বোবায় ধরা কী, কীভাবে পরিত্রাণ মিলবে

গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, কিন্তু শরীর নড়ছে না। কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বুকের ওপর ভারী কিছু চাপা পড়ে আছে। অনেকেই এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে ‘বোবায় ধরা’ বলে চেনেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম স্লিপ প্যারালাইসিস (Sleep Paralysis)।
এই অবস্থায় মানুষ কিছু সময়ের জন্য শরীর নড়াচড়া বা কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট পর্যন্ত এটি স্থায়ী হয়। তবে ওই অল্প সময়টুকুতেই তীব্র ভয়, দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি এবং আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত ঘুম এবং জেগে ওঠার মাঝামাঝি একটি অবস্থা। ঘুমের একটি পর্যায় আছে, যাকে বলা হয় REM বা র্যাপিড আই মুভমেন্ট। এই পর্যায়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে এবং মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় থাকে। কিন্তু শরীরের পেশিগুলো সাময়িকভাবে শিথিল হয়ে যায়। কখনো কখনো মস্তিষ্ক জেগে উঠলেও শরীর তখনও সেই শিথিল অবস্থায় থেকে যায়। তখনই ঘটে স্লিপ প্যারালাইসিস।
কেন বোবায় ধরে?
বিভিন্ন কারণে এই সমস্যা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- অনিয়মিত ঘুম বা পর্যাপ্ত না ঘুমানো
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
- রাত জাগার অভ্যাস
- ধূমপান, মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- পরিবারে কারও একই সমস্যা থাকা
- প্যানিক ডিসঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক সমস্যা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
বোবায় ধরার সাধারণ লক্ষণ
স্লিপ প্যারালাইসিসের সময় অনেকেই কিছু নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
- বুকের ওপর চাপ অনুভব হওয়া
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- হাত-পা নাড়াতে না পারা
- কথা বলতে না পারা
- আশপাশে কেউ আছে বা ক্ষতি করতে আসছে এমন অনুভূতি
- প্রচণ্ড ভয় পাওয়া
- ঘাম হওয়া ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অবস্থা কেটে গেলে সাধারণত শরীর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
কীভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনলেই অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা কমে যায়।
নিয়মিত ঘুম জরুরি: প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন।
ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখুন: ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক হওয়া উচিত। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।
ঘুমানোর আগে সতর্কতা: ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভারী খাবার, চা-কফি, ধূমপান বা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারও কমিয়ে দিন।
মানসিক চাপ কমান: ধ্যান, হালকা ব্যায়াম বা রিল্যাক্সেশন টেকনিক মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম নয়: দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হতে পারে।
বোবায় ধরলে তখন কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আতঙ্কিত না হওয়া। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে এটি সাময়িক এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। জোর করে শরীর নাড়ানোর চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি ঘন ঘন স্লিপ প্যারালাইসিস হয়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় বা দিনের কাজকর্মে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিউরোলজিস্ট বা স্নায়ু বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হলে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন, যেমন EMG বা স্লিপ স্টাডি।
চিকিৎসকদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি গুরুতর রোগ নয়। তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে উদ্বেগ, অনিদ্রা বা মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত ঘুম ও সুস্থ জীবনযাপনই হতে পারে বোবায় ধরা থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



