চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করলে কি সত্যিই ক্ষতি হয়

চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করা যাবে কি না, এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই দীর্ঘদিনের একটি ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করেন, মুরগির মাংস খাওয়ার পর দুধ পান করলে পেটে সমস্যা হতে পারে। আবার কারও বিশ্বাস, এই দুই খাবার একসঙ্গে খেলে ত্বকে সাদা দাগ বা শ্বেতী রোগ হতে পারে।
এমন ধারণা শুধু বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, অনেক জায়গায় প্রচলিত। আয়ুর্বেদেও দুধ ও মাংস একসঙ্গে খাওয়াকে অনুপযুক্ত খাবারের সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চিকেন ও দুধ একসঙ্গে বা পরপর খেলে শ্বেতী হয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাহলে এই দুই খাবার একসঙ্গে খেলে আসলে কী হয়? কখন সমস্যা হতে পারে? আর কতক্ষণ পর দুধ পান করা ভালো?
চিকেন ও দুধ একসঙ্গে খেলে কি বিষ তৈরি হয়?
এমন দাবি প্রচলিত থাকলেও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
চিকেন ও দুধ দুটিই পুষ্টিকর খাবার এবং দুটিতেই প্রোটিন রয়েছে। শরীর খাবারের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান আলাদা আলাদা প্রক্রিয়ায় হজম ও শোষণ করে। শুধু দুটি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার একসঙ্গে খাওয়ার কারণে শরীরে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়, এমন প্রমাণ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই।
তাই চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করলেই শরীরে বিষক্রিয়া হবে, এমন ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
চিকেনের পর দুধ খেলে কি শ্বেতী হয়?
এটিও একটি প্রচলিত ভুল ধারণা।
শ্বেতী বা ভিটিলিগো এমন একটি রোগ, যেখানে ত্বকের রং তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মেলানিন উৎপাদনকারী কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি একটি জটিল অটোইমিউন রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। চিকেনের সঙ্গে দুধ খাওয়ার কারণে শ্বেতী হয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করার সঙ্গে ত্বকে সাদা দাগ হওয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
তাহলে দুধ ও চিকেন নিয়ে এত কথা কেন?
এর একটি কারণ আয়ুর্বেদের খাদ্যসংক্রান্ত ধারণা। আয়ুর্বেদে কিছু খাবারের সমন্বয়কে বিরুদ্ধ আহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণা অনুযায়ী দুধ এবং মাংসের মতো খাবারের গুণ ও হজমের প্রক্রিয়া আলাদা হওয়ায় এগুলো একসঙ্গে না খাওয়াই ভালো বলে মনে করা হয়।
তবে আয়ুর্বেদের এই ধারণাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। খাবারের সংমিশ্রণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে কি সবার জন্যই কোনো সমস্যা নেই?
চিকেন ও দুধ একসঙ্গে খেলে সবার সমস্যা হবে, এমন নয়। আবার সবার কোনো সমস্যা হবে না, সেটিও বলা যায় না।
কারও দুধ হজমে সমস্যা থাকলে চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করলে পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে। এর কারণ চিকেন ও দুধের কোনো বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দুধে থাকা ল্যাকটোজ হজম করতে না পারা বা ব্যক্তির হজমতন্ত্রের সংবেদনশীলতা।
বিশেষ করে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে দুধ পান করার পর পেটের অস্বস্তি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে কী হয়?
দুধে ল্যাকটোজ নামে এক ধরনের চিনি থাকে। শরীরে ল্যাকটেজ নামের এনজাইমের ঘাটতি থাকলে ল্যাকটোজ পুরোপুরি হজম হতে পারে না।
তখন দুধ পান করার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা বা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কেউ যদি চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করে এমন সমস্যায় পড়েন, তাহলে শুধু খাবারের এই সমন্বয়কে দায়ী না করে দুধ হজমে সমস্যা আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
চিকেন ও দুধ দুটিই কি ভারী খাবার?
চিকেন ও দুধ দুটিই প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে দুটি খাবার একসঙ্গে খেলেই সবার হজমে সমস্যা হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
কোনো খাবার হজম হতে কতটা সময় লাগে, তা শুধু খাবারের একটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। খাবারের পরিমাণ, মোট চর্বি ও প্রোটিনের পরিমাণ, রান্নার ধরন এবং ব্যক্তির হজমক্ষমতাও এর সঙ্গে যুক্ত।
তাই চিকেন ও দুধ একসঙ্গে খেলে সবার পাকস্থলীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, এমন দাবি অতিরঞ্জিত।
রান্নায় চিকেন ও দুধ একসঙ্গে থাকলে?
এখানেই প্রচলিত ধারণাটির একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে। বিভিন্ন রান্নায় চিকেনের সঙ্গে দুধ, দই, ক্রিম বা অন্যান্য দুগ্ধজাত উপাদান ব্যবহার করা হয়।
চিকেন রেজালা, মালাই চিকেন বা ক্রিমি চিকেনের মতো বিভিন্ন পদে মাংস ও দুগ্ধজাত উপাদান একসঙ্গে রান্না করা হয়। এসব খাবার প্রচলিতভাবে খাওয়া হয় এবং চিকেন ও দুধের সমন্বয়ের কারণে বিষক্রিয়া বা শ্বেতী হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তবে এসব খাবারে অতিরিক্ত চর্বি, মসলা বা ক্যালরি থাকতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষেত্রে পুরো রান্নার ধরন ও পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকেন খাওয়ার কতক্ষণ পর দুধ পান করবেন?
সুস্থ মানুষের জন্য চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করতে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান রাখতেই হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।
অর্থাৎ চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করলে অবশ্যই দুই বা তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে, এমন প্রমাণিত নিয়ম নেই। কারও যদি দুটো খাবার পরপর খেলে অস্বস্তি হয়, তাহলে আলাদা সময়ে খেতে পারেন। এতে নিজের হজমের সমস্যা এড়ানো সহজ হতে পারে।
যাঁদের দুধ খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে দুধের পরিমাণ কমানো বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারা একটু সতর্ক থাকবেন?
যাঁদের হজমতন্ত্র সংবেদনশীল, তাঁদের কিছু খাবার একসঙ্গে খেলে অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, আইবিএস বা দুধে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের দুধ খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
দুধে অ্যালার্জি এবং ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা এক বিষয় নয়। দুধে অ্যালার্জি হলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া হতে পারে। অন্যদিকে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতায় মূল সমস্যা হয় দুধের ল্যাকটোজ হজম করতে না পারার কারণে।
তাই দুধ খাওয়ার পর নিয়মিত সমস্যা হলে নিজের মতো করে খাবার বাদ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চিকেন ও দুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে কী মনে রাখবেন?
কিছু সহজ বিষয় মনে রাখলেই যথেষ্ট।
শ্বেতীর ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই: চিকেন ও দুধ খাওয়ার সঙ্গে ভিটিলিগোর সরাসরি সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করুন: দুটো খাবার একসঙ্গে খেয়ে অস্বস্তি হলে আলাদা সময়ে খেতে পারেন।
দুধ হজমে সমস্যা থাকলে সতর্ক থাকুন: গ্যাস, পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হলে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
খাবারের মান গুরুত্বপূর্ণ: চিকেন ভালোভাবে রান্না করা এবং দুধ নিরাপদ ও সঠিকভাবে সংরক্ষিত হওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত খাবেন না: একই সঙ্গে বেশি পরিমাণে খাবার খেলে স্বাভাবিকভাবেই পেট ভার, অস্বস্তি বা বদহজম হতে পারে।
খাবারের সঙ্গে ত্বকের সাদা দাগের সম্পর্ক কোথায়?
ত্বকে সাদা দাগ দেখা দিলে অনেকেই খাবারের দিকে সন্দেহের চোখে তাকান। বিশেষ করে মাছ, দুধ, মাংস বা টক খাবার নিয়ে নানা ধরনের লোকবিশ্বাস রয়েছে।
কিন্তু ভিটিলিগোর ক্ষেত্রে খাবারের এমন নির্দিষ্ট সমন্বয়কে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রোগটির সঙ্গে অটোইমিউন প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে এবং এর কারণ একক কোনো খাবার নয়।
তাই ত্বকে সাদা দাগ দেখা দিলে খাবার বন্ধ করার পরিবর্তে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকেন খাওয়ার পর দুধ পান করলে শরীরে বিষ তৈরি হয় বা শ্বেতী রোগ হয়, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। চিকেন ও দুধ দুটিই পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাভাবিকভাবে হজম করতে পারলে এগুলো একসঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে খাওয়ায় সাধারণভাবে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
তবে দুধে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা অন্য কোনো হজমের সমস্যা থাকলে দুধ খাওয়ার পর গ্যাস, পেট ফাঁপা, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে। তখন সমস্যার কারণ খাবারের সমন্বয় নয়, বরং ব্যক্তির শারীরিক সংবেদনশীলতা হতে পারে।
তাই লোকমুখে প্রচলিত ভয় নয়, নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা



