ট্রেনে সিটবেল্ট থাকে না কেন

গাড়ি, বাস বা বিমানে উঠলেই আমরা সিটবেল্ট বাঁধি। নিরাপত্তার জন্য এটি এখন বাধ্যতামূলক নিয়ম। কিন্তু ট্রেনে কখনও কি সিটবেল্ট দেখেছেন? এমনকি দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনেও নয়। বিষয়টি অনেকের কাছেই অদ্ভুত মনে হতে পারে।
পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় যানবাহন সুরক্ষা বোর্ড (National Transportation Safety Board)-এর সাবেক তদন্তকারী থমাস বার্থের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ট্রেনে সিটবেল্টের প্রয়োজনই হয় না। কারণ ট্রেন ভ্রমণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ।
ট্রেন দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম
খবরের শিরোনামে মাঝে মাঝে ট্রেন দুর্ঘটনার খবর এলেও পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার তুলনায় এগুলো অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেলরোড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রেলপথ ও সড়ক সংযোগস্থলে ২,২৬১টি দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে প্রাণহানি হয় ২৬২ জনের।
অন্যদিকে একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয় প্রায় ৩৯ হাজারের বেশি। এই তথ্য দিয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেন নির্দিষ্ট লাইনে চলে এবং পেশাদার চালক ও নিয়ন্ত্রক দ্বারা পরিচালিত হয়। এই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
সংঘর্ষের ধাক্কা ভিন্ন ধরনের
দুর্ঘটনার সময় কত দ্রুত একটি যানবাহন থামে, তার ওপর ধাক্কার তীব্রতা নির্ভর করে। একটি গাড়ি দেয়ালে ধাক্কা দিলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায়, ফলে আঘাতের শক্তি বেশি হয়।
কিন্তু ট্রেন অনেক বড় ও ভারী। তুলনামূলকভাবে হালকা কোনো বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা লাগলে ট্রেন হঠাৎ থেমে যায় না। ফলে আঘাতের ধরন গাড়ির মতো তীব্র হয় না। তাই একই ধরনের সিটবেল্টের প্রয়োজন পড়ে না।
তবে ব্যতিক্রম আছে। দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ বা লাইনচ্যুতি হলে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। কিন্তু এমন ঘটনা খুবই বিরল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অগ্রাধিকার আলাদা
ট্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয় বড় সংঘর্ষ বা লাইনচ্যুতি ঠেকাতে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন পজিটিভ ট্রেন কন্ট্রোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনের গতি ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে মানবিক ভুলের ঝুঁকি কমে।
ট্রেনে ভ্রমণ কতটা নিরাপদ
রেল প্যাসেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গাড়ির তুলনায় ট্রেনে ভ্রমণ প্রায় ১৭ গুণ বেশি নিরাপদ। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রীবাহী বিমান, আমট্রাক বা কমিউটার রেলে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, যেখানে সড়কে প্রাণহানি ছিল কয়েক হাজার।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনে দাঁড়িয়ে থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়ে। ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়। তাই সুযোগ থাকলে বসে ভ্রমণ করাই নিরাপদ।
তাহলে কি ট্রেনে সিটবেল্ট থাকা উচিত
এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখনো ঝুঁকিকে এতটা বেশি মনে করেনি যে, সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
ব্যয়বহুল পুনর্নকশা : বর্তমান ট্রেনের আসন সিটবেল্টের জন্য উপযুক্ত নয়। সিটবেল্ট বসাতে হলে পুরো আসনের নকশা বদলাতে হবে, যা ব্যয়বহুল।
ব্যবহার কম হতে পারে : মেট্রো বা লোকাল ট্রেনের মতো ঘন ঘন থামা ট্রেনে যাত্রীরা বারবার সিটবেল্ট বাঁধা ও খোলায় অনাগ্রহী হতে পারেন। এতে যাত্রা বিলম্বিত হতে পারে।
উল্টো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে : সিটবেল্ট কার্যকর করতে আসন শক্ত করতে হতে পারে। এতে দুর্ঘটনার সময় যারা দাঁড়িয়ে থাকবেন বা সিটবেল্ট ব্যবহার করবেন না, তারা শক্ত আসনে আঘাত পেয়ে বেশি আহত হতে পারেন।
সব যাত্রীর জন্য সম্ভব নয় : অনেক ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাত্রা করার ব্যবস্থা থাকে। সবার জন্য সিটবেল্ট নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়।
ট্রেনকে যা নিরাপদ রাখে
ট্রেনের ভেতরের নকশাও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আসনের অবস্থান, হাতল ও রেলিং এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে দুর্ঘটনার সময় ক্ষতি কম হয়। যুক্তরাষ্ট্রে টাইটেল ৪৯ সিএফআর পার্ট ২৩৮.২৩৩ নামে একটি নিরাপত্তা বিধিমালা রয়েছে, যা ট্রেনের অভ্যন্তরীণ নকশা নিয়ে মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
মেট্রো ও দূরপাল্লার ট্রেনের নকশা ভিন্ন হতে পারে। মেট্রো কোচ সাধারণত বেশি টেকসই ও কম আসবাবযুক্ত হয়, কারণ সেগুলো বেশি ব্যবহৃত ও কখনও কখনও ভিড়পূর্ণ।
কোনো পরিবহন ব্যবস্থাই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে পরিসংখ্যান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ট্রেন ভ্রমণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। ট্রেনের ওজন, নিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির কারণে সিটবেল্টের প্রয়োজন এখনো অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়নি।
তাই ট্রেনে সিটবেল্ট না থাকাটা অদ্ভুত মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বাস্তবভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ। যাত্রীদের জন্য মূল বার্তা হলো সতর্ক থাকা, দাঁড়িয়ে না থেকে সম্ভব হলে বসে যাত্রা করা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা।
সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট