে পড়বেন?
এর সরাসরি উত্তর হলো, দুটোই ব্যবহার করুন।
প্রথমে মনে মনে পড়ে বিষয়টির সামগ্রিক ধারণা নিতে পারেন। এরপর যে অংশ কঠিন মনে হচ্ছে বা যেটি মনে রাখা দরকার, সেটি শব্দ করে পড়ুন। পড়া শেষ হলে বই বন্ধ করে নিজের ভাষায় বিষয়টি মনে করার চেষ্টা করুন।
এভাবে পড়লে শুধু দ্রুত পড়া নয়, বিষয়টি বোঝা এবং মনে রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়। গবেষণার তথ্যও বলছে, শব্দ করে পড়ার সুবিধা মূলত নির্দিষ্ট ধরনের স্মৃতি গঠনে বেশি দেখা যায়, তাই এটিকে সব ধরনের পড়াশোনার একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে দেখার কারণ নেই।
মনে মনে পড়া ভালো নাকি শব্দ করে পড়া ভালো, এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। দ্রুত পড়া ও বড় অংশ শেষ করার জন্য নীরবে পড়া সুবিধাজনক হতে পারে। অন্যদিকে নতুন শব্দ, ভাষা, কঠিন বিষয় বা নির্দিষ্ট তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে শব্দ করে পড়া উপকারী হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পড়ার পর আপনি কতটা বুঝেছেন এবং কতটা মনে রাখতে পারছেন। তাই পড়ার পদ্ধতির সঙ্গে বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করা এবং নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করার অভ্যাস যোগ করলে শেখার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে।
সূত্র: টিভি ৯
