যে রক্ত পাওয়া যায় হাতে গোনা কয়েকজনের শরীরে

মানবদেহের রক্তকে সাধারণত চারটি প্রধান গ্রুপে ভাগ করা হয় ‘এ’, ‘বি’, ‘এবি’ এবং ‘ও’। এর সঙ্গে থাকে আরএইচ (Rh) ফ্যাক্টর অনুযায়ী পজিটিভ ও নেগেটিভ ভাগ। কিন্তু এই পরিচিত ব্যবস্থার বাইরেও আছে এক অত্যন্ত বিরল ও রহস্যময় রক্তের ধরন, যাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন ব্লাড’ বা আরএইচ নাল (Rh-null) ব্লাড টাইপ।
এই রক্ত এতটাই বিরল যে পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব সত্যিই এক বিস্ময়। মেডিকেল গবেষণা অনুযায়ী, এই রক্তগ্রুপের মানুষ মাত্র কয়েক ডজনের বেশি নেই।
গোল্ডেন ব্লাড আসলে কী
গোল্ডেন ব্লাড কোনো স্বর্ণের মতো রঙের রক্ত নয়। এটি এমন একটি জেনেটিক অবস্থা, যেখানে রক্তের লাল কণিকায় থাকা সব ধরনের Rh অ্যান্টিজেন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে।
সাধারণ মানুষের রক্তে আরএইচ সিস্টেমের বহু ধরনের অ্যান্টিজেন থাকে, কিন্তু আরএইচ নাল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই পুরো আরএইচ সিস্টেমই অনুপস্থিত। এই কারণে একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিশেষ ও বিরল হিসেবে ধরা হয়।
কতটা বিরল এই রক্ত
গোল্ডেন ব্লাডকে বিশ্বের সবচেয়ে বিরল রক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন মেডিকেল সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো মানুষ এই রক্তগ্রুপ নিয়ে শনাক্ত হয়েছেন।
প্রথম এই রক্তের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৬১ সালে, অস্ট্রেলিয়ার এক আদিবাসী নারীর শরীরে।
কেন এটি ‘গোল্ডেন’ বলা হয়
এর নামের সঙ্গে সোনার কোনোই সম্পর্ক নেই। ‘গোল্ডেন’ শব্দটি এসেছে এর অসাধারণ মূল্য ও বিরলতার কারণে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে ‘লিকুইড গোল্ড’ বা তরল সোনা বলেও উল্লেখ করা হয়।
কারণ, আরএইচ নাল রক্ত এমন সকল ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে যাদের খুব বিরল আরএইচ অ্যান্টিজেন সমস্যা রয়েছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য
গোল্ডেন ব্লাডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে সব আরএইচ অ্যান্টিজেন অনুপস্থিত।
এটি অনেক ক্ষেত্রে ‘ইউনিভার্সাল ডোনার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই রক্তধারী ব্যক্তিরা অন্য কারও কাছ থেকে রক্ত নিতে পারেন না, শুধুমাত্র একই ধরনের আরএইচ নাল রক্তই তাদের জন্য নিরাপদ।
এই কারণেই এটি একদিকে যতটা মূল্যবান, অন্যদিকে ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ।
শরীরের জন্য ঝুঁকি
আরএইচ নাল রক্ত যাদের থাকে, তাদের কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে-
- হালকা থেকে মাঝারি অ্যানিমিয়া হতে পারে
- রক্তকণিকা সহজে ভেঙে যেতে পারে
- রক্তের ঘাটতি হলে উপযুক্ত দাতা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়
এই কারণে এমন ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল।
কেন এই রক্ত এত গুরুত্বপূর্ণ
চিকিৎসা বিজ্ঞানে গোল্ডেন ব্লাড অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, এটি জটিল ট্রান্সফিউশন কেসে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া বিরল আরএইচ অ্যান্টিবডি থাকা রোগীদের জন্য এটি অনেক সময় একমাত্র বিকল্প।
গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি রক্তের জেনেটিক বৈচিত্র্য বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই বিরল রক্তকে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করার উপায় নিয়েও গবেষণা করছেন। লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের বিরল রক্তের সংকট কমানো যায় এবং জরুরি চিকিৎসা সহজ করা যায়।
গোল্ডেন ব্লাড মানবদেহের এক অসাধারণ জেনেটিক ব্যতিক্রম। এটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনই চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র কয়েক ডজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ এই রক্ত আমাদের শেখায়, মানব জীববিজ্ঞানের গভীরতায় এখনও কত কিছু অজানা রয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি, ডিসকভারি, আওয়ার ব্লাড ইনস্টিটিউট, মেডিসিন নেট
.png)


