পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল রংগুলো জেনে নিন

আমরা অনেকেই ভাবি রং সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারণা আছে। কিন্তু কিছু রঙের পেছনের গল্প এতটাই অদ্ভুত ও বিস্ময়কর যে শুনলে অবাক হতে হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চোখ প্রায় এক কোটি ভিন্ন রং আলাদা করে চিনতে পারে। আমাদের চোখে মূলত তিন ধরনের কোষ আছে, যা লাল, সবুজ ও নীল রং অনুভব করে। এই তিন রঙের মিশ্রণ থেকেই তৈরি হয় অসংখ্য শেড ও টোন। রংধনুর সাতটি পরিচিত রং লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, জ্যামনি ও বেগুনি।
কিন্তু এর বাইরেও আছে অসংখ্য বিরল ও অদ্ভুত রং, যাদের ইতিহাস কখনো রক্তাক্ত, কখনো বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনা, আবার কখনো নিছকই কল্পকাহিনি ঘিরে।
চলুন আজ জেনে নিই পৃথিবীর কিছু বিরল রঙের গল্প।
আল্ট্রামেরিন নীল (Ultramarine blue)
আল্ট্রামেরিন এক সময় এতই দামী ছিল যে এর দাম সোনার চেয়েও বেশি হতো। এই রং তৈরি হতো আফগানিস্তানে পাওয়া লাপিস লাজুলি নামের মূল্যবান পাথর গুঁড়া করে। রংটি এতই বিরল ছিল যে ধর্মীয় চিত্রকলায় বিশেষ চরিত্রের পোশাকে এটি ব্যবহার করা হতো।
১৮২০-এর দশকের শেষ দিকে ফ্রান্স ও জার্মানিতে কৃত্রিমভাবে আল্ট্রামেরিন তৈরি শুরু হয়। এতে ব্যয় ও শ্রম অনেক কমে যায়। বর্তমানে এই রং সহজলভ্য হলেও একসময় এটি ছিল রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক।
কারমেস লাল (Kermes red)

কারমেস লাল ইতিহাসের প্রাচীনতম লাল রংগুলোর একটি। প্রাচীন মিশরীয়রা এটি ব্যবহার করত। এই রং তৈরি হতো কেরমেস নামের এক ধরনের পোকা শুকিয়ে গুঁড়া করে। একটি গাঢ় লাল রং পেতে শত শত পোকা লাগত।
আরও পড়ুন: ৩০ বছরের পর বাড়ে পেটের চর্বি
আরও পড়ুন: ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন কাজ করা শুরু করুন
পরবর্তীতে মেক্সিকোর কোচিনিয়াল পোকা আবিষ্কারের পর কারমেস লালের ব্যবহার কমে যায়, কারণ কোচিনিয়াল থেকে সহজে ও গাঢ় রং পাওয়া যেত। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়।
টাইরিয়ান বেগুনি (Tyrian purple)

টাইরিয়ান বেগুনি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিরল বেগুনি রং। এটি তৈরি হতো এক ধরনের সামুদ্রিক শামুক থেকে। প্রাচীন ফিনিশীয় নগরী টাইর থেকে এই রঙের নাম এসেছে।
শামুক থেকে রং বের করা ছিল কষ্টসাধ্য ও দুর্গন্ধযুক্ত প্রক্রিয়া। এজন্য এই রং হয়ে ওঠে রাজকীয়তার প্রতীক। রাজা-রানির পোশাকে এই রং ব্যবহারের ঐতিহ্য বহুদিন ধরে চলে এসেছে।
ইন্ডিয়ান হলুদ (Indian yellow)

ইন্ডিয়ান হলুদের উৎস নিয়ে রয়েছে বিতর্কিত ইতিহাস। ধারণা করা হয়, ভারতের মুঙ্গের অঞ্চলে গরুকে শুধু আমপাতা খাওয়ানো হতো। অপুষ্ট গরুর প্রস্রাব থেকে তৈরি হতো উজ্জ্বল হলুদ রং।
১৮৮৩ সালে বিষয়টি তদন্তের পর এই অমানবিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Vincent van Gogh তার স্টারি নাইট চিত্রকর্মে এই রং ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়।
মমি ব্রাউন (Mummy brown)

মমি ব্রাউন নামটি শুনতেই অস্বস্তি লাগে। এই রং তৈরি হতো প্রাচীন মমির দেহাংশ গুঁড়া করে। ১৬শ শতক থেকে ২০শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই রং বাজারে পাওয়া যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। এখন মমি জাদুঘরেই সংরক্ষিত থাকে, রং তৈরির উপকরণ হিসেবে নয়।
লেড হোয়াইট (Lead white)

লেড হোয়াইট ছিল শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ সাদা রং। প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোমে এটি ব্যবহৃত হতো। এতে ছিল সীসা কার্বনেট।
রংটি উজ্জ্বল ও ঘন হওয়ায় শিল্পীরা এটি পছন্দ করতেন। কিন্তু পরে জানা যায়, সীসা বিষক্রিয়া মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই আধুনিক সময়ে এটি প্রায় বিলুপ্ত।
আরও পড়ুন: রসুনের যত স্বাস্থ্য উপকারিতা
শিলেস গ্রিন (Scheele’s green)

শিলেস গ্রিন ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগে জনপ্রিয় সবুজ রং। কিন্তু এতে ছিল আর্সেনিক, যা বিষাক্ত। ওয়ালপেপার, পোশাক এমনকি খাবারেও এই রং ব্যবহার হতো। ফলে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ত।
বর্তমানে সবুজ রং তৈরি হয় নিরাপদ উপায়ে, যদিও পরিবেশগত ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।
ভ্যান্টাব্ল্যাক (Vantablack)

ভ্যান্টাব্ল্যাককে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে কালো রং। এটি তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান Surrey NanoSystems।
এই রং ৯৯ দশমিক ৯৬৫ শতাংশ দৃশ্যমান আলো শোষণ করতে পারে। ফলে এটি প্রায় আলোহীন গভীর কালোর মতো দেখায়। এটি মূলত মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহার হয়। শিল্পী Anish Kapoor এই রং ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার পেয়েছিলেন, যা শিল্পজগতে আলোচনার জন্ম দেয়।
ওয়াই ইন এম এন নীল (YInMn blue)

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Oregon State University-এর এক গবেষণাগারে দুর্ঘটনাবশত আবিষ্কৃত হয় নতুন এক নীল রং। গবেষক অ্যান্ড্রু স্মিথ ও তার দল ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড গরম করতে গিয়ে এই উজ্জ্বল নীল তৈরি করেন।
রংটির নামকরণ হয়েছে এতে থাকা উপাদান ইট্রিয়াম, ইন্ডিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও অক্সিজেনের নামের আদ্যক্ষর থেকে। প্রায় দুই শতক পর এটি ছিল প্রথম নতুন নীল রঙের আবিষ্কার।
কোয়েরসিট্রন হলুদ (Quercitron yellow)

কোয়েরসিট্রন হলুদ ইতিহাসের প্রায় ভুলে যাওয়া একটি রং। একসময় এটি ডাচ পিঙ্ক নামেও পরিচিত ছিল, যদিও সেটি আসলে হলুদ রং। ১৮শ শতকে পিঙ্ক শব্দটি অনেক সময় হলুদ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, যা এখন বিভ্রান্তিকর মনে হয়।
এই রং তৈরি হতো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাকথর্ন ফল থেকে অথবা আমেরিকার ব্ল্যাক ওক গাছের ভেতরের হলুদ বাকল থেকে। ১৯শ শতকে কৃত্রিম রং বাজারে আসার পর এর ব্যবহার কমে যায়।
ড্রাগনস ব্লাড লাল (Dragon’s blood red)

নামের সঙ্গে ড্রাগনের কোনো সম্পর্ক নেই। ড্রাগনস ব্লাড লাল আসলে এক ধরনের রেজিন বা আঠা, যা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইয়েমেনে জন্মানো রাটান পাম বা ড্রাসিনা প্রজাতির গাছ থেকে পাওয়া যায়।
প্রাচীন রোমানরা এটি রং হিসেবে ব্যবহার করত। পরবর্তীতে শিল্পীরা এটি দিয়ে ছবি আঁকতেন। ১৯০০ শতকের পর এটি বেশি ব্যবহৃত হয় বার্নিশ হিসেবে। এখনো বেহালা পালিশ করতে এই রেজিন ব্যবহার করা হয়।
গ্যামবোজ হলুদ (Gamboge yellow)

গ্যামবোজ হলুদ কম্বোডিয়ার একটি গাছের রস থেকে তৈরি হতো। রস শুকিয়ে গুঁড়া করে রং বানানো হতো। তবে এই উপাদান সামান্য পরিমাণেও শক্তিশালী জোলাপ হিসেবে কাজ করে।
চীনা চিত্রকলায় এই রং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইউরোপীয় শিল্পীদের কিছু কাজেও এটি দেখা যায়। বর্তমানে এটি বেশি দেখা যায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের গেরুয়া পোশাকে, বিশেষ করে থেরবাদী বৌদ্ধধর্মে।
বেকার মিলার পিঙ্ক (Baker-Miller pink)

বেকার মিলার পিঙ্ককে অনেক সময় ড্রাঙ্ক ট্যাঙ্ক পিঙ্ক বলা হয়। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের একটি নৌ সংশোধনাগারে বন্দিদের কক্ষ গোলাপি রঙে রাঙানো হয়। ধারণা ছিল, এই রং মানুষের আগ্রাসী আচরণ কমায়।
প্রতিষ্ঠানের দুই পরিচালকের নামানুসারে রংটির নাম হয় বেকার মিলার পিঙ্ক। পরবর্তীতে কিছু মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কারাগারেও এই রং ব্যবহার করা হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এর শান্ত প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী নয়।
ওউড নীল (Woad blue)

আল্ট্রামেরিন বা কোবাল্টের আগেও প্রাচীন বিশ্বে নীল রঙের অন্যতম উৎস ছিল ওউড নামের একটি উদ্ভিদ। এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জন্মাত এবং নব্য প্রস্তর যুগ থেকে রং হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এই গাছ থেকে পাওয়া ইন্ডিগোটিন নামের যৌগই নীল রঙের উৎস। একসময় ধারণা ছিল, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের প্রাচীন কেল্টিক যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে শরীরে এই নীল রং মাখত। তবে ইতিহাসবিদরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে কৃত্রিম রঙের কারণে ওউড নীল বিরল হয়ে গেছে, যদিও কিছু কারুশিল্পে এখনো এটি ব্যবহার হয়।
সিনাবার লাল (Cinnabar red)

সিনাবার লাল দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এটি মূলত পারদের প্রধান আকরিক, যার রাসায়নিক নাম মার্কারি সালফাইড। আগ্নেয়গিরির অঞ্চলে এটি তৈরি হয়। অনেকেই একে ভারমিলিয়ন নামেও চেনেন।
গুঁড়া অবস্থায় এটি শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে গেলে ক্ষতিকর হতে পারে। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি নিরাপদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এটি মৃৎশিল্প, আসবাব, শিল্পকর্ম ও প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়েছে।
রঙের জগৎ শুধু সৌন্দর্যের নয়, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও কখনো নির্মম বাস্তবতারও গল্প বহন করে। কোনো রং এসেছে পাথর গুঁড়া করে, কোনোটি পোকা বা শামুক থেকে, আবার কোনোটি ল্যাবরেটরির দুর্ঘটনা থেকে। কিছু রং মানুষের সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছে, আবার কিছু রং মানবস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছে।
আজ প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা নিরাপদ ও টেকসই রং ব্যবহার করতে পারি। তবে এই বিরল রঙগুলোর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্প ও বিজ্ঞানের পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু অজানা গল্প।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট