ফ্লুতে শরীরকে আরও কাহিল করতে পারে এই ৬ খাবার

জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা আর দুর্বলতা। ফ্লু হলে কয়েক দিন শরীর বেশ কাহিল হয়ে পড়ে। এ সময় অনেকেরই খেতে ইচ্ছা করে না। আবার কেউ কেউ পছন্দের ভারী বা ঝাল খাবার খেয়ে একটু স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু ফ্লুর সময় খাবারের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকা দরকার। খাবার ফ্লু সারিয়ে দিতে পারে না, তবে সঠিক খাবার শরীরকে সংক্রমণের সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি ও তরল পানীয় শরীরের পানিশূন্যতা ঠেকাতেও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের কারণে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। বমি বা ডায়রিয়া থাকলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি আরও বাড়ে।
অন্যদিকে কিছু খাবার এই সময়ে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে বা গলা ও পেটে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই ফ্লু হলে কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন, তা জানা থাকাও জরুরি।
ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার
ফ্লু হলে তেলে ভাজা খাবার, পুরি, পরোটা, ফ্রাই কিংবা অতিরিক্ত তেলযুক্ত ফাস্টফুড খেতে ভালো লাগলেও এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
জ্বর বা অসুস্থতার সময় অনেকের পেট এমনিতেই সংবেদনশীল থাকে। ভাজাপোড়া খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে এবং পেটে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বমি বমি ভাব বা পেট খারাপ থাকলে এ ধরনের খাবার সমস্যা আরও বাড়াতে পারে।
এর বদলে পাতলা খিচুড়ি, হালকা ডাল, স্যুপ বা নরম ভাতের মতো সহজপাচ্য খাবার খেতে পারেন।
অ্যালকোহল
অসুস্থ অবস্থায় অ্যালকোহল পান করা একেবারেই ভালো অভ্যাস নয়। ফ্লুর সময় জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি হতে পারে। অ্যালকোহল এই অবস্থায় শরীরের প্রয়োজনীয় তরল পূরণে কোনো সাহায্য করে না।
ফ্লুর সময় তাই অ্যালকোহলের বদলে পানি, হালকা স্যুপ, ডাবের পানি বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার স্যালাইন পান করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত চা-কফি
অসুস্থ হলে অনেকেই ক্লান্তি কাটাতে বারবার চা বা কফি পান করেন। কিন্তু ফ্লুর সময় অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ভালো পছন্দ নাও হতে পারে।
বিশেষ করে যদি জ্বরের সঙ্গে পেটের সমস্যা, বমি বা ডায়রিয়া থাকে, তখন শরীরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখা বেশি জরুরি। অতিরিক্ত কফি, এনার্জি ড্রিংক বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি ও অন্যান্য তরল পানীয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।
অবশ্য এক কাপ চা বা কফি খেলেই সমস্যা হবে, এমন নয়। মূল বিষয় হলো অতিরিক্ত না খাওয়া এবং শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করা।
অতিরিক্ত ঝাল খাবার
ঝাল খাবার অনেকের নাক বন্ধভাব সাময়িকভাবে কমাতে পারে। কিন্তু ফ্লুর সময় সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
গলা ব্যথা, বমি বমি ভাব বা পেটে অস্বস্তি থাকলে অতিরিক্ত ঝাল খাবার এসব সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি ঝাল খাবার কারও কারও ক্ষেত্রে কাশিও বাড়াতে পারে।
তাই ফ্লুর সময় ঝাল তরকারি, অতিরিক্ত মরিচ বা খুব মসলাদার খাবারের বদলে হালকা খাবার খাওয়া ভালো।
বেশি চিনি থাকা পানীয়
অসুস্থ হলে ফলের রস বা মিষ্টি পানীয় খেলে শরীর দ্রুত শক্তি পাবে, এমন ধারণা অনেকের আছে। কিন্তু বাজারের প্যাকেটজাত ফলের পানীয় বা কোমল পানীয়তে প্রচুর বাড়তি চিনি থাকতে পারে।
তাই ফ্লুর সময় এসব পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে পানি, ডাবের পানি, হালকা স্যুপ কিংবা চিনি ছাড়া পানীয় বেছে নেওয়া ভালো।
তাজা ফল খেতে পারলে সেটি আরও ভালো বিকল্প হতে পারে। কমলা, কিউই, পেঁপে, তরমুজের মতো ফলে পানি ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে।
ভারী খাবার
ফ্লু হলে অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। তখন জোর করে এক প্লেট ভাত, মাংস বা ভারী খাবার খাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো।
বড় পরিমাণ খাবার একবারে খাওয়ার বদলে অল্প অল্প করে কয়েকবার খেতে পারেন। নরম খিচুড়ি, পাতলা ডাল, ডালিয়া, স্যুপ বা ডিমের মতো সহজ খাবার দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
ক্ষুধা না থাকলে শরীরকে খাবার দিয়ে চাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে পর্যাপ্ত তরল পান করা জরুরি।
ফ্লু হলে কী খাবেন?
কোনো খাবারই ফ্লুর ভাইরাসকে সরাসরি ধ্বংস করে না। তবে পুষ্টিকর খাবার শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি দিতে পারে।
এ সময় পানি ও অন্যান্য পর্যাপ্ত তরল, হালকা স্যুপ, ডাল ও নরম খিচুড়ি, ডালিয়া, ডিম, দই (যদি খেলে পেটে সমস্যা না হয়), কমলা/ কিউই/পেঁপে ও তরমুজসহ বিভিন্ন ফল এবং হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খেতে পারেন ।
মুরগির স্যুপও এ সময়ে ভালো বিকল্প হতে পারে। এতে তরল ও কিছু পুষ্টি পাওয়া যায় এবং গরম তরল গলা ও নাকের অস্বস্তি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
দুধ বা দই কি একেবারে বন্ধ করতে হবে?
সর্দি-কাশি হলে দুধ বা দই খেলে কফ বেড়ে যায়, এমন ধারণা প্রচলিত। তবে সবার ক্ষেত্রে দুধজাতীয় খাবার একই সমস্যা তৈরি করে না। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এগুলো খেলে মুখ বা গলায় ঘন আবরণ অনুভূত হতে পারে, কিন্তু দুধ শরীরে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি করে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
তাই দই বা দুধ খেলে যদি আপনার কোনো অস্বস্তি না হয়, তাহলে শুধু ফ্লু হয়েছে বলে এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
মনে রাখবেন, ফ্লু হলে খাবারের তালিকা নিয়ে চিন্তা করার পাশাপাশি পানি খাওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
জ্বর হলে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। আবার বমি বা ডায়রিয়া থাকলে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ দুটিই কমে যেতে পারে। তাই একবারে অনেকটা পানি পান করতে না পারলে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করুন।
পানি, হালকা স্যুপ, ডাবের পানি বা প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার স্যালাইন শরীরে তরল ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে।
ফ্লু হলে খাবার দিয়ে রাতারাতি সুস্থ হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবে এই সময়ে সঠিক খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় পানি, শক্তি ও পুষ্টি দিতে পারে। অন্যদিকে ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত ঝাল, অ্যালকোহল, বেশি ক্যাফেইন, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এবং ভারী খাবার অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
তাই ফ্লু হলে খাবারের পরিমাণ কম হলেও খাবার যেন সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর হয়, সেদিকে নজর দিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি পান করা।
জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ খুব বেশি হলে, কয়েক দিনেও না কমলে, শ্বাসকষ্ট হলে বা শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি



