হাতে লেখা না টাইপিং, কোনটা ব্রেনের জন্য ভালো

আজকের দিনে পড়াশোনা, কাজ কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছুতেই টাইপ করার অভ্যাস বেড়েছে। মোবাইল ফোনে বার্তা লেখা, কম্পিউটারে নোট নেওয়া, অনলাইনে ফর্ম পূরণ করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখা, সবকিছুতেই কিবোর্ডের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দ্রুত লেখা যায় বলে অনেকেই হাতে লেখার অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
কিন্তু তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে দ্রুত লেখা কি সব সময় ভালো? নাকি হাতে কলমে লেখার পুরোনো অভ্যাসের আলাদা কোনো সুবিধা রয়েছে?
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে লিখলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হতে পারে। ফলে শেখা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতির সঙ্গে হাতের লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে।
হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে?
হাতে লেখাকে শুধু একটি শব্দ কাগজে তুলে ধরার কাজ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কলম দিয়ে লিখতে গেলে চোখ দিয়ে দেখা, মস্তিষ্কে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, হাতের আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া এবং অক্ষরের আকার তৈরি করা, সবকিছু একসঙ্গে করতে হয়।
এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ককে একই সময়ে একাধিক কাজ সামলাতে হয়। ফলে তথ্যের সঙ্গে শারীরিক একটি যোগসূত্র তৈরি হয়। গবেষকদের ধারণা, এই অতিরিক্ত সক্রিয়তা শেখার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে কিবোর্ডে টাইপ করার সময় একই অক্ষরের জন্য সাধারণত একই ধরনের আঙুলের চাপ ব্যবহার করা হয়। ফলে হাতে লেখার মতো অক্ষরের আকৃতি তৈরি করার সূক্ষ্ম নড়াচড়া থাকে না।
হাতে লেখা কি স্মৃতিশক্তি বাড়ায়?
গবেষণায় হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কে এমন কিছু সংযোগ সক্রিয় হতে পারে, যা শেখা ও স্মৃতি গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর একটি কারণ হতে পারে, হাতে লিখতে গেলে আমরা সাধারণত তথ্যকে একটু ধীরে প্রক্রিয়া করি। ফলে কী লিখছি, সেটি নিয়ে ভাবার সুযোগ বেশি থাকে।
ধরুন, শিক্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝাচ্ছেন। আপনি যদি প্রতিটি কথা হুবহু টাইপ করতে থাকেন, তাহলে অনেক সময় শুধু শব্দ ধরে রাখার দিকে মন চলে যেতে পারে। কিন্তু হাতে লিখতে গেলে জায়গা ও সময় সীমিত থাকায় মূল কথাগুলো বেছে নিতে হয়।
এই বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াই শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
টাইপ করা কি তাহলে খারাপ?
একেবারেই না। টাইপ করারও অনেক সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘ লেখা দ্রুত তৈরি করা যায়, ভুল সংশোধন করা সহজ এবং পরে তথ্য খুঁজে বের করাও সুবিধাজনক। অফিসের কাজ, গবেষণাপত্র, প্রতিবেদন বা দ্রুত নোট সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিবোর্ড অত্যন্ত কার্যকর।
তাই গবেষণার ফলকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে হাতে লেখা ভালো এবং টাইপ করা খারাপ।
বরং কোন কাজের জন্য কোন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যদি লক্ষ্য হয় কোনো বিষয় গভীরভাবে শেখা বা মনে রাখা, তাহলে হাতে লিখে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নোট করা উপকারী হতে পারে। আর দ্রুত তথ্য সংরক্ষণ, সম্পাদনা বা ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন হলে টাইপ করা বেশি সুবিধাজনক।
হাতে লেখার সময় মনোযোগও বাড়তে পারে
হাতে লেখার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো মনোযোগ ধরে রাখা।
মোবাইল বা কম্পিউটারে টাইপ করার সময় একই যন্ত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, বার্তা বা অন্য নানা ধরনের কাজের সুযোগ থাকে। ফলে পড়াশোনার সময় মনোযোগ অন্যদিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
কাগজ ও কলমের ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে লেখার সময় মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট কাজে ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
তবে এখানে আসল বিষয় শুধু কাগজ-কলম নয়। মনোযোগ দিয়ে কোনো কিছু শেখার চেষ্টা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কীভাবে কাজে লাগাবেন?
শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থীদের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বই পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজের হাতে লিখে ছোট নোট তৈরি করা যেতে পারে। একটি অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে মূল বিষয়গুলো নিজের ভাষায় লিখে ফেললে তথ্য কতটা বুঝেছেন, সেটিও বোঝা যায়।
এ ছাড়া সংজ্ঞা, সূত্র, গুরুত্বপূর্ণ তারিখ বা তালিকা মনে রাখার ক্ষেত্রে হাতে লিখে বারবার অনুশীলন করা কাজে লাগতে পারে।
তবে পুরো বই খাতায় তুলে লেখার প্রয়োজন নেই। বরং মূল ধারণা, গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এবং নিজের বোঝার মতো করে সংক্ষিপ্ত নোট তৈরি করাই বেশি কার্যকর।
শিশুদের জন্য হাতে লেখার গুরুত্ব আরও বেশি
শিশুরা যখন অক্ষর লেখা শেখে, তখন শুধু ভাষা শেখে না। একই সঙ্গে চোখ ও হাতের সমন্বয়, সূক্ষ্ম পেশির নিয়ন্ত্রণ এবং অক্ষরের আকার চেনার দক্ষতাও তৈরি হয়।
তাই শিশুদের পড়াশোনায় হাতে লেখার অভ্যাস একেবারে বাদ দিয়ে শুধু যন্ত্রনির্ভর লেখার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
ডিজিটাল প্রযুক্তি অবশ্যই শেখার অংশ হতে পারে। কিন্তু তার পাশাপাশি খাতা ও কলমের ব্যবহারও থাকা দরকার।
কেন হাতে লেখা এত আলাদা?
হাতে লেখার সময় একই তথ্যকে একাধিক উপায়ে প্রক্রিয়া করতে হয়। প্রথমে তথ্যটি বুঝতে হয়, তারপর কোন অংশ লিখবেন তা ঠিক করতে হয়, এরপর হাতের নড়াচড়ার মাধ্যমে সেটি কাগজে তুলে ধরতে হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ককে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হয়।
অন্যদিকে টাইপ করার ক্ষেত্রে অক্ষর তৈরি করার শারীরিক প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে একরকম। ফলে লেখার গতি বাড়ে ঠিকই, কিন্তু তথ্যের সঙ্গে হাতের লেখার মতো সূক্ষ্ম শারীরিক সম্পর্ক তৈরি নাও হতে পারে।
হাতে লেখা মানেই সব সময় বেশি মনে থাকবে, এমন নয়
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। শুধু হাতে লিখলেই যে কোনো তথ্য দীর্ঘদিন মনে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কী লিখছেন, কতটা বুঝছেন এবং পরে সেটি কীভাবে পুনরাবৃত্তি করছেন, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। মনোযোগ ছাড়া হাতে লিখলে তার সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
একইভাবে মনোযোগ দিয়ে টাইপ করে নোট নেওয়াও শেখার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
অর্থাৎ লেখার মাধ্যমের পাশাপাশি শেখার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কোনটি বেছে নেবেন?
দুটিকেই ব্যবহার করা যায়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী দুটির সমন্বয় সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হতে পারে।
গভীরভাবে শেখার সময়: হাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিখুন।
দ্রুত নোট নেওয়ার সময়: টাইপ করতে পারেন।
পরীক্ষার আগে: হাতে লিখে সংক্ষিপ্ত নোট বা প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করতে পারেন।
দীর্ঘ প্রতিবেদন বা গবেষণার কাজে: টাইপ করা বেশি সুবিধাজনক।
শিশুদের শেখানোর ক্ষেত্রে: হাতে লেখার অভ্যাস বজায় রাখুন।
প্রযুক্তির কারণে টাইপ করা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই কিবোর্ড বা মোবাইলের ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে শেখা ও স্মৃতির ক্ষেত্রে হাতে লেখার যে সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
কোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝতে ও মনে রাখতে চাইলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজের হাতে লিখে নেওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে শুধু তথ্য কাগজে লেখা হয় না, বরং মস্তিষ্কও তথ্যটিকে সক্রিয়ভাবে প্রক্রিয়া করার সুযোগ পায়।
তাই দ্রুততার জন্য টাইপ করুন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু শেখা বা মনে রাখার প্রয়োজন হলে মাঝে মাঝে কলম-খাতায় ফিরে যাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
সূত্র: টিভি ৯



