স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র কেনার আগে এই ৫ বিষয় যাচাই করুন

বাড়িতে রক্তচাপ মাপা, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা দেখা বা জ্বর পরীক্ষা করার জন্য এখন অনেকেই বিভিন্ন স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র ব্যবহার করেন। স্মার্টওয়াচের মতো কিছু যন্ত্র আবার হৃদ্স্পন্দন, ঘুম ও দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রমের তথ্যও দেয় সহজেই। এসব পণ্য কিনতে গিয়ে প্যাকেটে প্রায়ই দেখা যায় মেডিকেল গ্রেড, হাসপাতালের মানের অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহৃত হওয়ার মতো শব্দ।
এ ধরনের লেখা দেখে পণ্যটিকে নির্ভরযোগ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু মেডিকেল গ্রেড লেখা থাকলেই কি যন্ত্রটি চিকিৎসার কাজে ব্যবহারযোগ্য? সেটি কি সব সময় নির্ভুল ফল দেয়?
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র কেনার সময় শুধু বিজ্ঞাপনী দাবি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না। যন্ত্রটি কী কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং নির্ভুলতার পক্ষে প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করাও জরুরি। কারণ, ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে বড় কোনো সমস্যাও হতে পারে।
মেডিকেল গ্রেড বলতে আসলে কী বোঝায়?
মেডিকেল গ্রেড বলতে সাধারণভাবে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের উপযোগী মানের কোনো পণ্যকে বোঝানো হয়। তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রে এই শব্দের অর্থ এক নয়। পণ্যের ধরন, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়মকানুন অনুযায়ী এর তাৎপর্য ভিন্ন হতে পারে।
যেমন, একটি স্মার্টওয়াচ হৃদ্স্পন্দনের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। কিন্তু শুধু স্মার্টওয়াচের তথ্য দেখে হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। একইভাবে, একটি সাধারণ অক্সিমিটার ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের জন্য যাচাই করা অক্সিমিটারের নির্ভুলতা এক নাও হতে পারে।
তাই পণ্যের গায়ে মেডিকেল গ্রেড লেখা দেখেই সেটিকে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র কেনার আগে যে ৫টি বিষয় যাচাই করবেন
যন্ত্রটি কোন কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি, তা জানুন
সবার আগে বুঝে নিন, যন্ত্রটি সাধারণ স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য, নাকি নির্দিষ্ট কোনো শারীরিক সমস্যা শনাক্ত বা পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি।
উদাহরণ হিসেবে, স্মার্টওয়াচের সাহায্যে দৈনন্দিন হাঁটাচলা, হৃদ্স্পন্দন বা ঘুমের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সব স্মার্টওয়াচ চিকিৎসার কাজে ব্যবহারযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের উদ্দেশ্য হলো রক্তচাপ পরিমাপ করা। সেটি কেনার সময় যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং কোন ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য উপযুক্ত, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
তাই, পণ্যের বাক্স, নির্দেশিকা ও প্রস্তুতকারকের ওয়েবসাইটে দেওয়া ব্যবহারের উদ্দেশ্য ভালোভাবে পড়ুন। শুধু বিজ্ঞাপনে লেখা সুবিধার তালিকা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
প্রস্তুতকারক ও অনুমোদনের তথ্য যাচাই করুন
বিশ্বস্ত স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্রে সাধারণত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, মডেল নম্বর এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক তথ্য থাকে। পণ্যের সঙ্গে দেওয়া নির্দেশিকা বা অন্যান্য নথিতেও এসব তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিদেশি পণ্যে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন বা সনদসংক্রান্ত চিহ্ন থাকতে পারে। তবে কোনো চিহ্ন দেখেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে পণ্যটি সব ধরনের চিকিৎসার কাজে অনুমোদিত। চিহ্নটি আসল কি না, কোন পণ্যের জন্য প্রযোজ্য এবং কোন ব্যবহারের অনুমতি নির্দেশ করে, তা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশে চিকিৎসাসংক্রান্ত যন্ত্রের ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিজিডিএ) তথ্য দেখা যেতে পারে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত মেডিকেল ডিভাইসের তালিকা ও এ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। তবে সব ধরনের যন্ত্রের জন্য একই নিবন্ধন বা অনুমোদনের নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
কেনার আগে প্রস্তুতকারকের পরিচয়, মডেল নম্বর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধন বা অনুমোদনের তথ্য যাচাই করুন (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ)।
যন্ত্রটির নির্ভুলতার পক্ষে প্রমাণ আছে কি না, দেখুন
স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যন্ত্রটি ভুল ফল দেখালে ব্যবহারকারী নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারেন।
যেমন, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র সঠিক ফল না দিলে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে। আবার পালস অক্সিমিটার ভুলভাবে অক্সিজেনের মাত্রা বেশি দেখালে কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন।
তাই পণ্যটি শুধু নির্ভুল ফল দেওয়ার দাবি করছে কি না, সেটি দেখাই যথেষ্ট নয়। এর নির্ভুলতা যাচাইয়ের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র কেনার সময় নির্দিষ্ট মডেলটির নির্ভুলতা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা দেখুন। একই প্রতিষ্ঠানের সব মডেল সমানভাবে যাচাই করা হয়েছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নথি, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সুপারিশ যাচাই করুন। শুধু জনপ্রিয়তা বা ক্রেতাদের ভালো পর্যালোচনাকে নির্ভুলতার প্রমাণ মনে করবেন না।
ব্যবহারের নিয়ম, সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতা পড়ুন
কোনো যন্ত্রের নির্ভুলতা ভালো হলেও ভুলভাবে ব্যবহার করলে ভুল ফল আসতে পারে। তাই কেনার আগে যন্ত্রটির নির্দেশিকা পড়ে নেওয়া জরুরি।
রক্তচাপ মাপার সময় হাতের অবস্থান, কাফের মাপ এবং বসার ভঙ্গি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। পালস অক্সিমিটারের ক্ষেত্রে আঙুলের অবস্থান, হাত ঠান্ডা থাকা, নড়াচড়া কিংবা নখে রং থাকার মতো বিষয়ও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে পাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্দেশিকায় যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে ফল নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে, কীভাবে পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং কখন প্রস্তুতকারকের সহায়তা নিতে হবে, সেসব তথ্য থাকা উচিত।
কেনার আগে ওয়ারেন্টি, মেরামতের ব্যবস্থা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার তথ্যও জেনে নিন।
অবশ্যই নির্দেশিকা সহজে পাওয়া যায় কি না এবং প্রস্তুতকারক বা অনুমোদিত বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে কি না, তা যাচাই করুন।
অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন দেখে প্রভাবিত হবেন না
কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে যদি বলা হয়, সেটি দিয়ে একসঙ্গে অনেক রোগ শনাক্ত করা যাবে, শতভাগ নির্ভুল ফল পাওয়া যাবে কিংবা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না, তাহলে সতর্ক হোন।
স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্রের কাজ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিছু যন্ত্র নির্দিষ্ট শারীরিক তথ্য পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে, কিন্তু সেগুলো দিয়ে সব রোগ নির্ণয় করা যায় না।
উদাহরণ হিসেবে, স্মার্টওয়াচে হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিক দেখালেও তা সব ধরনের হৃদ্রোগের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে না। আবার একটি যন্ত্রে অস্বাভাবিক ফল এলেই যে নিশ্চিতভাবে রোগ হয়েছে, এমনও নয়।
পণ্যের প্রতিশ্রুতির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি না, তা দেখুন। অতিরঞ্জিত দাবি, অস্পষ্ট প্রস্তুতকারক পরিচয় কিংবা যাচাই করা যায় না এমন সনদসংক্রান্ত চিহ্ন থাকলে কেনার আগে আরও সতর্ক হন।
স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্রের ফল কি চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে?
না। বাড়িতে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের যন্ত্র ব্যবহার করে শরীরের কিছু পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নিয়মিত রক্তচাপ মাপা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করাও কাজে আসতে পারে।
তবে যন্ত্রের ফলাফলকে সব সময় উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হয়। কোনো একটি স্বাভাবিক রিডিং দেখে গুরুতর সমস্যা নেই বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আবার একটি অস্বাভাবিক রিডিং দেখেই নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করাও উচিত নয়।
যন্ত্রে বারবার অস্বাভাবিক ফল এলে, শরীরে নতুন উপসর্গ দেখা দিলে অথবা ফলাফলের সঙ্গে শারীরিক অবস্থার মিল না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর উপসর্গ থাকলে শুধু যন্ত্রের ফলের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র কেনার সময় শুধু মেডিকেল গ্রেড লেখা, আকর্ষণীয় প্যাকেট কিংবা পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। যন্ত্রটির ব্যবহারের উদ্দেশ্য, প্রস্তুতকারকের পরিচয়, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নির্ভুলতার প্রমাণ এবং ব্যবহারের নিয়ম যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন, ভালো স্বাস্থ্য মাপার যন্ত্র চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু কোনো যন্ত্রই সব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়নের বিকল্প নয়। সঠিক যন্ত্র বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করাও সমান জরুরি।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে ‘What Does 'Medical Grade' Actually Mean? 5 Things To Check Before Buying Health Devices’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।
