লোডশেডিংয়ে ফ্রিজের খাবার কতক্ষণ ভালো থাকে, জেনে নিন সঠিক হিসাব

লোডশেডিং হলে প্রথম চিন্তা হয় ফ্রিজ নিয়ে। ভেতরে রাখা মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, রান্না করা খাবার বা অন্যান্য পচনশীল খাবার কতক্ষণ ভালো থাকবে, বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজের ঠান্ডা কতক্ষণ থাকবে, আর কখন খাবার ফেলে দিতে হবে, এসব নিয়ে অনেকেরই দুশ্চিন্তা থাকে।
বিশেষ করে গরমের দিনে বিদ্যুৎ কয়েক ঘণ্টা না থাকলে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। তবে বিদ্যুৎ চলে গেলেই খাবার সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায় না। ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখলে সাধারণ একটি ফ্রিজ প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখতে পারে। অন্যদিকে দরজা না খুলে রাখলে পূর্ণ ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা এবং অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠান্ডা রাখতে পারে।
তাই লোডশেডিংয়ের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অযথা ফ্রিজের দরজা না খোলা।
বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজ কতক্ষণ ঠান্ডা থাকে?
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফ্রিজের কম্প্রেসর কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা বাতাস এবং আগে থেকে ঠান্ডা থাকা খাবারের কারণে তাপমাত্রা সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় না।
দরজা বন্ধ থাকলে সাধারণ ফ্রিজের ভেতরের খাবার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ থাকতে পারে। তবে এটি একটি সাধারণ নির্দেশনা। ফ্রিজ কতটা ভর্তি, ঘরের তাপমাত্রা কত, দরজা কতবার খোলা হচ্ছে এবং ফ্রিজের গঠন ও নিরোধক ব্যবস্থা কেমন, এসবের ওপর ঠান্ডা থাকার সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
তাই ৪ ঘণ্টাকে এমন কোনো নির্দিষ্ট সময় হিসেবে দেখা ঠিক নয় যে তার আগে খাবার অবশ্যই নিরাপদ এবং পরে সব খাবার অবশ্যই নষ্ট।
সবচেয়ে জরুরি নিয়ম, ফ্রিজের দরজা খুলবেন না
লোডশেডিংয়ের সময় অনেকেই বারবার ফ্রিজ খুলে ভেতরে তাকান। এটি আসলে খাবার দ্রুত গরম হওয়ার অন্যতম কারণ।
প্রতিবার দরজা খুললে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যায় এবং বাইরের তুলনামূলক গরম বাতাস ভেতরে ঢোকে। ফলে ফ্রিজের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে।
তাই বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রয়োজন ছাড়া ফ্রিজের দরজা খুলবেন না। কী খাবার আছে তা আগে থেকেই জানা থাকলে আরও ভালো। মার্কিন কৃষি বিভাগ ও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন - দুটিই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়।
ফ্রিজে থার্মোমিটার রাখা ভালো
ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো appliance thermometer ব্যবহার করা।
খাবার সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা উচিত। ফ্রিজারে লক্ষ্য হওয়া উচিত ০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর থার্মোমিটার দেখে বোঝা সহজ হয় খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় ছিল কি না।
লোডশেডিং দীর্ঘ হলে কী করবেন?
বিদ্যুৎ চার ঘণ্টার বেশি সময় না থাকার সম্ভাবনা থাকলে আগে থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা করা ভালো।
একটি ইনসুলেটেড কুলার বা আইসবক্সে খাবার স্থানান্তর করা যায়। সেখানে বরফ বা frozen gel pack দিয়ে খাবার ঠান্ডা রাখতে হবে। তবে শুধু বরফ দিলেই হবে না, খাবারের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
যদি বাড়িতে আগে থেকে কিছু পানির বোতল বা পাত্র জমিয়ে রাখা থাকে, সেগুলোও ঠান্ডা ধরে রাখতে কাজে লাগতে পারে।
ফ্রিজার তুলনামূলক বেশি সময় ঠান্ডা থাকে
রেফ্রিজারেটরের তুলনায় ফ্রিজার বিদ্যুৎ না থাকলেও অনেক বেশি সময় ঠান্ডা থাকতে পারে।
দরজা বন্ধ রাখা হলে পূর্ণ ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা এবং অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিজার যত বেশি ভর্তি থাকবে, সাধারণত তত বেশি সময় ঠান্ডা ধরে রাখতে পারবে। তবে ফ্রিজার অতিরিক্ত ভর্তি করে এমনভাবে রাখা উচিত নয় যাতে ঠান্ডা বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।
বিদ্যুৎ আসার পরই সব খাবার খাবেন না
বিদ্যুৎ ফিরে এলে অনেকে ভাবেন, ফ্রিজ আবার ঠান্ডা হতে শুরু করেছে, তাই ভেতরের সব খাবার নিরাপদ। বিষয়টি এত সহজ নয়।
প্রথমে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন। যদি পচনশীল খাবার ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় থাকে, সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাড়তে পারে। শুধু খাবার আবার ঠান্ডা করে ফেললেই আগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
বিশেষ করে মাছ, মাংস, মুরগি, ডিম, দুধ, রান্না করা খাবার ও অবশিষ্ট খাবারের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকলে কী করবেন?
ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা থাকলে সাধারণভাবে প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকলে পচনশীল খাবার নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।
মার্কিন কৃষি বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ না থাকা অবস্থায় রেফ্রিজারেটেড পচনশীল খাবার চার ঘণ্টার বেশি নিরাপদ তাপমাত্রার বাইরে থাকলে ফেলে দেওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচা বা রান্না করা মাংস, মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, কিছু দুগ্ধজাত খাবার এবং বেঁচে যাওয়া খাবার।
তবে খাবার আগে থেকেই কুলার বা বরফের মধ্যে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা গেলে পরিস্থিতি আলাদা।
আরও পড়ুন
ফ্রিজ ঠান্ডা হচ্ছে না, এই অংশটি পরিষ্কার করলেই মিলতে পারে সমাধান
ফ্রিজারের বরফ দ্রুত গলাতে চান, জেনে নিন সহজ ও নিরাপদ পদ্ধতি
ফ্রিজের ওপর এই ১৩ জিনিস রাখা উচিত নয়, বাড়তে পারে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
গন্ধ দেখে খাবার নিরাপদ কি না বোঝা যাবে?
না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
অনেকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর খাবারের গন্ধ শুঁকে বা একটু স্বাদ নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন খাবার নষ্ট হয়েছে কি না। এটি নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হলেও সব সময় খাবারের গন্ধ, স্বাদ বা চেহারায় পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই শুধু দেখে বা শুঁকে খাবার নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মার্কিন কৃষি বিভাগ স্পষ্টভাবে খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করতে কখনো স্বাদ নেওয়া উচিত নয় বলে জানিয়েছে।
ফ্রিজে কোন খাবার নিয়ে বেশি সতর্ক হবেন?
লোডশেডিংয়ের সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে এমন খাবারের মধ্যে রয়েছে-
- কাঁচা মাছ ও মাংস
- মুরগি
- ডিম
- দুধ ও কিছু দুগ্ধজাত খাবার
- রান্না করা মাংস বা মাছ
- ভাত, তরকারি ও অন্যান্য বেঁচে যাওয়া খাবার
- মাংস বা ডিম দিয়ে তৈরি সালাদ
- স্যুপ ও ঝোলজাত খাবার
- কাটা ফল ও সবজি
- ক্রিম বা কাস্টার্ড যুক্ত খাবার
এসব খাবার নিরাপদ তাপমাত্রার বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
লোডশেডিংয়ের আগে যে প্রস্তুতি রাখতে পারেন
বিদ্যুৎ কখন চলে যাবে তা সব সময় জানা যায় না। তাই কিছু প্রস্তুতি আগে থেকে রাখা ভালো।
পানির বোতল জমিয়ে রাখুন
কয়েকটি পরিষ্কার পানির বোতল বা উপযুক্ত পাত্রে পানি জমিয়ে ফ্রিজারে রাখা যেতে পারে। বিদ্যুৎ চলে গেলে এগুলো বরফ হিসেবে ঠান্ডা ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
বরফ বা gel pack রাখুন
বাড়িতে কয়েকটি reusable gel pack বা পর্যাপ্ত বরফ থাকলে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে খাবার কুলারে স্থানান্তর করা সহজ হবে।
ফ্রিজার খুব খালি রাখবেন না
ফ্রিজারে খাবার তুলনামূলক বেশি থাকলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ঠান্ডা ধরে রাখতে সুবিধা হয়। মার্কিন কৃষি বিভাগও ফ্রিজারের খাবার একসঙ্গে কাছাকাছি রাখার পরামর্শ দেয়, কারণ এতে ঠান্ডা বেশি সময় ধরে রাখা যায়।
ফ্রিজের থার্মোমিটার রাখুন
একটি appliance thermometer থাকলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর এবং বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় তাপমাত্রা পরীক্ষা করা সহজ হয়।
গরমের দিনে আরও সতর্কতা দরকার
বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘ লোডশেডিং হলে খাবার নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘরের তাপমাত্রা বেশি হলে ফ্রিজের বাইরের পরিবেশও তুলনামূলক উষ্ণ থাকে।
তাই গরমের দিনে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজ বারবার খোলার অভ্যাস একেবারেই এড়িয়ে চলা উচিত। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বরফসহ কুলারে পচনশীল খাবার স্থানান্তর করা নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
ফ্রিজ ঠান্ডা হতে কত সময় লাগে?
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ফ্রিজ সঙ্গে সঙ্গে আগের তাপমাত্রায় পৌঁছে যায় না। কম্প্রেসর চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে ভেতরের তাপমাত্রা কমতে থাকে।
তাই বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে দরজা বারবার খুলে খাবার পরীক্ষা করা ঠিক নয়। দরজা বন্ধ রাখলে ফ্রিজ দ্রুত ঠান্ডা হতে সুবিধা হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ফ্রিজ ঠান্ডা হয়েছে মানেই বিদ্যুৎ না থাকার সময় খাবার নিরাপদ ছিল, এমন নয়। খাবার কতক্ষণ নিরাপদ তাপমাত্রার বাইরে ছিল সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সহজে মনে রাখুন, লোডশেডিং হলে কয়েকটি নিয়ম মনে রাখলেই খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমানো যায়-
- দরজা বন্ধ রাখুন।
- প্রয়োজন ছাড়া ফ্রিজ খুলবেন না।
- ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখার চেষ্টা করুন।
- চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকলে পচনশীল খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করুন।
- দীর্ঘ লোডশেডিং হলে বরফসহ কুলারে খাবার স্থানান্তর করুন।
- ফ্রিজারে বরফের কণা থাকা খাবার সাধারণত পুনরায় জমিয়ে রাখা যেতে পারে, যদি খাবার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে থাকে।
- খাবার নিরাপদ কি না বুঝতে কখনো স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করবেন না। সন্দেহ হলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
লোডশেডিং হলেই ফ্রিজের সব খাবার নষ্ট হয়ে যায় না। ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা গেলে সাধারণভাবে প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত রেফ্রিজারেটরের খাবার নিরাপদ থাকার সুযোগ থাকে। ফ্রিজার আরও দীর্ঘ সময় ঠান্ডা রাখতে পারে।
তবে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে। তাই বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ফ্রিজ না খোলা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বরফ বা gel pack ব্যবহার করে খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাবার দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক মনে হলেই সেটি নিরাপদ এমন নয়। তাপমাত্রা ও কতক্ষণ ঠান্ডার বাইরে ছিল, এই দুই বিষয়ই খাবারের নিরাপত্তা বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টিভি ৯ বাংলা

