ইফতারের পর ধূমপান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

রমজান মাসে ধূমপান স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর হঠাৎ করে শরীরে ধোঁয়া ও বিষাক্ত উপাদান প্রবেশ করলে শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
ফুসফুস ও নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ ডা. মুতাজ লাবিব বলেন, রোজার সময় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা ধূমপান না করার পর অনেকেই ইফতারের পর একের পর এক সিগারেট খান। এতে শরীর একসঙ্গে অতিরিক্ত বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসে। শরীরের মানিয়ে নেওয়ার কোনো সময় থাকে না, ফলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
একই মতপ্রকাশ করেছেন পালমোনোলজি বিশেষজ্ঞ (ফুসফুস এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ) ডা. রাইজা হামিদ কে এইচ। তিনি বলেন, রোজার সময় নিকোটিন থেকে দূরে থাকার পর অনেকেই ইফতারের পর টানা স্মোকিং করেন। নিকোটিন হলো সিগারেটের আসক্তিকর উপাদান। শরীর যখন দীর্ঘ সময় এটি পায় না, তখন ইফতারের পর হঠাৎ করে বেশি পরিমাণে গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। এতে শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রমজান মাসে মুসলমানরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার, পানি ও ধূমপান থেকে বিরত থাকেন। ফলে দীর্ঘ সময় পানিশূন্যতার পর ধূমপান শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
ভেপিং ও সিসা আরও ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের পর ভেপিং বা ই-সিগারেট ব্যবহারও অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। প্রতিটি টানে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প সময়েই মস্তিষ্কে তীব্র প্রভাব পড়তে পারে। এতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে রমজানে পারিবারিক আড্ডা ও সাহরির আসরে অনেকের মধ্যে সিসা সেবনের প্রবণতা বেড়ে যায়, এমনকি যারা নিয়মিত ধূমপায়ী নন তারাও এতে যুক্ত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক ঘণ্টা সিসা টানলে প্রায় ১০০টি সিগারেটের সমান ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
রোজার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা থাকায় সিসা সেবনে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং হৃদ্স্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে। এতে প্রাণঘাতী হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সিসার পাইপ সব সময় ঠিকমতো পরিষ্কার না থাকায় সংক্রামক রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও থাকে।
রমজান হতে পারে ধূমপান ছাড়ার সুযোগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজান মাস ধূমপান ছাড়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। যেহেতু রোজার সময় দীর্ঘ ঘণ্টা ধূমপান থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়, তাই এই সময়টিকে অভ্যাস পরিবর্তনের শুরু হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রোজার সময় ধূমপান ছাড়ার উপসর্গ তুলনামূলকভাবে কম তীব্র হতে পারে। অনেকেই এ সময় সফলভাবে সিগারেট ও ভেপিং ছাড়তে সক্ষম হন। ধূমপান ত্যাগ করলে শ্বাসপ্রশ্বাস উন্নত হয়, শক্তি বাড়ে এবং ফুসফুস সুস্থ হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধূমপান একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের পেছনে তামাক একটি প্রধান কারণ। রমজান আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। তাই এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া শুধু ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ নয়, বরং সুস্থ জীবনের দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
রমজানে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর হঠাৎ করে ধূমপান শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ইফতারের পর চেইন স্মোকিং, ভেপিং বা সিসা থেকে বিরত থাকা উচিত। এর চেয়েও ভালো হলো এই মাসকে ধূমপান ছাড়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
নিজের ও পরিবারের সুস্থতার কথা চিন্তা করে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। রমজানের আত্মসংযমের শিক্ষা যদি সারা বছরের অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।
সূত্র : খালীজ টাইমস