আজকের দিনটি শুধু কবিদের জন্য

কখনো একটি কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হয়, এই কথাটিই তো আমি বলতে চেয়েছিলাম। কখনো আবার কয়েকটি লাইন পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। প্রিয় মানুষ, হারিয়ে যাওয়া সময়, বৃষ্টি ভেজা বিকেল কিংবা একাকী রাত, জীবনের খুব সাধারণ মুহূর্তও কবিতার কয়েকটি লাইনে হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ।
কবিতার এই শক্তির কথা মনে করিয়ে দিতেই প্রতিবছর ২১ আগস্ট পালিত হয় কবি দিবস। দিনটি মূলত কবি ও কবিতাকে সম্মান জানানো, কবিতা পড়া, কবিতা লেখা এবং সাহিত্যের এই বিশেষ মাধ্যমটির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপলক্ষ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকায় ২১ আগস্ট কবি দিবস হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এটি কোনো সরকারি আন্তর্জাতিক দিবস নয়।
তাই আজকের দিনটি বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বরং একটু থামার উপলক্ষ হতে পারে। ব্যস্ততার মধ্যে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে প্রিয় কবির একটি কবিতা পড়া, বহুদিনের পুরোনো কবিতার বইটি খুলে বসা কিংবা নিজের মনের কথাগুলো কয়েকটি লাইনে লিখে ফেলা যায়।
কবিতা কেন এত আপন?
মানুষের ইতিহাসে কবিতার বয়স অনেক পুরোনো। লিখিত ভাষার বিকাশের আগেও মানুষ ছন্দ, গান ও মুখে মুখে প্রচলিত কথার মাধ্যমে অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও গল্প প্রকাশ করত। পরে সেই মৌখিক ঐতিহ্য থেকেই নানা ধরনের কাব্যধারা গড়ে ওঠে।
কবিতা শুধু ছন্দ মিলিয়ে কিছু কথা লেখা নয়। কখনো এটি আনন্দ প্রকাশ করে, কখনো দুঃখের ভাষা হয়ে ওঠে। কখনো প্রতিবাদের কথা বলে, কখনো প্রেমের। আবার কখনো মানুষের একাকিত্ব, ভয়, স্বপ্ন কিংবা ভবিষ্যতের আশা তুলে ধরে।
এই কারণেই কবিতা অন্য অনেক লেখার চেয়ে আলাদা। একটি দীর্ঘ গল্প যেখানে একটি ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলতে পারে, একটি কবিতা সেখানে মাত্র কয়েকটি শব্দে একই অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
কবিরা আসলে কী করেন?
কবি শুধু কবিতা লেখেন না। তারা অনেক সময় আমাদের চারপাশের পরিচিত জিনিসকে নতুন করে দেখতে শেখান।
বৃষ্টির শব্দ আমরা সবাই শুনি। কিন্তু একজন কবি সেই বৃষ্টির মধ্যে হয়তো শৈশবের কোনো দুপুর খুঁজে পান। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ কারও কাছে শুধু গাছ, আবার কবির চোখে সেটি হয়ে উঠতে পারে অপেক্ষা, স্মৃতি কিংবা জীবনের প্রতীক।
কবির কাজ অনেকটা সেই পরিচিত পৃথিবীকে নতুন ভাষায় দেখানো।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও কবিতার এই ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ থেকে আধুনিক সময়ের অসংখ্য কবি, তাদের লেখায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি সমাজ, প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি ও মানুষের জীবন উঠে এসেছে।
কখনো কবিতা মানুষকে সান্ত্বনা দিয়েছে, কখনো প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছে, আবার কখনো একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছে।
কবিতা কি শুধু কবিদের জন্য?
একদমই না। কবিতা পড়তে হলে কবি হতে হয় না। কবিতা বুঝতে সাহিত্য নিয়ে বড় কোনো ডিগ্রিও প্রয়োজন নেই। একটি কবিতা পড়ে যদি কারও মনে কোনো অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিই তার সবচেয়ে বড় অর্থ।
কেউ কবিতায় প্রেম খুঁজে পান, কেউ প্রকৃতি। কেউ খুঁজে পান নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যাওয়া কোনো কথা। আবার কোনো কবিতা হয়তো প্রথমবার পড়ে ভালো লাগবে না, কয়েক বছর পর একই কবিতা নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসতে পারে।
কারণ মানুষ বদলায়। আর মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার অর্থও অনেক সময় বদলে যায়।
আজকের দিনে কবিতার জায়গা কোথায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও, দ্রুত খবর আর সারাক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকার সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য পড়ার অভ্যাস অনেকেরই কমে গেছে। তবু কবিতা হারিয়ে যায়নি।
বরং কবিতা নতুন মাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছে। অনলাইনে কবিতা প্রকাশ হচ্ছে, তরুণেরা নিজেদের লেখা ভাগ করে নিচ্ছেন, কবিতা পাঠের আয়োজন হচ্ছে। ছোট ছোট কবিতার লাইনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে কবিতার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সব সময় ফোন বা কম্পিউটার প্রয়োজন হয় না। পুরোনো একটি কবিতার বই খুলে বসাও হতে পারে চমৎকার অভিজ্ঞতা।
একজন কবির চোখে পৃথিবী
কবি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পৃথিবী দেখার পার্থক্য সব সময় খুব বড় নয়। পার্থক্যটা অনেক সময় দেখার ভঙ্গিতে।
একজন সাধারণ মানুষ হয়তো শরতের আকাশ দেখে শুধু সুন্দর আকাশ বলেই চলে যান। একজন কবি সেই আকাশের সঙ্গে নিজের কোনো স্মৃতি জুড়ে দিতে পারেন। একটি নদী কারও কাছে কেবল পানির প্রবাহ, কিন্তু কবির কাছে সেটি হয়ে উঠতে পারে সময়ের প্রতীক।
এই দেখার ক্ষমতাই কবিতাকে আলাদা করে।
কবিতা আমাদের শেখায়, প্রতিদিনের জীবনে আমরা যে বিষয়গুলোকে খুব স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাই, সেগুলোর মধ্যেও গল্প আছে, অনুভূতি আছে, সৌন্দর্য আছে।
‘কবি দিবস’ আর ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ এক নয়
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ২১ আগস্টের ‘কবি দিবস’ এবং ২১ মার্চের ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ একই দিবস নয়।
২১ আগস্ট কবি দিবস নামে একটি অনানুষ্ঠানিক সাহিত্যভিত্তিক দিবস পালিত হয়। বিভিন্ন দিবসের ক্যালেন্ডারে দিনটি কবি ও কবিতাকে উদ্যাপনের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবস। এটি ইউনেসকো ঘোষিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। বিশ্বজুড়ে কবিতা, ভাষার বৈচিত্র্য এবং সৃজনশীল প্রকাশকে উৎসাহিত করাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তাই ২১ আগস্টকে বিশ্ব কবিতা দিবস বলা ঠিক হবে না। বরং কবি দিবস বলা বেশি নির্ভুল।
কবিতার জন্য একটি দিন, তবে কবিতা শুধু এক দিনের নয়
কবিতার জন্য আলাদা একটি দিন থাকা নিঃসন্দেহে সুন্দর। কিন্তু কবিতার প্রয়োজন কোনো একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
জীবনের আনন্দে কবিতা আছে, দুঃখেও আছে। প্রেমে আছে, বিচ্ছেদেও আছে। শৈশবের স্মৃতিতে আছে, বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতাতেও আছে। কখনো কবিতা আমাদের নিজের কথা বলে, কখনো এমন একজন মানুষের কথা বলে যাকে আমরা কখনো দেখিনি।
২১ আগস্ট তাই শুধু কবিদের সম্মান জানানোর দিন নয়। এটি নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোর কাছেও ফিরে যাওয়ার একটি উপলক্ষ হতে পারে।
আজ হয়তো ব্যস্ততার মধ্যে মাত্র দশ মিনিট সময় বের করা যাবে। সেই দশ মিনিটে একটি কবিতা পড়ুন। পছন্দের কোনো কবির বই খুলুন। অথবা জানালার পাশে বসে নিজের মনের কথাই লিখুন কয়েকটি লাইনে।
কারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত শুধু শব্দের খেলা নয়। কবিতা মানুষের অনুভূতিকে ভাষা দেওয়ার একটি উপায়। আর সেই অনুভূতি যতদিন মানুষের মধ্যে থাকবে, ততদিন কবিতারও প্রয়োজন থাকবে।


