শরীরের সবচেয়ে নোংরা অংশ কোনটি, জানলে অবাক হবেন

প্রতিদিন গোসল করেন, হাত-পা পরিষ্কার করেন, দাঁত মাজেন, চুল ধোন। শরীরের পরিচ্ছন্নতার জন্য এত কিছু করলেও এমন একটি ছোট জায়গা অনেক সময় আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেটি হলো নাভি।
নাভি শরীরের এমন একটি অংশ, যেখানে বাতাস কম পৌঁছায় এবং ঘাম, ত্বকের মৃত কোষ, কাপড়ের আঁশ ও ময়লা জমে থাকতে পারে। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে নানা ধরনের জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে।
এ কারণেই নাভিকে শরীরের জীবাণুসমৃদ্ধ অংশগুলোর একটি বলা হয়। তবে শরীরের একটিমাত্র অংশকে সবচেয়ে নোংরা বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। কারণ শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের অণুজীব স্বাভাবিকভাবেই থাকে। নাভিতে অবশ্য ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেশ চমকপ্রদ।
নাভিতে এত ব্যাকটেরিয়া কেন?
নাভির গঠনই এর অন্যতম কারণ। শরীরের অন্যান্য খোলা অংশের তুলনায় নাভি বেশ গভীর ও আড়াল করা জায়গা। বিশেষ করে ভেতরের দিকে ঢুকে থাকা নাভিতে ঘাম, ত্বকের মৃত কোষ এবং কাপড়ের সূক্ষ্ম আঁশ আটকে থাকতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয় শরীরের স্বাভাবিক জীবাণু। ত্বকের ওপর অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব থাকে। নাভির মতো উষ্ণ ও তুলনামূলক আর্দ্র জায়গায় তাদের কিছু প্রজাতি টিকে থাকতে পারে।
২০১২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৬০ জন মানুষের নাভি পরীক্ষা করে গবেষকেরা ২,৩৬৮ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছিলেন। এর মধ্যে অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়া গবেষকদের কাছে তখন নতুন ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি মানুষের নাভিতে একই সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া থাকে। গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার ধরন ও পরিমাণেও পার্থক্য ছিল।
নাভি নোংরা থাকলে কী হতে পারে?
নাভি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখানে ময়লা জমে শক্ত আস্তরণ তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এই ময়লা দেখতে কালচে বা বাদামি হয়।
এর সঙ্গে ঘাম ও আর্দ্রতা যোগ হলে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে নাভির চারপাশে চুলকানি, লালচে ভাব বা অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
নাভিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তাই নাভিতে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, পুঁজ, ব্যথা, ফোলা বা রক্তপাত দেখা দিলে শুধু পরিষ্কার করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিদিন নাভি পরিষ্কার করতে হবে?
নাভি পরিষ্কার রাখার অর্থ প্রতিদিন জোরে ঘষে পরিষ্কার করা নয়। বরং গোসলের সময় শরীরের অন্যান্য অংশের মতো নাভিও আলতোভাবে পরিষ্কার করা উচিত।
সাবান ও পানি দিয়ে নাভির বাইরের অংশ পরিষ্কার করা যায়। এরপর ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
যাদের নাভি গভীর, তারা আলতোভাবে পরিষ্কার করার দিকে একটু বেশি নজর দিতে পারেন। তবে নাভির ভেতরে জোর করে কিছু ঢুকিয়ে পরিষ্কার করা উচিত নয়।
কটন বাড ব্যবহার করবেন?
নাভি পরিষ্কারের জন্য অনেকে কটন বাড ব্যবহার করেন। কিন্তু সেটি দিয়ে জোরে ঘষাঘষি করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত ঘষলে ত্বকে ছোটখাটো ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং এতে অস্বস্তি বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যদি নাভিতে দীর্ঘদিনের জমাট ময়লা থাকে এবং সহজে পরিষ্কার না হয়, তখন জোর করে তুলে ফেলার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নাভিতে থাকা সব ব্যাকটেরিয়া কি ক্ষতিকর?
না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শরীরের ত্বক, মুখ, অন্ত্রসহ বিভিন্ন জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য অণুজীব থাকে। তাদের সবাই ক্ষতিকর নয়। অনেক অণুজীব শরীরের স্বাভাবিক জীবাণুসমষ্টির অংশ।
তাই নাভিতে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া মানেই সেখানে সংক্রমণ হয়েছে, এমন নয়।
সমস্যা হয় যখন জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হয় বা কোনো ক্ষতিকর জীবাণু অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে সংক্রমণ তৈরি করে। তখন ব্যথা, লালচে ভাব, দুর্গন্ধ, পুঁজ বা ফোলার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
শুধু নাভি নয়, শরীরের আরও কিছু অংশেও থাকে প্রচুর জীবাণু
আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকে। মুখ তার একটি বড় উদাহরণ। মুখে অসংখ্য অণুজীবের বাস এবং তাদের মধ্যে অনেকগুলো স্বাভাবিকভাবে শরীরের অংশ হয়ে থাকে।
আবার হাতও জীবাণু ছড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাত দিয়ে আমরা নিয়মিত বিভিন্ন জিনিস স্পর্শ করি এবং পরে সেই হাত দিয়ে মুখ, চোখ বা খাবার স্পর্শ করতে পারি। তাই হাত পরিষ্কার রাখা সংক্রমণ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ শুধু একটি অংশকে সবচেয়ে নোংরা বলে ভয় পাওয়ার চেয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশের পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাভি পরিষ্কার রাখার সহজ নিয়ম
নাভি পরিষ্কার রাখতে খুব জটিল কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই।
গোসলের সময় পানি ও হালকা সাবান দিয়ে নাভি আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। এরপর ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। গোসল শেষে নাভির ভেতরে পানি বা আর্দ্রতা জমে থাকলে পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে শুকিয়ে নিন।
-a962c2.jpg)
অতিরিক্ত সুগন্ধি, জীবাণুনাশক বা শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করে নাভি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। এগুলো ত্বকে জ্বালা বা শুষ্কতা তৈরি করতে পারে।
নাভিতে ময়লা জমলে কী করবেন?
নাভির ভেতরে যদি শুধু সামান্য ময়লা বা ত্বকের মৃত কোষ জমে থাকে, নিয়মিত গোসলের সময় ধীরে ধীরে পরিষ্কার করলেই সাধারণত যথেষ্ট।
কিন্তু যদি ময়লা শক্ত হয়ে যায়, দুর্গন্ধ থাকে, ব্যথা হয় বা নাভি থেকে তরল বা পুঁজ বের হয়, তখন নিজে জোর করে পরিষ্কার করার চেষ্টা না করাই ভালো।
বিশেষ করে বারবার একই সমস্যা হলে এর পেছনে সংক্রমণ বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না, তা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নাভি থেকে দুর্গন্ধ কেন হয়?
নাভিতে ঘাম, ত্বকের মৃত কোষ, ময়লা ও কাপড়ের আঁশ জমে থাকলে সেগুলোতে থাকা অণুজীবের কার্যকলাপের কারণে দুর্গন্ধ হতে পারে।
নাভি যদি গভীর হয় এবং সেখানে নিয়মিত পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে এই সমস্যা আরও সহজে দেখা দিতে পারে। নাভি পরিষ্কার করার পরও যদি দুর্গন্ধ থেকে যায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে দুর্গন্ধের সঙ্গে ব্যথা, লালচে ভাব, ফোলা বা পুঁজ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নাভি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
নাভিতে ব্যাকটেরিয়া থাকে শুনে অনেকে মনে করতে পারেন, নাভি যত বেশি ঘষে পরিষ্কার করা যাবে তত ভালো। আসলে তা নয়।
অতিরিক্ত পরিষ্কার করতে গিয়ে ত্বকে আঘাত করা বা শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করা বরং সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আবার নাভিতে জীবাণু আছে বলেই সেটি শরীরের জন্য বিপজ্জনক, এমন ধারণাও ঠিক নয়। শরীরের স্বাভাবিক জীবাণুসমষ্টির বড় একটি অংশ আমাদের সঙ্গে সহাবস্থান করে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নাভি পরিষ্কার রাখার পরও যদি নিচের কোনো সমস্যা থাকে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-
- নাভির চারপাশে লালচে ভাব বা ফোলা
- স্পর্শ করলে ব্যথা
- পুঁজ বা অন্য কোনো তরল বের হওয়া
- বারবার দুর্গন্ধ হওয়া
- চুলকানি বা জ্বালাপোড়া দীর্ঘদিন থাকা
- নাভির আশপাশের ত্বকে ক্ষত তৈরি হওয়া
এ ধরনের লক্ষণ থাকলে শুধু ময়লা জমেছে ধরে নিয়ে নিজে চিকিৎসা না করাই ভালো।
নাভি শরীরের ছোট একটি অংশ হলেও সেখানে নানা ধরনের অণুজীব থাকতে পারে। একটি গবেষণায় মাত্র ৬০ জন মানুষের নাভির নমুনায় ২,৩৬৮ ধরনের ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছিল।
তবে নাভিতে ব্যাকটেরিয়া থাকা অস্বাভাবিক নয় এবং সব ব্যাকটেরিয়াই ক্ষতিকর নয়। বরং শরীরের বিভিন্ন অংশেই স্বাভাবিকভাবে অসংখ্য অণুজীব বাস করে।
তাই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত গোসলের সময় নাভি আলতোভাবে পরিষ্কার করা, পরিষ্কারের পর শুকিয়ে রাখা এবং অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, ব্যথা বা পুঁজের মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই যথেষ্ট।
সূত্র: নিউজ ১৮



