তামা নাকি পিতল, কোন বাসনে খাবার খাওয়া বেশি নিরাপদ

একসময় বাঙালি বাড়ির রান্নাঘর বা খাবার টেবিলে তামা ও পিতলের বাসনের বেশ চল ছিল। এখন স্টিল, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম ও ননস্টিকের ভিড়ে এসব বাসনের ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। তবে ঐতিহ্যবাহী বাসনের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার অনেকের রান্নাঘরে জায়গা করে নিচ্ছে তামা ও পিতলের থালা, গ্লাস, বাটি কিংবা হাঁড়ি।
এই বাসন নিয়ে নানা স্বাস্থ্য উপকারের কথাও প্রচলিত আছে। কেউ তামার পাত্রে রাখা পানিকে উপকারী মনে করেন, আবার কেউ পিতলের বাসনে রান্না করা খাবারকে পুষ্টিকর বলে মনে করেন। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য বলছে, শুধু ধাতুর নাম দেখেই কোন বাসন শরীরের জন্য ভালো বা খারাপ তা নির্ধারণ করা যায় না। বাসনের গঠন, ভেতরের আবরণ, কী খাবার রাখা হচ্ছে এবং কীভাবে সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
পিতলের বাসন আসলে কী?
পিতল একটি সংকর ধাতু, যার প্রধান উপাদান তামা ও জিঙ্ক। এই দুই খনিজই মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয়। তামা রক্তকণিকা তৈরি, আয়রন বিপাক, সংযোজক টিস্যু ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ শরীরের বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে। জিঙ্কও শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয়।
তবে পিতলের বাসনে রান্না বা খাবার খেলেই শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তামা ও জিঙ্ক নিশ্চিতভাবে পূরণ হবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খনিজ পাওয়ার জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যতালিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় হলো, পিতল সবসময় শুধু তামা ও জিঙ্ক দিয়ে তৈরি হয় না। বিভিন্ন নির্মাতা বা পণ্যে অন্য ধাতুও থাকতে পারে। তাই খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্য তৈরি এবং নিরাপদ মানসম্পন্ন বাসন বেছে নেওয়া জরুরি।
তামার বাসনের বিশেষত্ব কোথায়?
তামা তাপ খুব ভালোভাবে পরিবহন করতে পারে। ফলে তামার রান্নার পাত্রে তাপ তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রান্নার দিক থেকে এটি তামার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তামা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজও। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তামা শরীরে গেলে সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত তামার কারণে বমি বমি ভাব, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত সংস্পর্শে লিভারের ক্ষতিও হতে পারে।
তাই তামার বাসন ব্যবহার করা যাবে না, এমন নয়। বরং কোন ধরনের তামার বাসন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং খাবারের সঙ্গে সরাসরি তামার সংস্পর্শ হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁচা তামার বাসনে সব খাবার রান্না করা ঠিক নয়
তামা তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ধাতু। বিশেষ করে অ্যাসিডিক খাবারের সঙ্গে সরাসরি তামার সংস্পর্শ হলে তামা খাবারের মধ্যে চলে আসার ঝুঁকি বাড়তে পারে। টমেটো, ভিনেগার, তেঁতুল বা অন্যান্য টক উপাদানযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই খাবারের জন্য তৈরি অনেক তামার বাসনের ভেতরে অন্য ধাতুর আবরণ দেওয়া থাকে। এই আবরণ তামা ও খাবারের মধ্যে সরাসরি সংস্পর্শ কমাতে সাহায্য করে।
তবে আবরণ উঠে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই বাসন ব্যবহার করা নিরাপদ নাও হতে পারে। কানাডার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত বা আবরণহীন তামার বাসনে রান্না বা খাবার সংরক্ষণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
তামার পাত্রে রাখা পানি কি সত্যিই বিশেষ উপকারী?
তামার পাত্রে পানি রেখে খাওয়ার প্রচলন বহু পুরোনো। আয়ুর্বেদে এমন কিছু দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তামার পাত্রে কয়েক ঘণ্টা রাখা পানির উপকারের কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব দাবিকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বা রোগ প্রতিরোধের পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় তামা পাওয়ার জন্য আলাদা করে তামার পানি পান করতেই হবে, এমন প্রমাণ নেই।
বরং তামার পাত্রে পানি দীর্ঘ সময় রেখে দিলে তাতে তামা মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাত্র পুরোনো, ক্ষয়প্রাপ্ত বা অনুপযুক্ত হলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পিতলের বাসনে সবচেয়ে বড় সতর্কতা কোথায়?
পিতল নিয়ে কথা বলার সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো সীসা বা লেডের উপস্থিতির সম্ভাবনা।
২০২৪ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে তদন্তের সময় নেপাল থেকে আসা কিছু ঐতিহ্যবাহী পিতল ও কাঁসার বাসনে উচ্চমাত্রার সীসা পাওয়া যায়। ওই বাসন ব্যবহার করা একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যের রক্তেও স্বাভাবিক রেফারেন্স মাত্রার ওপরে সীসা পাওয়া গিয়েছিল। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী ধাতব বাসন খাবার ও পানীয় তৈরির সময় সীসার সংস্পর্শের উৎস হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নির্দিষ্ট কিছু আমদানি করা পিতল ও অন্যান্য ধাতব রান্নার বাসন নিয়ে সতর্ক করেছে। পরীক্ষায় কিছু পণ্যে খাবারের মধ্যে সীসা চলে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এর অর্থ এই নয় যে সব পিতলের বাসনেই সীসা থাকে। বরং বাসন কেনার সময় এর মান, নির্মাতা এবং খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই করা জরুরি।
তাহলে তামা না পিতল?
দুটিরই আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তামা তাপ পরিবহনে ভালো এবং শরীরের প্রয়োজনীয় একটি খনিজের উৎস। পিতলও তামা ও জিঙ্কের সংকর ধাতু। কিন্তু শুধু স্বাস্থ্য উপকারের কথা বিবেচনা করে একটিকে অন্যটির চেয়ে ভালো বলে দেওয়া ঠিক হবে না।
বাসনের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে পিতলের ক্ষেত্রে সীসা বা অন্য অনুপযুক্ত ধাতু মিশ্রিত আছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তামার ক্ষেত্রে ভেতরের আবরণ অক্ষত আছে কি না এবং অ্যাসিডিক খাবারের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।
তামা ও পিতলের বাসন ব্যবহার করলে যা মনে রাখবেন
খাবারের উপযোগী বাসন কিনুন: শুধু দেখতে সুন্দর বা ঐতিহ্যবাহী হলেই সেটি রান্নার জন্য নিরাপদ ধরে নেবেন না।
আবরণ পরীক্ষা করুন: তামার বাসনের ভেতরের আবরণ উঠে গেলে, ফেটে গেলে বা ক্ষয়ে গেলে সেটি রান্নার কাজে ব্যবহার না করাই ভালো।
টক খাবারে সতর্ক থাকুন: আবরণহীন তামার পাত্রে টক বা অ্যাসিডিক খাবার রান্না বা সংরক্ষণ করবেন না।
পুরোনো বাসন পরীক্ষা করুন: বহু পুরোনো বা অজানা উৎসের পিতলের বাসনে কী ধাতু মেশানো আছে, তা জানা না থাকলে খাবার রান্না বা সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
ধাতব বাসন অতিরিক্ত ঘষে পরিষ্কার করবেন না: এতে প্রতিরক্ষামূলক আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তামার বাসন পরিষ্কারে মৃদু ডিটারজেন্ট ও নরম কাপড় বা স্পঞ্জ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
পাত্রে খাবার দীর্ঘ সময় রেখে দেবেন না: বিশেষ করে তামা বা পিতলের বাসনে রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার আগে বাসনটি খাবার সংরক্ষণের জন্য উপযোগী কি না নিশ্চিত হওয়া দরকার।
আধুনিক বাসন কি তাহলে বেশি নিরাপদ?
স্টিল, কাচ বা অন্য আধুনিক রান্নার পাত্র মানেই সবসময় নিরাপদ এবং তামা-পিতল মানেই ক্ষতিকর, এমনটাও বলা যাবে না। প্রতিটি উপাদানেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।
তবে খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্য তৈরি, মানসম্মত এবং অক্ষত বাসন বেছে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাসনের উপাদানের পাশাপাশি তার মান, আবরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যবহারের ধরনও স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
তাই তামা বা পিতলের বাসন ব্যবহার করতে চাইলে ঐতিহ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখুন। বিশেষ করে অজানা উৎসের পিতলের বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত তামার পাত্র খাবারের সংস্পর্শে না আনাই ভালো।
সূত্র: এই সময় অনলাইন


