logo

সবচেয়ে সুস্বাদু মোরগ পোলাও রান্নার পদ্ধতি

সবচেয়ে সুস্বাদু মোরগ পোলাও রান্নার পদ্ধতি

বাংলাদেশে উৎসব, পার্বণ, বিয়েবাড়ি বা বিশেষ অতিথি আপ্যায়ন—যে কোনো রাজকীয় আয়োজনে খাবারের মেন্যুতে একটি নাম না থাকলেই নয়, তা হলো ‘মোরগ পোলাও’। সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান আর সুঠাম দেশি মোরগের সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারটি কেবল একটি পদ নয়, এটি বাঙালি মুসলমানদের আভিজাত্য, সংস্কৃতি এবং শত শত বছরের রন্ধনশিল্পের এক অনন্য ইতিহাস। উৎপত্তিগত দিক থেকে এটি বাংলার নিজস্ব কোনো আবিষ্কার না হলেও, কালক্রমে এটি ঢাকার নিজস্ব রন্ধন ঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল খাবার।

‘মুর্গ’ থেকে ‘মোরগ’

‘মোরগ পোলাও’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ফারসি ভাষা থেকে। প্রাচীন ফারসিতে ‘مرغ’ (মুর্গ) শব্দটি ছিল সম্পূর্ণ জেন্ডার-নিউট্রাল বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ। আদি ফারসিতে এর অর্থ ছিল যে কোনো ‘পাখি’ বা ‘পক্ষীজাতীয় প্রাণী’। ফারসি ভাষায় লিঙ্গ বোঝাতে প্রাণীর নামের সঙ্গে ‘নর’ (পুরুষ) এবং ‘মাদা’ (স্ত্রী) যুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। সে অনুযায়ী পুরুষ মুরগিকে ‘মুর্গ-এ-নর’ এবং স্ত্রী মুরগিকে ‘মুর্গ-এ-মাদা’ বলা হতো। অন্যদিকে ‘পোলাও’ (Pulao/Pilaf) শব্দটি সংস্কৃত ‘পুলাক’ বা ফারসি ‘পিলাও’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো সুগন্ধি মশলা ও মাংস দিয়ে রান্না করা ভাত।

মূল ফারসি ‘মুর্গ পোলাও’ যখন মোগলদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে, তখন স্থানীয় ভাষার প্রভাবে এর ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বাংলায় ‘মুর্গ’ শব্দটি প্রবেশ করে ধ্বনিগত বিবর্তনের মাধ্যমে পুংলিঙ্গে ‘মোরগ’ এবং স্ত্রীলিঙ্গে ‘মুরগি’ রূপ ধারণ করে। তাই ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ‘মুর্গ পোলাও’ উচ্চারণের বিবর্তনে ‘মোরগ পোলাও’ হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

কেবলই কি উচ্চারণ, নাকি রন্ধনশৈলী?

মোরগ পোলাও নামটির পেছনে কেবল ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনই দায়ী নয়, এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত রন্ধনশৈলী। নবাব বা মোগলদের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশৈলীতে এই পদটি রান্নার জন্য সত্যিই দেশি মোরগ ব্যবহার করা হতো, মুরগি নয়। পোলাওয়ের রান্নার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ‘দম’ বা ধীর আঁচে দীর্ঘক্ষণ রান্না করা। দীর্ঘক্ষণ দমে রাখার ফলে সাধারণ মুরগির মাংস গলে যায় বা হাড় থেকে খুলে আসে। কিন্তু দেশি মোরগের মাংসের পেশি সুঠাম ও শক্ত হওয়ায় তা দীর্ঘক্ষণ রান্নার পরও অটুট থাকে, গলে যায় না এবং পোলাওয়ের সুগন্ধি মশলার নির্যাস এর ভেতরে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, ঐতিহাসিকভাবে ও ব্যবহারিক কারণে এটি আক্ষরিক অর্থেই ‘মোরগের পোলাও’ ছিল।

মুর্গ পোলাওয়ের উদ্ভব

পোলাও বা পিলাফ-এর ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ঐতিহাসিকদের মতে, সুগন্ধি চাল ও মাংস দিয়ে রান্না করা এই খাবারের আদি জন্মস্থান মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া।

আলেকজান্ডারের ভোজসভা

পোলাওয়ের প্রথম লিখিত ইতিহাসের কাছাকাছি একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ৩২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন ব্যাকট্রিয়া (বর্তমান আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের অংশ) জয় করেন, তখন সেখানকার এক ভোজসভায় তাকে চাল ও মাংসের তৈরি একটি খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, যা পিলাফের আদি রূপ বলে ধারণা করা হয়। আলেকজান্ডারের সৈন্যরা এই খাবারের রেসিপি ম্যাসিডোনিয়ায় নিয়ে যায়।

ইবনে সিনার চিকিৎসাশাস্ত্র

দশম শতাব্দীতে বিখ্যাত পার্সিয়ান চিকিৎসক ও দার্শনিক ইবনে সিনা তার চিকিৎসাসংক্রান্ত বইগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পোলাওয়ের রেসিপি এবং এর পুষ্টিগুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি রোগীদের দুর্বলতা কাটাতে সুষম খাবার হিসেবে পোলাও খাওয়ার পরামর্শ দিতেন।

আব্বাসীয় খিলাফত ও পারস্য

আব্বাসীয় খিলাফতের সময় (অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী) বাগদাদ এবং পারস্যের রাজকীয় হেঁশেলগুলোতে পোলাও রান্নার ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়। সেখানেই প্রথম পাখির মাংস (যাকে ফারসিতে মুর্গ বলা হতো) এবং সুগন্ধি চালের সমন্বয়ে ‘মুর্গ পোলাও’ রান্নার প্রচলন শুরু হয়। রাজকীয় বাবুর্চিরা জাফরান, কিশমিশ, পেস্তা এবং নানাবিধ সুগন্ধি মশলা দিয়ে এই খাবারকে অভিজাত রূপ দান করেন।

উপমহাদেশ হয়ে বাংলাদেশে মোরগ পোলাও

পারস্যের এই রাজকীয় খাবারটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে মূলত মুসলিম বিজয়ী, বিশেষ করে মোগল সাম্রাজ্যের হাত ধরে। তবে এর আগে দিল্লি সালতানাতের আমলেও পোলাওয়ের প্রচলন ছিল, কিন্তু মোগলরা একে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

মুঘল হেঁশেলের অবদান

bigStoryContent

সম্রাট বাবর যখন ভারত জয় করেন, তখন তিনি মধ্য এশিয়ার খাবার খুব মিস করতেন। পরবর্তীতে সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের আমলে মোগল রাজকীয় হেঁশেল বা ‘শাহী বাওয়ারচিখানা’-তে ভারতীয় মশলার সঙ্গে পার্সিয়ান রান্নার কৌশলের এক অপূর্ব মিলন ঘটে। মোগলরা তাদের পোলাওতে ঘি, গোলাপ জল, কেওড়া জল এবং জাফরানের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। এই সময়েই রাজকীয় অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম প্রধান পদ হয়ে ওঠে মুর্গ পোলাও।

সুবাহ বাংলা ও ঢাকার নবাবদের ভূমিকা

সপ্তদশ শতাব্দীতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবেদার ইসলাম খান যখন বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকা (তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর) প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার সঙ্গে প্রচুর মোগল সৈন্য, আমলা এবং তাদের ব্যক্তিগত বাবুর্চিরা ঢাকায় আসেন। এই বাবুর্চিরাই মোগল রন্ধনশৈলীকে ঢাকার মাটিতে রোপণ করেন।

পরবর্তীতে আঠারো ও উনিশ শতকে যখন অযোধ্যা এবং মুর্শিদাবাদের পতন ঘটে, তখন সেখানকার অনেক দক্ষ খানসামা ও বাবুর্চি কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার নবাব পরিবার (নবাব আব্দুল গণি, নবাব সলিমুল্লাহ) এই বাবুর্চিদের আশ্রয় দেন। ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই মুর্গ পোলাও বা মোরগ পোলাও ঢাকার নিজস্ব আভিজাত্য লাভ করে। নবাবদের বাবুর্চিরা এর মধ্যে আলু বোখারা, মাওয়া, এবং ঢাকাইয়া পনিরের ব্যবহার শুরু করেন, যা ঢাকার মোরগ পোলাওকে দিল্লির বা লখনউয়ের পোলাও থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অতুলনীয় একটি স্বাদ প্রদান করে।

ঢাকার পঞ্চায়েত প্রথা ও ভোজে মোরগ পোলাও

উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে ঢাকার সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রিত হতো ‘পঞ্চায়েত’ প্রথার মাধ্যমে। পঞ্চায়েতের সর্দারদের যে কোনো বড় আয়োজন, বিশেষ করে বিয়ে বা সুন্নতে খতনায় (যাকে ঢাকায় ‘শাদী’ বলা হতো) মোরগ পোলাও পরিবেশন করাটা ছিল সর্দারের সম্মান ও প্রতিপত্তির পরিচায়ক। যদি কোনো সর্দারের দাওয়াতে মোরগ পোলাওয়ের বদলে সাধারণ তেহারি বা বিরিয়ানি দেওয়া হতো, তবে তা সামাজিক মর্যাদাহানিকর বলে গণ্য হতো।

আস্ত মোরগ পরিবেশন

নবাবী আমলে এবং পুরোনো ঢাকার বনেদি পরিবারগুলোতে মোরগ পোলাও পরিবেশনের একটি বিশেষ রীতি ছিল। তখন প্রতিটি প্লেটে বা খাঞ্চায় একটি করে ‘আস্ত’ মোরগ দেওয়া হতো, যা দমে রান্না হয়ে একদম নরম হয়ে থাকত, কিন্তু ভেঙে যেত না। আস্ত মোরগ পরিবেশন না করলে অতিথিরা অপমানিত বোধ করতেন। বাবুর্চির দক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল এই আস্ত মোরগটি এমনভাবে রান্না করা, যেন চামচ বা হাত ছোঁয়ালেই তা ছিঁড়ে আসে, অথচ পরিবেশনের সময় তা একদম আস্ত থাকে।

রাজনীতি ও কূটনীতিতে মোরগ পোলাও

ব্রিটিশ আমলে যখন বিভিন্ন ভাইসরয় বা উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা ঢাকা সফরে আসতেন, তখন ঢাকার নবাবরা তাদের আপ্যায়নের জন্য যে রাজকীয় ভোজের আয়োজন করতেন, তার প্রধান আকর্ষণ থাকতো এই মোরগ পোলাও। মসলাদার হলেও ইংরেজদের রসনায় এই খাবারটি অত্যন্ত সমাদৃত ছিল। এটি কেবল খাবার ছিল না, ছিল সফট ডিপ্লোম্যাসি বা নরম কূটনীতির একটি মোক্ষম হাতিয়ার।

মোরগ পোলাও রান্নার পদ্ধতি

bigStoryContent

 

মাংসের প্রস্তুতি

দেশি মোরগের মাংসকে প্রথমে টকদই, পেঁপের রস (মাংস নরম করার প্রাকৃতিক এনজাইম), আদা, রসুন, জয়ত্রী, জায়ফল এবং অন্যান্য সুগন্ধি মশলা দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ম্যারিনেট করে রাখা হয়।

পোলাওয়ের চাল

এতে ব্যবহৃত হয় সুগন্ধি কালিজিরা বা চিনিগুঁড়া চাল। চাল ঘিয়ে ভেজে নেওয়া হয় যাতে রান্নার পর প্রতিটি দানা আলাদা থাকে।

দম দেওয়া

একটি বড় হাঁড়ির (ডেকচি) নিচে মোরগের মাংস এবং ওপরে অর্ধেক সেদ্ধ করা সুগন্ধি চাল স্তরে স্তরে সাজিয়ে দেওয়া হয়। এরপর হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে সিল করে দেওয়া হয় যাতে ভেতরের ভাপ বা সুবাস বাইরে বের হতে না পারে। নিচে কয়লার মৃদু আঁচ এবং হাঁড়ির ঢাকনার ওপরে জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে ‘দম’-এ রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মোরগের নিজস্ব চর্বি, ঘি, আর মশলার সুবাস চালের প্রতিটি দানায় প্রবেশ করে।

কালের বিবর্তনে মধ্য এশিয়ার রুক্ষ প্রান্তর থেকে শুরু করে পারস্যের রাজকীয় দরবার এবং মুঘলদের সুসজ্জিত হেঁশেল পেরিয়ে, এই খাবারটি ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় যে রূপ লাভ করেছে, তা এক বিস্ময়কর রন্ধন-ইতিহাস। তবে এখন অনেক জায়গাতেই দেশি মোরগের বদলে ব্রয়লার মুরগি বা ফার্মের মুরগি দিয়ে এই পদটি রান্না করা হয়।