logo

শীতে বেশি ঘুম কেন আসে

শীতে বেশি ঘুম কেন আসে

অনেকেই লক্ষ্য করেন যে শীতকালে তাদের বেশি ঘুম পায় এবং বিছানায় কাটানো সময়ও বেড়ে যায়। এটি শুধু আলসেমির কারণে নয়, বরং আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফল। শীতকালে আলো, তাপমাত্রা এবং জীবনযাপনের ধরন বদলে যায়, যা ঘুমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই লেখায় শীতকালে ঘুমের পরিবর্তন এবং এর পেছনের কারণগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে মানুষের ঘুমের ধরনে কিছু নিয়মিত পরিবর্তন হয়। শীতের সময় ঘুমের সময়কাল প্রায় ৩ শতাংশ বাড়ে, অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১০ মিনিট বেশি ঘুম হয়। গ্রীষ্মে যেখানে মানুষ প্রায় ৮ ঘণ্টার কম সময় বিছানায় থাকে, শীতে তা বেড়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে পৌঁছায়।

শীতকালে বিশ্রামরত অবস্থায় হৃদস্পন্দন বা রেস্টিং হার্ট রেট প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি কমে যায় প্রায় ৮ শতাংশ। তবে মনে রাখা জরুরি, ঋতু যাই হোক না কেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

শীতে কেন বেশি ঘুম আসে

সূর্য তাড়াতাড়ি অস্ত যায় এবং মেলাটোনিন আগে নিঃসৃত হয়

শীতকালে দিনের আলো কম থাকে। গ্রীষ্মে যেখানে প্রায় ১২ ঘণ্টা আলো থাকে, শীতে তা নেমে আসে প্রায় ৯ ঘণ্টায়। অন্ধকার হলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন নামের ঘুমের হরমোন ছাড়ে। যেহেতু শীতে সূর্য তাড়াতাড়ি অস্ত যায়, তাই মেলাটোনিনও আগে নিঃসৃত হয়। এর ফলে শরীর আগেই ক্লান্ত অনুভব করে এবং সন্ধ্যার দিকেই ঘুম পেতে শুরু করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শীতে মানুষ বেশি আরইএম ঘুম পায়। এই ধরনের ঘুম আলোতে খুব সংবেদনশীল। আলো কম হলে আরইএম ঘুমের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

ভিটামিন ডি এর ঘাটতি

শীতকালে সূর্যের আলো কম পাওয়ায় শরীরে ভিটামিন ডি এর মাত্রা কমে যায়। ভিটামিন ডি তৈরি হওয়ার জন্য সূর্যের আলো দরকার। এই ভিটামিন কম হলে মানুষ বেশি ক্লান্ত বোধ করে এবং ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে। ফলে আরও বেশি ঘুমানোর ইচ্ছা জাগে।

ঠান্ডা আবহাওয়া

ভালো ঘুমের জন্য ঠান্ডা ও অন্ধকার ঘর খুব উপকারী। শীতকাল এমন পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করে। পরিবেশের তাপমাত্রা কমলে মস্তিষ্ক বুঝে নেয় যে ঘুমানোর সময় হয়েছে। এ কারণে শীতে ঘুমোতে যেতে কম সময় লাগে।

তবে এর উল্টো দিকও আছে। শীতে সকালে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা কম থাকলে ঘুমভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শীতের ঠান্ডা ও অন্ধকার পরিবেশ মস্তিষ্কের সেই কোষগুলোকে কম সক্রিয় করে, যেগুলো জেগে ওঠার জন্য দায়ী।

শীতকালীন মন খারাপ বা উইন্টার ব্লুজ

শীতকালে অনেক মানুষ মন খারাপ বা বিষণ্ণতায় ভোগেন। একে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বলা হয়। এতে ক্লান্তি, মন খারাপ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ শীতকালে প্রায় ২.৭ ঘণ্টা বেশি ঘুমান। তবে সকালের রোদ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ছুটির দিনে ঘুমের ওপর প্রভাব

ছুটির মৌসুমে ঘুমের অভ্যাসে ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। সাধারণত ছুটির দিনে মানুষ প্রায় ৩ শতাংশ বেশি সময় ঘুমায়, কিন্তু ঘুমের মান কিছুটা কমে যায়। অ্যালকোহল গ্রহণের দিনগুলোতে গভীর ঘুমের সময় কমে যায়। আবার উৎসবের পরের দিন অনেকেই দিনের বেলায় ঘুম বা ঝিমুনি দেন।

এর কারণ হলো ছুটির সময় বেশি খাওয়া দাওয়া, মানসিক চাপ, ভ্রমণ এবং সামাজিক আড্ডা। এগুলো আনন্দদায়ক হলেও শরীরকে ক্লান্ত করে তোলে। ফলে ঘুমের সময় বাড়লেও তার মান সব সময় ভালো নাও হতে পারে। বিশেষ করে অ্যালকোহল, ভারী খাবার এবং ভ্রমণ ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শীতকালে বেশি ঘুম পাওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। আলো কমে যাওয়া, ঠান্ডা আবহাওয়া, ভিটামিন ডি এর ঘাটতি এবং মানসিক পরিবর্তন এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে, ঘুমের পরিমাণের পাশাপাশি ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছর নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং পর্যাপ্ত আলো পাওয়ার চেষ্টা করলে শীতকালেও ভালো ও সতেজ ঘুম পাওয়া সম্ভব।

সূত্র : Oura