logo

শিশুদের কখন রোজা শুরু করা উচিত, জানালেন বিশেষজ্ঞরা

শিশুদের কখন রোজা শুরু করা উচিত, জানালেন বিশেষজ্ঞরা

রমজান মাস শুধু খাবার না খাওয়া নয়, এটি ধৈর্য, সংযম এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ শেখার একটি সময়। এই মাসে সবাই চেষ্টা করে শারীরিক ও মানসিকভাবে আরও সচেতন হতে এবং নিজেদের ছোট ছোট অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তবে শিশুদের জন্য রোজা শুরু করার বিষয়টি সব সময় সহজ বা নির্দিষ্ট নয়। 

ছোটদের শরীর এবং সুস্থতা ভিন্নভাবে কাজ করে, তাই তাদের জন্য পুরো দিন রোজা রাখা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে সাত বছর বয়সি একটি শিশু পুরো দিন রোজা রাখার পরে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। এই ঘটনা অনেক পরিবারকে ভাবতে বাধ্য করেছে - শিশুরা কখন থেকে রোজা শুরু করতে পারবে এবং কীভাবে তা নিরাপদভাবে করা সম্ভব।

শিশুদের জন্য রোজা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। তাই অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুদের সুস্থতা ও নিরাপত্তাকে প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া - এসবই শিশুদের জন্য রোজা শেখার নিরাপদ পথ।

শিশুদের জন্য রোজা কি ফরজ

ধর্মীয় আলেমদের মতে, ছোট শিশুদের জন্য রোজা ফরজ নয়। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে রোজা বাধ্যতামূলক নয়।

ধর্মভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্ল্যাটফর্ম ইসলাম কিউ অ্যান্ড এ জানিয়েছে, শিশুদের ওপর রোজা ফরজ নয়। কোন বয়সে সন্তানকে রোজায় অভ্যস্ত করা হবে, তা নির্ভর করে তার শারীরিক সক্ষমতার ওপর।

একইভাবে ইসলাম স্ট্যাক এক্সচেঞ্জে আলোচনায় বলা হয়েছে, শিশুর স্বাস্থ্য, শারীরিক গঠন, পারিবারিক সংস্কৃতি ও পরিবেশসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে রোজা শুরু করার উপযুক্ত সময় নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ সবার জন্য একক কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।

চিকিৎসকদের মতামত

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় অনুশীলনের আগে শিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দুবাইয়ের মেডিক্লিনিক আল সুফুহর শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. স্পর্শ পাসি সতর্ক করে বলেন, রমজানে সঠিক খাদ্যাভ্যাস না মানলে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও শারীরিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তার মতে, সন্তান রোজা রাখতে চাইলে অভিভাবকদের তার খাবার ও পানির বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি শিশুর আগে থেকে কোনো শারীরিক অসুস্থতা থাকে, তাহলে রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, নয় বছরের আগে শিশুদের নিয়মিত রোজা শুরু না করাই ভালো। সাধারণত নয় থেকে ১৪ বছরের মধ্যে ছেলে ও মেয়েরা ধীরে ধীরে রোজায় অভ্যস্ত হতে পারে। তবে পুরো সময় জুড়ে তাদের শক্তি, দুর্বলতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তির লক্ষণ খেয়াল রাখতে হবে।

ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করার পরামর্শ

দুবাইয়ের আমেরিকান হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবির খায়াত বলেন, সব শিশু এক রকম নয়। কেউ আগ্রহ দেখালে তাকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে, তবে অসুস্থ বা দুর্বল শিশুকে রোজা রাখতে দেওয়া উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল বা প্রায় ১৫ বছর বয়সের পর শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো রোজা রাখতে সক্ষম হয়।

ডা. খায়াতের মতে, রোজা রাখার সক্ষমতা নির্ভর করে শিশুর সার্বিক জীবনযাপনের ওপর। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং সারাবছর সুস্থ জীবনধারা বজায় থাকলে রোজা রাখা সহজ হয়।

অভিভাবকরা যদি সন্তানের পুষ্টিগত অবস্থা নিয়ে সন্দিহান হন, তাহলে রোজার আগে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ভালো।

শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করার কিছু উপায়

দুবাইয়ের অ্যাস্টার ক্লিনিক বুর দুবাইয়ের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ্রুতি সিং শিশুদের ধীরে ধীরে রোজায় অভ্যস্ত করার জন্য কয়েকটি ধাপের পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথমত, অর্ধদিবস পদ্ধতি। শুরুতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বা দুপুর থেকে ইফতার পর্যন্ত রোজা রাখার অনুশীলন করানো যেতে পারে। এতে শিশু ক্ষুধার অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হবে, কিন্তু পানিশূন্যতা বা রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে।

দ্বিতীয়ত, ছুটির দিনে অনুশীলন। স্কুলের চাপ না থাকায় সপ্তাহান্ত বা ছুটির দিনে রোজার অনুশীলন করালে অভিভাবকরা শিশুর অবস্থা সহজে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

তৃতীয়ত, সাহরিতে পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার। সাহরিতে পর্যাপ্ত পানি পান, ওটস বা পূর্ণ শস্যজাত খাবারের মতো ধীরে শক্তি সরবরাহ করে এমন খাবার খাওয়ানো উচিত। এতে দিনের বেলা শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়।

চতুর্থত, আংশিক অংশগ্রহণ। ছোট শিশুদের পুরো দিন না খাইয়ে রেখে সাহরিতে জাগানো বা ইফতারে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হবে, কিন্তু শারীরিক ঝুঁকি থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, রোজা কখনোই শিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করে হওয়া উচিত নয়। যদি কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে, অতিরিক্ত দুর্বল লাগে বা অজ্ঞান হয়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে চিকিৎসা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রোজা শুরুর জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সন্তানের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সবার আগে।

ধীরে ধীরে, সচেতনভাবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা। মনে রাখতে হবে, রমজানের মূল শিক্ষা সংযম, সহমর্মিতা ও সচেতনতা। তাই সন্তানের সুস্থতা বজায় রেখেই তাকে রোজার সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত করানো উচিত।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অনেক সময় অত্যন্ত গরম ও আর্দ্র থাকে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে ও পানি ছাড়া থাকলে শিশুদের পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই সন্তানের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পরিবেশ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে যেসব শিশু ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, রক্তস্বল্পতা বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সূত্র : গল্ফ নিউজ