বিমানে কয়টি লাগেজ নেওয়া যায়, জানুন ব্যাগ ও ওজনের নিয়ম

বিমানে ভ্রমণের আগে টিকিট, পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়, তা হলো লাগেজ। কী কী নেওয়া যাবে, কত কেজি নেওয়া যাবে, কয়টি ব্যাগ নেওয়া যাবে, কোন ব্যাগ সঙ্গে রাখা যাবে আর কোনটি চেক-ইন করতে হবে, এসব নিয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা থাকে না।
অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট ওজনের মধ্যে থাকলেই যত খুশি ব্যাগ নেওয়া যাবে। আসলে বিষয়টি এমন নয়। বিমান সংস্থা ও টিকিটের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাগের সংখ্যা, প্রতিটি ব্যাগের ওজন এবং আকারের আলাদা সীমা থাকতে পারে।
এমনকি একই বিমান সংস্থার ক্ষেত্রেও গন্তব্য ও টিকিটের ধরন অনুযায়ী লাগেজের নিয়ম বদলে যেতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও যাত্রীদের টিকিটে দেওয়া লাগেজের অনুমোদনকে চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে অনুসরণ করতে বলে।
লাগেজ মূলত দুই ধরনের
বিমানে যাত্রীর লাগেজ সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
চেকড লাগেজ: বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারে জমা দিতে হয়। এগুলো বিমানের কার্গো অংশে যায় এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর লাগেজ বেল্ট থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
কেবিন লাগেজ: যাত্রী বিমানের ভেতরে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। এর ওজন ও আকার সাধারণত চেকড লাগেজের তুলনায় অনেক কম হয়।
তাই শুধু মোট কত কেজি লাগেজ নিতে পারবেন তা জানলেই হবে না। কয়টি চেকড ব্যাগ এবং কয়টি কেবিন ব্যাগ নেওয়া যাবে, সেটিও জানতে হবে।
বিমানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কয়টি লাগেজ?
এর কোনো সার্বজনীন সংখ্যা নেই।
একটি টিকিটে এক বা একাধিক চেকড ব্যাগের অনুমতি থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ভাড়ায় চেকড লাগেজের অনুমোদন নাও থাকতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, তাদের সাধারণ ইকোনমি শ্রেণির ওজনভিত্তিক নিয়মে ২০ কেজি পর্যন্ত চেকড লাগেজ সর্বোচ্চ দুই পিসে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিজনেস শ্রেণিতে ৩০ কেজি পর্যন্ত লাগেজ সর্বোচ্চ দুই পিসে নেওয়া যায়।
তবে রুটভেদে অনুমোদিত ওজন পরিবর্তিত হয়। উদাহরণ হিসেবে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ইকোনমি শ্রেণিতে ৩০ কেজি, ৪৫ কেজি বা অন্য পরিমাণের লাগেজ অনুমোদিত হতে পারে। তাই শুধু ইকোনমি বা বিজনেস শ্রেণি জানলেই সঠিক সংখ্যা বলা যায় না।
কেবিনে কতটি ব্যাগ নেওয়া যায়?
কেবিন লাগেজের নিয়মও বিমান সংস্থাভেদে আলাদা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ইকোনমি শ্রেণির যাত্রী একটি কেবিন ব্যাগ নিতে পারেন, যার সর্বোচ্চ ওজন ৭ কেজি। এর সর্বোচ্চ আকার ৫৬ × ৩৬ × ২৩ সেন্টিমিটার। বিজনেস শ্রেণিতে ১০ কেজি পর্যন্ত কেবিন লাগেজের অনুমতি রয়েছে এবং সেখানে দুই পিস পর্যন্ত নেওয়া যায়।
এ ছাড়া কিছু ব্যক্তিগত জিনিস, যেমন হাতব্যাগ, ছাতা, প্রয়োজনীয় পড়ার সামগ্রী বা কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসা সহায়ক সামগ্রী, শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্তভাবে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে অন্য বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা হতে পারে। যেমন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের নিয়ম অনুযায়ী কেবিন ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন ৭ কেজি। বিমানের ধরন অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ আকারের ক্ষেত্রেও আলাদা সীমা রয়েছে।
শুধু ওজন নয়, ব্যাগের আকারও গুরুত্বপূর্ণ
লাগেজের ওজন ঠিক থাকলেই সব সময় ব্যাগ গ্রহণ করা হবে, এমন নয়। ব্যাগের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার যোগফলেরও সীমা থাকতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাধারণ নিয়মে চেকড লাগেজের প্রতিটি পিসের তিন দিকের মোট মাপ ১৫৮ সেন্টিমিটারের বেশি হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের চেক-ইন ব্যাগের ক্ষেত্রেও তিন দিকের মোট মাপ ১৫৮ সেন্টিমিটারের মধ্যে রাখার নিয়ম রয়েছে।
তাই বাড়িতে ব্যাগ গোছানোর সময় শুধু ওজন মাপলেই হবে না। বড় স্যুটকেস হলে এর মাপও দেখে নেওয়া ভালো।
একটি ব্যাগে ৩০ কেজির বেশি রাখা যাবে?
এখানেও বিমান সংস্থার নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে একটি চেকড ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন ৩২ কেজি। এর বেশি হলে সেটিকে একক ব্যাগ হিসেবে গ্রহণ করা হবে না এবং প্রয়োজন হলে মালপত্র ভাগ করে নিতে হবে।
তবে বিনামূল্যে কত কেজি বহন করা যাবে, সেটি আলাদা বিষয়। যেমন কোনো টিকিটে ২০ কেজি অনুমোদিত থাকলে ৩২ কেজি পর্যন্ত ব্যাগ নেওয়া যাবে মানেই ৩২ কেজি বিনা মূল্যে নেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত ওজনের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হতে পারে।
অতিরিক্ত লাগেজ নিলে কী হবে?
টিকিটে অনুমোদিত ওজন বা সংখ্যার চেয়ে বেশি লাগেজ থাকলে সাধারণত অতিরিক্ত লাগেজের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বর্তমান নিয়মে অনুমোদিত সীমার বেশি লাগেজের জন্য অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য। তাদের ওয়েবসাইটে সর্বোচ্চ অতিরিক্ত ১০০ কেজি পর্যন্ত, সর্বোচ্চ পাঁচ পিসের সীমার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত লাগেজের মূল্য রুট ও অন্যান্য নিয়ম অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বিমানবন্দরে গিয়ে চমকে যাওয়ার বদলে ভ্রমণের আগেই বিমান সংস্থার ওয়েবসাইট বা টিকিটের তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
শিশুর লাগেজের নিয়মও আলাদা
শিশু যাত্রীর ক্ষেত্রে লাগেজের অনুমোদন সাধারণত আলাদা থাকে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মে শিশুর জন্য ১০ কেজি পর্যন্ত চেকড লাগেজের সুবিধা রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে ভাঁজ করা স্ট্রলার, শিশুর বহনযোগ্য আসন বা ক্যারিকটও নেওয়া যেতে পারে।
তাই শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ করলে শুধু নিজের টিকিটের লাগেজের নিয়ম দেখলে হবে না। শিশুর টিকিটের শর্তও দেখে নিতে হবে।
লাগেজে কী রাখা যাবে না?
লাগেজের ক্ষেত্রে শুধু ওজন ও সংখ্যা জানলেই হবে না। কিছু জিনিস বিমানে বহন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ নিয়ম থাকে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কিছু জিনিস কেবিন বা চেকড লাগেজে বহন করা নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ।
তাই ব্যাগ গোছানোর আগে বিমান সংস্থার নিষিদ্ধ ও সীমাবদ্ধ পণ্যের তালিকা দেখে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ধারালো বস্তু, দাহ্য পদার্থ, নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাটারি বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
লাগেজ গোছানোর সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
বিমানে ওঠার আগে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করে নিলে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ঝামেলা এড়ানো যায়।
প্রথমত, আপনার টিকিটে কত কেজি লাগেজ অনুমোদিত তা দেখুন।
দ্বিতীয়ত, কয়টি চেকড ব্যাগ নেওয়া যাবে তা নিশ্চিত করুন।
তৃতীয়ত, কেবিন ব্যাগের ওজন ও আকার মেপে নিন।
চতুর্থত, একটি ব্যাগে অতিরিক্ত ওজন না দিয়ে প্রয়োজন হলে মালপত্র একাধিক ব্যাগে ভাগ করুন।
পঞ্চমত, অতিরিক্ত লাগেজ থাকলে আগে থেকেই তার খরচ জেনে নিন।
ষষ্ঠত, যাত্রার রুট ও বিমান সংস্থা বদলালে আবার নতুন করে লাগেজের নিয়ম দেখে নিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টিকিটের তথ্য
বিমানে লাগেজ নিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ নিয়ম হলো, অন্য কারও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে নিজের টিকিটের তথ্য দেখা।
একই বিমান সংস্থায় এক রুটে যে পরিমাণ লাগেজ নেওয়া যায়, অন্য রুটে তা নাও পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ ভাড়া বা প্রচারমূলক টিকিটেও চেকড লাগেজের সুবিধা আলাদা হতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও যাত্রীদের টিকিট কেনার আগে এবং ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট লাগেজ অনুমোদন যাচাই করতে বলেছে।

উপরের হিসাবগুলো উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, সব বিমান সংস্থা ও সব রুটের জন্য একই নয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজেই জানিয়েছে, চেকড লাগেজের সঠিক অনুমোদন টিকিট, রুট, ভাড়ার ধরন ও ভ্রমণের শ্রেণির ওপর নির্ভর করে।
বিমানে সর্বোচ্চ কতটি লাগেজ নেওয়া যায়, এর সরাসরি কোনো একটি উত্তর নেই। কোথাও একাধিক চেকড ব্যাগের অনুমতি থাকে, কোথাও নির্দিষ্ট ওজনের মধ্যে একটি ব্যাগই বিনামূল্যে নেওয়া যায়। আবার কেবিন ব্যাগের সংখ্যাও বিমান সংস্থা ও শ্রেণিভেদে বদলে যায়।
তাই বিমানে ভ্রমণের আগে সবচেয়ে ভালো কাজ হলো টিকিটে দেওয়া লাগেজের অনুমোদন দেখে নেওয়া এবং বিমান সংস্থার হালনাগাদ নিয়ম মিলিয়ে নেওয়া। এতে বিমানবন্দরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া, ব্যাগ খুলে মালপত্র কমানো কিংবা ব্যাগের আকার নিয়ে সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।



