logo

ক্ষমা করার দিন আজ

ক্ষমা করার দিন আজ
ছবি: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা

জীবনে এমন কিছু ঘটনা থাকে, যা আমরা চাইলেও সহজে ভুলতে পারি না। কারও বলা একটি কথা, কোনো কাছের মানুষের আচরণ, পুরোনো কোনো ভুল বা সম্পর্কের ভাঙন অনেক দিন মনের মধ্যে থেকে যায়। সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু সেই কষ্ট কখনো কখনো মনে থেকে যায়।

তবে ক্ষমা কি সেই কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ হতে পারে?

২৭ সেপ্টেম্বরকে কোথাও কোথাও ক্ষমা বা Forgiveness Day হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বা কোনো দেশের সরকারি National Day of Forgiveness হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বলা ঠিক নয়। বিভিন্ন অনলাইন ক্যালেন্ডার ও সামাজিক উদ্যোগে ক্ষমাকে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা দিন পালনের কথা দেখা যায়।

তারপরও ক্ষমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমা শুধু অন্য একজন মানুষকে দেওয়ার বিষয় নয়। অনেক সময় এটি নিজের মনকেও শান্ত করার একটি উপায় হতে পারে।

ক্ষমা শব্দটি শুনলে অনেকের মনে হতে পারে, কাউকে ক্ষমা করা মানে তার করা ভুলকে মেনে নেওয়া। আসলে বিষয়টি সব সময় এমন নয়।

কেউ আপনার সঙ্গে অন্যায় করলে তাকে ক্ষমা করলেও আপনি সেই মানুষটির সঙ্গে আগের মতো সম্পর্ক রাখতে বাধ্য নন। প্রয়োজন হলে দূরত্ব বজায় রাখা যায়। নিজের নিরাপত্তা, সম্মান ও মানসিক শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া যায়।

ক্ষমা অনেক সময় শুধু নিজের ভেতরের রাগ, অভিমান ও কষ্টকে ধীরে ধীরে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা।

ক্ষমা করা সহজ নয়। বিশেষ করে যখন আঘাতটি এসেছে কাছের কোনো মানুষের কাছ থেকে। আমরা সাধারণত চাই, যে মানুষটি আমাদের কষ্ট দিয়েছে সে নিজের ভুল বুঝুক। অনুতপ্ত হোক। কখনো কখনো তার কাছ থেকে একটি ক্ষমা চাওয়ার অপেক্ষাতেও থাকি।

কিন্তু সব সময় সেই ক্ষমা পাওয়া যায় না।

এই জায়গাতেই ক্ষমা কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ আমরা অন্য মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে নিজের অনুভূতি নিয়ে কীভাবে এগোব, সেই সিদ্ধান্ত কিছুটা হলেও নিজের হাতে থাকে।

ক্ষমা করলে কি কষ্ট সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়?

না। ক্ষমা কোনো জাদুর মতো কাজ করে না।

কাউকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও পুরোনো কথা মনে পড়তে পারে। কষ্ট হতে পারে। রাগও হতে পারে। এসব স্বাভাবিক। ক্ষমা অনেক সময় একটি ধীরে চলা প্রক্রিয়া। আজ ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নিলেই আগামীকাল সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমন নয়।

নিজেকে সময় দেওয়া জরুরি। নিজেকেও ক্ষমা করা দরকার।

আমরা অনেক সময় অন্যের ভুল নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজের ভুলগুলো ভুলে যাই।

হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। হয়তো কাউকে এমন কিছু বলে ফেলেছি, যা বলা উচিত ছিল না। হয়তো কোনো সুযোগ হারিয়েছি। এসব নিয়ে বছরের পর বছর নিজেকে দোষ দিতে থাকি।

নিজের ভুল স্বীকার করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পর নিজেকে সারাক্ষণ শাস্তি দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

নিজেকে ক্ষমা করার অর্থ নিজের ভুলকে অস্বীকার করা নয়। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া।

মনে রাখবেন, ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়। কিছু ঘটনা কখনোই পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সম্ভব হয় না।

কোনো প্রিয় মানুষকে হারানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা জীবনের কোনো কঠিন অভিজ্ঞতা আমাদের বদলে দিতে পারে। সেই স্মৃতি থেকে যেতে পারে।

ক্ষমা করার অর্থ সেই স্মৃতি মুছে ফেলা নয়। বরং সেই স্মৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বদলে ফেলার চেষ্টা।

একসময় যে ঘটনা শুধু কষ্ট দিত, সময়ের সঙ্গে সেটি হয়তো জীবনের একটি শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

ক্ষমা করার আগে অবশ্যই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। কেউ আপনাকে ক্ষমা করতে বললেই আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

আপনি যদি এখনো খুব কষ্ট পান, তাহলে নিজেকে সময় দিতে পারেন। নিজের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। প্রয়োজনে বিশ্বাসযোগ্য কোনো মানুষ বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

বিশেষ করে নির্যাতন, সহিংসতা বা গুরুতর অন্যায়ের ক্ষেত্রে ক্ষমা করার চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের নিরাপত্তা ও সুস্থতা সবার আগে।

আজ একটু নিজের দিকে তাকানো যাক

ক্ষমা দিবস হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে পালন করা হোক বা না হোক, নিজের ভেতরের জমে থাকা অভিমান নিয়ে ভাবার জন্য যেকোনো দিনই ভালো হতে পারে।

হয়তো এমন কেউ আছেন, যাকে ক্ষমা করতে চান।

হয়তো এমন কেউ আছেন, যার কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে চান।

আবার হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজেকেই ক্ষমা করা।

ক্ষমা সব সময় সম্পর্ক ফিরিয়ে আনে না। সব ক্ষতও মুছে দেয় না। কিন্তু কখনো কখনো ক্ষমা আমাদের অতীতের ভার একটু কমিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।

তাই ক্ষমা মানে সবকিছু ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা মানে নিজের শান্তির জন্য ধীরে ধীরে কিছু ভার নামিয়ে রাখা।