বিশ্বের জনপ্রিয় কফিগুলোর স্বাদ কেন আলাদা, জানুন ১০ মজার তথ্য
-fa53e5-720x405.webp)
সকালের ঘুম কাটাতে এক কাপ গরম কফি, কাজের ফাঁকে ছোট্ট বিরতি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নানা মুহূর্তে কফি এখন অনেকেরই সঙ্গী। কারও পছন্দ গাঢ় কালো কফি, কারও আবার দুধ ও ফেনায় ভরা ক্যাপুচিনো। কেউ পছন্দ করেন গরম কফি, কেউ আবার বরফ দেওয়া ঠান্ডা কফি।
কফির এই বৈচিত্র্যের কারণেই বিশ্বজুড়ে এর জনপ্রিয়তা এত বেশি। শুধু পানীয় হিসেবে নয়, কফিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা সংস্কৃতি, ব্যবসা ও সামাজিক জীবন। কৃষকের বাগান থেকে শুরু করে কফি শপের কাপ পর্যন্ত একটি কফির পেছনে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ পথ।
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। কফির সঙ্গে যুক্ত কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অবদানকে সামনে আনার পাশাপাশি কফির অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য দিনটি পালিত হয়। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের আওতায় প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কফি দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বহু দেশে লাখ লাখ কৃষক ও তাদের পরিবার কফি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এক কাপ কফি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের জীবিকা।
এক কাপ কফির পেছনে কত গল্প
আমরা যে কফি বিন দেখি, সেটি আসলে কফি গাছের একটি ফলের ভেতরের বীজ। কফি গাছে ছোট ফল ধরে, যা সাধারণত কফি চেরি নামে পরিচিত। ফল পাকার পর সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা প্রক্রিয়াজাত, শুকানো, বাছাই ও ভাজা হয়। সবশেষে সেই বীজ গুঁড়া করে তৈরি হয় আমাদের পরিচিত কফি।
কফির স্বাদ শুধু বিনের ওপর নির্ভর করে না। কোন অঞ্চলে কফি উৎপাদিত হয়েছে, মাটির ধরন কেমন, কত উচ্চতায় গাছটি বেড়েছে, আবহাওয়া কেমন ছিল, বিন কীভাবে প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা হয়েছে, এমনকি কফি তৈরির সময় পানির তাপমাত্রা কেমন ছিল, এসব বিষয়ও স্বাদে প্রভাব ফেলে।
এই কারণেই একই ধরনের কফি হলেও বিভিন্ন দেশের কফির স্বাদে পার্থক্য দেখা যায়।
বিশ্বের জনপ্রিয় কফির ধরন ও স্বাদ
এসপ্রেসো
কফির জগতের অন্যতম পরিচিত পানীয় এসপ্রেসো। অল্প পরিমাণ পানির সঙ্গে উচ্চচাপে সূক্ষ্ম কফি গুঁড়া ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়।

এসপ্রেসোর স্বাদ গাঢ়, ঘন ও তীব্র। ছোট কাপে পরিবেশন করা হলেও এর স্বাদ বেশ শক্তিশালী। ক্যাপুচিনো, লাতে, আমেরিকানোসহ অনেক জনপ্রিয় কফি তৈরির ভিত্তি হলো এসপ্রেসো।
আমেরিকানো
এসপ্রেসোর সঙ্গে গরম পানি মিশিয়ে তৈরি করা হয় আমেরিকানো। এতে এসপ্রেসোর তীব্রতা কিছুটা কমে যায়।

দুধ ছাড়া কফি পছন্দ করেন, কিন্তু সরাসরি এসপ্রেসোর গাঢ় স্বাদ নিতে চান না, এমন মানুষের কাছে আমেরিকানো জনপ্রিয়। এর স্বাদ তুলনামূলকভাবে হালকা এবং পরিষ্কার।
ক্যাপুচিনো
এসপ্রেসো, গরম দুধ ও দুধের ফেনার সমন্বয়ে তৈরি হয় ক্যাপুচিনো। কফি ও দুধের ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কফি।

ক্যাপুচিনোর ওপর অনেক সময় কোকো বা দারুচিনির গুঁড়া দেওয়া হয়। দুধের ফেনার কারণে এর স্বাদ মোলায়েম লাগে।
লাতে
লাতে মূলত এসপ্রেসো ও বেশি পরিমাণ গরম দুধ দিয়ে তৈরি করা হয়। ওপরে থাকে পাতলা দুধের ফেনা।
ক্যাপুচিনোর তুলনায় লাতে সাধারণত বেশি দুধেল ও মৃদু স্বাদের। যারা খুব গাঢ় কফি পছন্দ করেন না, তাদের কাছে এটি বেশ পরিচিত একটি পছন্দ।

লাতের সঙ্গে কফি আর্টও জড়িয়ে আছে। দক্ষ বারিস্তা দুধের ফেনার ওপর ফুল, পাতা বা নানা নকশা তৈরি করেন।
মোচা
কফি ও চকলেট একসঙ্গে পছন্দ করেন যারা, তাদের জন্য মোচা বেশ আকর্ষণীয়। এসপ্রেসো, দুধ ও চকলেটের সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হয়।


এর স্বাদে কফির পাশাপাশি চকলেটের মিষ্টি ও ঘন স্বাদ পাওয়া যায়। অনেক সময় ওপরে হুইপড ক্রিম বা চকলেট ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফ্ল্যাট হোয়াইট
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কফি সংস্কৃতির সঙ্গে ফ্ল্যাট হোয়াইটের নাম জড়িয়ে আছে। এসপ্রেসোর সঙ্গে মিহি দুধের ফেনা মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়।

লাতের তুলনায় এতে কফির স্বাদ কিছুটা বেশি স্পষ্ট থাকে। একই সঙ্গে দুধের কারণে পানীয়টি মসৃণ ও মোলায়েম হয়।
তুর্কিশ কফি
তুর্কিশ কফি তৈরির পদ্ধতি অন্য অনেক কফির তুলনায় আলাদা। খুব সূক্ষ্মভাবে গুঁড়া করা কফি পানির সঙ্গে বিশেষ পাত্রে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তৈরি করা হয়।

এই কফি সাধারণত ছেঁকে নেওয়া হয় না। ফলে কাপের নিচে কফির গুঁড়া জমে থাকে। এর স্বাদ ঘন ও তীব্র। তুর্কিশ কফি শুধু পানীয় নয়, দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। ২০১৩ সালে তুর্কিশ কফি সংস্কৃতি ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
কোল্ড ব্রু
গরমের দিনে ঠান্ডা কফির জনপ্রিয়তা বাড়ে। কোল্ড ব্রু তৈরি করা হয় দীর্ঘ সময় ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে কফি গুঁড়া ভিজিয়ে রেখে।
এর স্বাদ সাধারণত মসৃণ এবং অনেকের কাছে কম তিক্ত মনে হয়। বরফ দিয়ে পরিবেশন করা হলে গরমের দিনে এটি বেশ আরামদায়ক পানীয় হয়ে ওঠে।

তবে কোল্ড ব্রু আর আইসড কফি এক নয়। আইসড কফি সাধারণত গরম পানিতে তৈরি করা কফি ঠান্ডা করে বরফের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
কফির প্রধান দুই ধরনের বিন
বিশ্বের কফির কথা বলতে গেলে আরবিকা ও রোবাস্তা নাম দুটি বারবার আসে।
আরবিকা কফি সাধারণত তুলনামূলক মসৃণ, সুগন্ধযুক্ত ও স্বাদে বৈচিত্র্যময়। ফল, ফুল, বাদাম বা চকলেটের মতো বিভিন্ন স্বাদের অনুভূতি এতে পাওয়া যেতে পারে।

রোবাস্তার স্বাদ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। এতে আরবিকার চেয়ে বেশি ক্যাফেইন থাকে এবং অনেক কফি মিশ্রণে রোবাস্তা ব্যবহার করা হয়।
কোন বিন ভালো বা খারাপ, এমন সরল সিদ্ধান্তের বদলে বলা যায়, দুই ধরনের বিনের বৈশিষ্ট্য আলাদা এবং কফির ধরন অনুযায়ী দুটিরই আলাদা ব্যবহার রয়েছে।
কফি নিয়ে অজানা ১০ তথ্য
কফি বিন আসলে বীজ: কফি বিন কোনো শস্য নয়। এটি কফি গাছের ফলের ভেতরের বীজ।
কফির ফলকে কফি চেরি বলা হয়: পাকা কফির ফল সাধারণত লাল বা হলুদ রঙের হয়। দেখতে ছোট চেরির মতো হওয়ায় একে কফি চেরি বলা হয়।
ডিক্যাফ কফিতেও ক্যাফেইন থাকতে পারে: ডিক্যাফ কফি থেকে বেশির ভাগ ক্যাফেইন সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এতে সামান্য ক্যাফেইন থাকতে পারে। তাই ডিক্যাফ মানেই পুরোপুরি ক্যাফেইনমুক্ত নয়।
কফির রং দেখেই ক্যাফেইন বোঝা যায় না: গাঢ় রঙের কফিতে যে সব সময় বেশি ক্যাফেইন থাকবে, তা ঠিক নয়। কফির বিনের ধরন, পরিমাণ এবং তৈরির পদ্ধতিও ক্যাফেইনের পরিমাণে প্রভাব ফেলে।
কফির স্বাদে ভাজার বড় ভূমিকা রয়েছে: হালকা ভাজা কফিতে ফল বা ফুলের মতো সূক্ষ্ম স্বাদ পাওয়া যেতে পারে। মাঝারি ভাজায় ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ আসে। গাঢ় ভাজায় ধোঁয়াটে ও তীব্র স্বাদ বেশি পাওয়া যায়।
কফি গাছ থেকে কাপ পর্যন্ত যেতে অনেক ধাপ পেরোয়: ফল সংগ্রহের পর বীজ আলাদা করা, শুকানো, বাছাই, ভাজা, গুঁড়া করা এবং শেষে পানীয় তৈরি করা হয়। প্রতিটি ধাপই কফির স্বাদে প্রভাব ফেলতে পারে।
কফির ঘ্রাণে অনেক ধরনের স্বাদের অনুভূতি পাওয়া যায়: ভালো কফিতে বাদাম, চকলেট, ক্যারামেল, ফল বা ফুলের মতো ঘ্রাণ ও স্বাদের অনুভূতি পাওয়া যেতে পারে। এগুলো কফিতে আলাদা উপাদান যোগ করার কারণে নয়, বরং বিনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ভাজার প্রক্রিয়ার কারণে তৈরি হয়।
কফির স্বাদে পানিও গুরুত্বপূর্ণ: কফি তৈরিতে ব্যবহৃত পানির মান ও তাপমাত্রা পানীয়টির স্বাদ বদলে দিতে পারে। তাই একই কফি ভিন্ন পানিতে তৈরি করলে স্বাদে পার্থক্য হতে পারে।
তুর্কিশ কফি ইউনেসকোর স্বীকৃতি পেয়েছে:তুর্কিশ কফি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ২০১৩ সালে ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
কফি শুধু পানীয় নয়: বিশ্বের বহু দেশে কফিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আলাদা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কফি শপে আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে ব্যবসা ও কৃষকের জীবিকা, অনেক কিছুর সঙ্গেই কফির সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের কফির গল্পও বদলাচ্ছে
কফির এই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার গল্পে বাংলাদেশও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কফি চাষের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ হচ্ছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য এলাকায় কফি চাষের উদ্যোগ কয়েক দশক ধরে চলছে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কফি চাষ নতুন করে গুরুত্ব পায়। ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কফি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কফি চাষ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

পাহাড়ি এলাকার মাটি, আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির কিছু বৈশিষ্ট্য কফি চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। তাই দেশের কফির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদনও ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে কফি চাষ বাড়ানোর জন্য শুধু গাছ লাগানো যথেষ্ট নয়। ভালো চারা, কৃষকের প্রশিক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফল সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগও প্রয়োজন। এসব সুবিধা যত বাড়বে, ততই স্থানীয় কফি উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো সহজ হবে।
কফির কাপের গল্প
এক কাপ কফি হাতে নেওয়ার সময় হয়তো আমরা শুধু তার গন্ধ আর স্বাদটুকুই অনুভব করি। কিন্তু সেই কাপের পেছনে রয়েছে কৃষকের শ্রম, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া, কফি বিনের দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিভিন্ন দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি।
আন্তর্জাতিক কফি দিবস তাই শুধু কফি পান করার দিন নয়। এই পানীয়ের সঙ্গে যুক্ত কৃষক, শ্রমিক, উৎপাদক ও কফিপ্রেমীদের কথাও মনে করার দিন।
এসপ্রেসোর তীব্রতা থেকে লাতের মোলায়েম স্বাদ, ক্যাপুচিনোর ফেনা থেকে কোল্ড ব্রুর ঠান্ডা অনুভূতি, কফির দুনিয়ায় পছন্দের শেষ নেই। আর বাংলাদেশের পাহাড়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা কফি গাছ সেই বৈচিত্র্যের গল্পে যোগ করছে নতুন একটি অধ্যায়।
সূত্র
জাতিসংঘ: International Coffee Day
International Coffee Organization
UNESCO: Turkish Coffee Culture and Tradition
কৃষি তথ্য সার্ভিস: বাংলাদেশে কফি চাষ