logo

পুরুষদের ডানে, নারীদের বামে বোতাম কেন, এর পেছনের কারণ জানুন

পুরুষদের ডানে, নারীদের বামে বোতাম কেন, এর পেছনের কারণ জানুন
ছবি : সংগৃহীত

শার্ট বা জ্যাকেট পরার সময় কখনও কি খেয়াল করেছেন, পুরুষদের পোশাকে বোতাম ডান পাশে থাকে আর নারীদের পোশাকে বাম পাশে থাকে? বিষয়টা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা সাধারণত এটা নিয়ে ভাবিই না। কিন্তু যখনই কেউ অন্য লিঙ্গের পোশাক পরে ফেলেন, তখনই হঠাৎ করে বিষয়টা অদ্ভুত লাগতে শুরু করে। ঠিক বোতাম কোথায় যাচ্ছে, কোন দিক থেকে আটকাতে হবে, সবকিছুই যেন গুলিয়ে যায়।

এই ছোট্ট কিন্তু খুব পরিচিত বিভ্রান্তির পেছনে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস, সামাজিক শ্রেণি ব্যবস্থা, যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এবং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বোতাম আর জিপারের এই অবস্থান কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি নিয়ম, যা আজও পোশাকের ডিজাইনে প্রভাব ফেলছে।

বোতাম আর জিপারের এই নিয়ম কি সবসময় ছিল

না, এই নিয়ম খুব প্রাচীন নয়। বোতামের ব্যবহার শুরু হয়েছিল হাজার বছর আগে, তবে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা পাশে বোতাম বসানোর নিয়ম এসেছে তুলনামূলকভাবে অনেক পরে। ফ্যাশন ইতিহাসবিদ রবার্ট অসান্ট বলেন, উনিশ শতকের শেষ দিকে যখন হাতে তৈরি পোশাকের বদলে ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাক জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন থেকেই এই নিয়ম স্থায়ী আকার নিতে শুরু করে।

আরেক ফ্যাশন ইতিহাসবিদ জন স্মিথ ব্যাখ্যা করেন, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন দর্জিরা ধনী গ্রাহকদের জন্য নিয়মিত পোশাক তৈরি করতেন, তখন থেকেই ধীরে ধীরে এই ধরনের নকশাগত নিয়ম তৈরি হয়। পরে শিল্প বিপ্লবের সময় এগুলো আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

জিপারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও পরে এসেছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি প্রথম ধারণা এলেও আধুনিক জিপার বিংশ শতকের শুরুতে তৈরি হয় এবং ১৯৩০ এর দশকে এটি পোশাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তখন বোতামের নিয়ম আগে থেকেই এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে জিপারও সেই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে।

কেন পুরুষ ও নারীদের পোশাকে দিক আলাদা

এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব ও সামাজিক কারণ রয়েছে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবহার ও হাতের সুবিধা

ধারণা করা হয়, পুরুষদের অধিকাংশই ডানহাতি হওয়ায় বোতাম বা জিপার ডান পাশে থাকলে পোশাক পরা বা খোলা সহজ হয়। ইতিহাসে সৈন্যদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ অনেক সময় দ্রুত পোশাকের ভিতরে হাত নিয়ে অস্ত্র ধরার প্রয়োজন হতো। তাই ডান হাতে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমনভাবে নকশা তৈরি করা হয়েছিল।

নারীদের ক্ষেত্রে সাহায্যকারীর ভূমিকা

অন্যদিকে ধনী নারীরা একা পোশাক পরতেন না। তাদের সাহায্য করার জন্য দাসী বা পরিচারিকা থাকত। যখন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কেউ পোশাক পরাতে সাহায্য করত, তখন উল্টো দিক থেকে বোতাম আটকানো সহজ হতো। তাই নারীদের পোশাকে বোতাম বাম পাশে রাখা হতো, যাতে সাহায্যকারী ডান হাত ব্যবহার করে সহজে কাজ করতে পারে।

ফ্যাশন ইতিহাসবিদরা বলেন, সে সময় নারীদের পোশাক ছিল খুব জটিল, করসেট, একাধিক স্তরের কাপড় এবং বিভিন্ন বাঁধনের কারণে নিজে নিজে পোশাক পরা প্রায় অসম্ভব ছিল।

অন্যান্য তত্ত্বও আছে

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, নারীদের স্তন্যদান সহজ করার জন্য বোতামের অবস্থান এমন করা হয়েছিল। তবে এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।

আরেকটি তত্ত্ব বলে, ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় বাতাসে পোশাক খোলা এড়াতে দিক পরিবর্তন করা হয়েছিল, বিশেষ করে পাশের দিক দিয়ে ঘোড়ায় বসে চলার সময়। এটি কিছুটা যুক্তিসংগত মনে হলেও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

আরও একটি মজার কিন্তু কম বিশ্বাসযোগ্য ধারণা হলো, নেপোলিয়নের একটি ব্যক্তিগত রাগ থেকে এই নিয়ম এসেছে। বলা হয়, তিনি নারীদের পোশাকের দিক উল্টো করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ইতিহাসবিদরা এটিকে বেশিরভাগই কল্পকাহিনি বলে মনে করেন।

শিল্প বিপ্লবের পরে সব স্থায়ী হয়ে যায়

উনিশ শতকের শেষ দিকে যখন পোশাক তৈরির কাজ ফ্যাক্টরিভিত্তিক হয়ে যায়, তখন নিয়মগুলো আরও কঠোরভাবে মানা শুরু হয়। একই ধরনের পোশাক হাজার হাজার তৈরি করার জন্য নির্দিষ্ট ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড দরকার ছিল। ফলে পুরোনো নিয়মই স্থায়ী হয়ে যায়।

আজও কেন পরিবর্তন হয়নি

এর প্রধান কারণ অভ্যাস এবং উৎপাদন ব্যবস্থা। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে পোশাক পরে অভ্যস্ত, সেটি বদলানো সহজ নয়। পাশাপাশি পোশাক তৈরির মেশিন এবং ডিজাইন প্যাটার্নও এই নিয়ম অনুযায়ী তৈরি।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ জন স্মিথ বলেন, বড় ব্র্যান্ডগুলো এই ডিজাইন পরিবর্তন করতে আগ্রহী নয়, কারণ এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং পুরো সিস্টেম নতুন করে সাজাতে হয়।

ফ্যাশন ডিজাইনাররা এটিকে একটি ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি হিসেবেও দেখেন। অনেক পোশাকের নকশার অংশ হিসেবে জিপার বা বোতামের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজকের দিনে পরিস্থিতি

বর্তমানে অনেক ব্র্যান্ড ইউনিসেক্স পোশাক তৈরি করছে যেখানে বোতাম বা জিপারের অবস্থান মাঝামাঝি বা সমানভাবে রাখা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন বাড়ছে, তবে পুরোপুরি বদলাতে সময় লাগবে।

বোতাম আর জিপারের এই ছোট্ট পার্থক্য আসলে শতাব্দীর ইতিহাস, সামাজিক শ্রেণি ব্যবস্থা, যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এবং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির অভ্যাসের ফল। যেটা আজ আমাদের কাছে ছোট একটি অদ্ভুত বিষয় মনে হয়, সেটাই একসময় ছিল খুব বাস্তব ও প্রয়োজনভিত্তিক সিদ্ধান্তের অংশ।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট