Advertisement

কাপড়ের কোন দাগ কীভাবে তুলবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
কাপড়ের কোন দাগ কীভাবে তুলবেন
সব দাগ একভাবে পরিষ্কার করা যায় না।

প্রিয় পোশাকে খাবারের ঝোল পড়ে গেল, সাদা জামায় কফির দাগ, কিংবা কলমের কালি লেগে গেল হঠাৎ। এমন ঘটনা কমবেশি সবারই ঘটে। অনেক সময় দাগটি তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো সেটি আরও ছড়িয়ে যায় বা কাপড়ের রং নষ্ট হয়ে যায়।

Advertisement

আসলে সব দাগ একভাবে পরিষ্কার করা যায় না। দাগ কীসের, কাপড়টি কী ধরনের এবং দাগটি কতটা পুরোনো, তার ওপর পরিষ্কারের পদ্ধতি নির্ভর করে। আমেরিকান ক্লিনিং ইনস্টিটিউটের পরামর্শ অনুযায়ী, দাগ পড়ার পর যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটি তোলার সম্ভাবনাও তত বেশি।

তাই কাপড়ে দাগ পড়লে কী করবেন, আর কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন, তা জেনে রাখা ভালো।

দাগ পড়ার পর প্রথম কাজ কী?

দাগ পড়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেরি না করা। দাগ যত বেশি সময় কাপড়ে বসে থাকবে, ততই তা তোলা কঠিন হতে পারে।

প্রথমে কাপড়ের পরিচর্যার নির্দেশনা দেখে নিন। এরপর দাগের ধরন বুঝে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাগের ওপর জোরে ঘষাঘষি না করা। এতে দাগ ছড়িয়ে যেতে পারে এবং কাপড়ের তন্তুও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং নরম কাপড় বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে আলতো করে শুষে নেওয়া ভালো।

তেলের দাগ কীভাবে তুলবেন?

তেল বা চর্বি দাগে

তেল বা চর্বির দাগ কাপড়ে বেশ জেদি হয়ে বসে যেতে পারে। তবে দাগটি নতুন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ।

হালকা তেলের দাগের ক্ষেত্রে দাগের জায়গায় তরল কাপড় ধোয়ার সাবান বা দাগ তোলার উপযোগী পরিষ্কারক লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এরপর কাপড়ের জন্য নিরাপদ সবচেয়ে উষ্ণ পানিতে ধুয়ে ফেলুন।

দাগ বেশি হলে কাপড়ের নিচে পরিষ্কার কাগজ বা শোষক কাগজ রেখে দাগের উল্টো দিক থেকে পরিষ্কারক ব্যবহার করা যায়। এরপর কাপড় ধুয়ে নিন।

তবে কাপড় ধোয়ার আগে তার গায়ে থাকা পরিচর্যার নির্দেশনা অবশ্যই দেখে নিন।

কফি বা চায়ের দাগ

সাদা বা হালকা রঙের কাপড়ে কফি কিংবা চায়ের দাগ বেশ চোখে পড়ে। দাগটি নতুন থাকতেই পরিষ্কার করা সবচেয়ে ভালো।

প্রথমে ঠান্ডা পানিতে দাগটি ভিজিয়ে নিন বা কিছুক্ষণ পানিতে রাখুন। এরপর তরল কাপড় ধোয়ার সাবান বা দাগ তোলার উপযোগী পরিষ্কারক দিয়ে দাগটি предварে পরিষ্কার করে নিন। তারপর কাপড় ধুয়ে ফেলুন। কাপড়ের জন্য নিরাপদ হলে অক্সিজেনযুক্ত বা ক্লোরিনযুক্ত ব্লিচ ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে রঙিন কাপড়ে ব্লিচ ব্যবহারের আগে অবশ্যই কাপড়ের একটি আড়ালের অংশে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

কলমের কালির দাগ

কলমের কালি কাপড়ে লাগলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া ভালো। কালির দাগের নিচে পরিষ্কার কাগজ রেখে দাগের পেছনের দিক থেকে ঘষা নয়, বরং আলতো করে পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে হবে।

আমেরিকান ক্লিনিং ইনস্টিটিউট কালি তোলার ক্ষেত্রে অ্যালকোহল বা উপযুক্ত পরিষ্কারক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। পরিষ্কার করার সময় নিচের কাগজ বারবার বদলাতে হবে, যাতে কালি কাপড়ের অন্য অংশে না ছড়ায়। এরপর ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে কাপড় ধুতে হবে।

তবে সব ধরনের কালি পুরোপুরি তোলা সম্ভব নাও হতে পারে।

রক্তের দাগ

রক্তের দাগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, নতুন রক্তের দাগে গরম পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।

নতুন দাগ ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর কাপড় ধুয়ে ফেলুন। পুরোনো বা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগের ক্ষেত্রে এনজাইমযুক্ত পরিষ্কারক দিয়ে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে তারপর ধোয়া যেতে পারে।

গরম পানি ব্যবহার করলে রক্তের দাগ কাপড়ের তন্তুর সঙ্গে আরও শক্তভাবে বসে যেতে পারে।

চকলেটের দাগ

চকলেট কাপড়ে পড়লে প্রথমে অতিরিক্ত চকলেট আলতো করে তুলে ফেলুন। কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দেবেন না।

এরপর ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে নিন। দাগের ওপর দাগ তোলার পরিষ্কারক লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে কাপড় ধুয়ে ফেলুন। কাপড়ের জন্য নিরাপদ এমন উষ্ণ পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

কেচাপ বা টমেটোর ঝোলের দাগ

কেচাপ বা টমেটোর ঝোলের দাগে প্রথম কাজ হলো বাড়তি অংশটি তুলে ফেলা। এরপর কাপড়ের উল্টো দিক থেকে ঠান্ডা পানি দিয়ে দাগটি ধুতে হবে। এতে দাগটি কাপড়ের বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।

এরপর দাগের জায়গায় তরল কাপড় ধোয়ার সাবান লাগিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। ভালোভাবে ধুয়ে তারপর কাপড়টি স্বাভাবিক নিয়মে ধুয়ে ফেলুন।

কাপড় শুকানোর আগে দেখে নিন দাগ পুরোপুরি উঠেছে কি না। দাগ থাকা অবস্থায় শুকিয়ে ফেললে সেটি আরও স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

ঘাসের দাগ

বাইরে খেলাধুলা বা হাঁটাহাঁটির সময় কাপড়ে ঘাসের দাগ লাগতে পারে। এ ধরনের দাগের ক্ষেত্রে এনজাইমযুক্ত পরিষ্কারক দিয়ে আগে দাগটি ভিজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এরপর কাপড় ধুয়ে ফেলুন।

দাগ থেকে গেলে কাপড়ের জন্য নিরাপদ ব্লিচ ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঘামের দাগ

বিশেষ করে সাদা বা হালকা রঙের কাপড়ে ঘামের কারণে বগলের অংশে হলুদ বা বাদামি দাগ তৈরি হতে পারে।

দাগের জায়গায় কাপড় ধোয়ার পরিষ্কারক বা সাবান লাগিয়ে তারপর কাপড় ধুয়ে ফেলুন। জেদি দাগের ক্ষেত্রে এনজাইমযুক্ত পরিষ্কারক বা কাপড়ের জন্য নিরাপদ অক্সিজেনযুক্ত ব্লিচ ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রসাধনীর দাগ

লিপস্টিক বা অন্য প্রসাধনীর দাগ কাপড়ে লাগলে দাগ তোলার পরিষ্কারক, তরল কাপড় ধোয়ার সাবান বা সাবানের বার ব্যবহার করে আগে দাগটি পরিষ্কার করা যায়। এরপর কাপড় ধুয়ে ফেলুন।

দাগের ওপর জোরে ঘষাঘষি না করে ধীরে ধীরে পরিষ্কার করাই ভালো।

কাদার দাগ

কাদার দাগ নিয়ে একটি সাধারণ ভুল হলো ভেজা অবস্থাতেই ঘষে ফেলা। এতে কাদা কাপড়ের আরও গভীরে ঢুকে যেতে পারে।

কাদা শুকিয়ে গেলে প্রথমে যতটা সম্ভব শুকনো কাদা ঝেড়ে বা ব্রাশ করে তুলে ফেলুন। এরপর দাগের ধরন ও কাপড় অনুযায়ী পরিষ্কারক ব্যবহার করে কাপড় ধুয়ে নিন।

মোমের দাগ

জামাকাপড়ে মোম পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ঘষে তুলতে যাবেন না। প্রথমে মোম শক্ত হতে দিন। এরপর ভোঁতা ছুরি দিয়ে আলতো করে ওপরের মোম তুলে ফেলুন।

বাকি মোম শোষণ করার জন্য দাগের ওপর ও নিচে পরিষ্কার কাগজ রেখে হালকা গরম ইস্ত্রি করা যায়। কাগজে মোম শুষে গেলে সেটি বদলে দিতে হবে। এরপর দাগ তোলার পরিষ্কারক দিয়ে বাকি অংশ পরিষ্কার করে কাপড় ধুয়ে ফেলুন।

নেইলপলিশের দাগ

নেইলপলিশের দাগ তুলতে কিছু ক্ষেত্রে নেইলপলিশ তোলার তরল ব্যবহার করা যায়। তবে অ্যাসিটেট বা ট্রাইঅ্যাসিটেট কাপড়ে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ কাপড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই ব্যবহারের আগে কাপড়ের ধরন নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

কাদা, কালি বা তেলের দাগে সবচেয়ে বড় ভুল কী?

দাগ পড়ার পর অনেকেই প্রথমে কাপড়টি জোরে ঘষতে শুরু করেন। এটি করা উচিত নয়।

আমেরিকান ক্লিনিং ইনস্টিটিউটের মতে, দাগ ঘষলে সেটি ছড়িয়ে যেতে পারে এবং কাপড়ের তন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সম্ভব হলে দাগটি আলতো করে শুষে নেওয়া বা দাগের উল্টো দিক থেকে পরিষ্কার করা ভালো।

দাগ না উঠলে কাপড় শুকাবেন না

এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।

কাপড় ধোয়ার পর দাগ রয়ে গেছে কি না দেখে নিন। দাগ থেকে গেলে আবার পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন। দাগ পুরোপুরি ওঠার আগে কাপড় শুকিয়ে ফেলবেন না, কারণ শুকানোর তাপ দাগকে কাপড়ে আরও স্থায়ী করে দিতে পারে।

পরিষ্কারক ব্যবহারের আগে এই কাজটি করুন

কোনো নতুন পরিষ্কারক কাপড়ের বড় অংশে ব্যবহার করার আগে কাপড়ের এমন একটি জায়গায় পরীক্ষা করে নিন, যেটি সাধারণত দেখা যায় না। এতে কাপড়ের রং উঠে যাচ্ছে বা কাপড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা বোঝা যাবে।

বিশেষ করে রঙিন কাপড় বা সংবেদনশীল কাপড়ের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা জরুরি।

আর বিভিন্ন রাসায়নিক পরিষ্কারক একসঙ্গে মেশানো উচিত নয়। বিশেষ করে ক্লোরিনযুক্ত ব্লিচ ও অ্যামোনিয়া একসঙ্গে মেশালে বিপজ্জনক গ্যাস তৈরি হতে পারে।

কাপড়ে দাগ পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নিলে দাগ অনেকটাই সহজে তোলা যায়। তবে দাগের ধরন না জেনে যেকোনো পরিষ্কারক ব্যবহার করা বা জোরে ঘষে ফেলা উল্টো ক্ষতি করতে পারে।

তাই দাগ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি চেপে বা আলতোভাবে শুষে নিন, প্রয়োজন অনুযায়ী ঠান্ডা পানি ব্যবহার করুন, কাপড়ের পরিচর্যার নির্দেশনা মেনে পরিষ্কারক ব্যবহার করুন এবং দাগ পুরোপুরি ওঠার আগে কাপড় শুকাবেন না।

একটু ধৈর্য আর সঠিক পদ্ধতি মেনে চললেই প্রিয় পোশাকটি অনেক সময় আবার আগের মতো পরিষ্কার করে তোলা সম্ভব।

সূত্র: আমেরিকান ক্লিনিং ইনস্টিটিউট