আজ জাতীয় আপেল দিবস, জানুন এর ইতিহাস ও মজার তথ্য

ছোট থেকেই নিশ্চয়ই শুনেন আসছেন যে, প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ফল রাখা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আর ফলের কথা বলতে গেলে আপেলের নাম সবার আগে মনে পড়ে অনেকেরই। লাল, সবুজ বা হলুদ রঙের এই ফলটি খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি এতে আছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। আপেলের গুরুত্ব, বৈচিত্র্য এবং পরিবেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক তুলে ধরতে প্রতিবছর ২১ অক্টোবর পালিত হয় অ্যাপল ডে, যা ন্যাশনাল অ্যাপল ডে নামেও পরিচিত।
‘অ্যাপল ডে’ শুধু আপেল খাওয়ার আনন্দ উদ্যাপনের জন্য না বরং আপেলের বিভিন্ন জাত, ঐতিহ্যবাহী ফলের বাগান এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করারও একটি উপলক্ষ।
অ্যাপল ডে কী এবং কেন পালিত হয়?
অ্যাপল ডে হলো আপেল ও আপেলের বাগানকে কেন্দ্র করে পালিত একটি বার্ষিক দিবস। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আপেলের বিভিন্ন জাতের পরিচিতি বাড়ানো, ঐতিহ্যবাহী ফলের বাগান রক্ষা করা এবং প্রকৃতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।
অনেকেই বাজারে পাওয়া কয়েক ধরনের আপেলের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু পৃথিবীতে আপেলের জাতের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব জাতের স্বাদ, রং, আকার ও গন্ধেও রয়েছে বৈচিত্র্য। অ্যাপল দিবস মানুষকে এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়।

এ ছাড়া আপেলের বাগান বিভিন্ন পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই দিবসের মাধ্যমে ফলের বাগান সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
অ্যাপল দিবসের উৎপত্তি ও ইতিহাস
অ্যাপল দিবসের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যে। পরিবেশ ও স্থানীয় ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা কমন গ্রাউন্ড (Common Ground) ২১ অক্টোবর প্রথম অ্যাপল দিবস আয়োজন করে।
লন্ডনের কোভেন্ট গার্ডেনের পুরোনো অ্যাপল মার্কেটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম আয়োজনটি। সেখানে প্রায় ৪০টি স্টলে বিভিন্ন জাতের আপেল, আপেলগাছের চারা, আপেলের রস ও সাইডারসহ নানা ধরনের পণ্য প্রদর্শন করা হয়। আপেল নিয়ে বই লেখা লেখক ও চিত্রকরদেরও সেখানে উপস্থিতি ছিল।
এই উদ্যোগের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। যুক্তরাজ্যে ঐতিহ্যবাহী ফলের বাগান হারিয়ে যাচ্ছিল এবং আপেলের অনেক স্থানীয় জাতের পরিচিতিও কমে আসছিল। তাই মানুষকে আপেলের বৈচিত্র্য ও ফলের বাগান সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে এই দিবসের সূচনা করা হয়।
প্রথম আয়োজনের পর ধীরে ধীরে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর, গ্রাম, স্কুল ও স্থানীয় সংগঠনের মধ্যে অ্যাপল দিবস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় এই দিন উপলক্ষে আপেল প্রদর্শনী, ফলের স্বাদ গ্রহণ, রান্নার আয়োজন এবং বাগান পরিচর্যা বিষয়ে নানা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
অ্যাপল ডে পালনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য আছে।

আপেলের বৈচিত্র্য তুলে ধরা: পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত আপেলের নানা জাত সম্পর্কে মানুষকে জানানো এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।
ঐতিহ্যবাহী বাগান সংরক্ষণ: পুরোনো ফলের বাগান শুধু খাদ্য উৎপাদন করে না, বরং স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও ধরে রাখে।
পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো: ফলের বাগান বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব বাগান সংরক্ষণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহ দেওয়া: প্রতিদিনের খাবারে ফল রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতেও এই দিবস মানুষকে উৎসাহিত করে।
আপেল সম্পর্কে ৬টি মজার তথ্য
আপেলকে আমরা পরিচিত ফল হিসেবে জানলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু মজার তথ্য। চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
পৃথিবীতে আপেলের হাজার হাজার জাত রয়েছে
আপেল মানেই শুধু লাল বা সবুজ ফল নয়। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে আপেলের ৭ হাজার ৫০০টিরও বেশি জাত রয়েছে। এসব জাতের মধ্যে স্বাদ, আকার, রং ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যায়।
আপেল পানিতে ভাসতে পারে
আপেলের ভেতরের প্রায় ২৫ শতাংশই বাতাস। এ কারণে আপেল পানিতে ফেললে সাধারণত তা ভেসে থাকে। শিশুদের আপেল দিয়ে খেলার বিভিন্ন আয়োজনেও এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগে।

আপেল ও গোলাপ একই উদ্ভিদ পরিবারের সদস্য
শুনতে অবাক লাগলেও আপেল ও গোলাপ একই উদ্ভিদ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উদ্ভিদবিজ্ঞানে এই পরিবারকে রোজেসি (Rosaceae) বলা হয়। নাশপাতি, পিচ ও বরইও এই পরিবারের সদস্য।
আপেলের আদি উৎস মধ্য এশিয়ার কাছাকাছি
গবেষণায় গৃহপালিত আপেলের উৎপত্তির সঙ্গে মধ্য এশিয়ার একটি অঞ্চলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বর্তমান চীন ও কাজাখস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকার বুনো আপেলকে এর আদি উৎসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
আপেল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার
আপেল শুধু সরাসরি খাওয়ার ফল নয়। এটি দিয়ে জুস, জ্যাম, পাই, কেক, সালাদ এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি খাবার তৈরি করা যায়। কিছু অঞ্চলে আপেল থেকে সাইডারও তৈরি করা হয়।
আপেল দিবসে শুধু ফল খাওয়াই হয় না
অ্যাপল দিবসের আয়োজনগুলোতে আপেলের বিভিন্ন জাত চেনা, ফলের রস তৈরি, আপেল দিয়ে রান্না, বাগান পরিচর্যা এবং শিশুদের জন্য নানা ধরনের খেলার ব্যবস্থা থাকে। কোথাও কোথাও বিশেষজ্ঞরা আপেলের জাত শনাক্ত করতেও সাহায্য করেন।
আপেলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
আপেল খাদ্যতালিকায় রাখার মতো একটি পুষ্টিকর ফল। এতে রয়েছে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আপেলের খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে আপেল খাওয়া হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। তবে শুধু আপেল খেলেই সব ধরনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। শরীর সুস্থ রাখতে বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন।
আপেল খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। এতে ফলের গায়ে থাকা ময়লা ও কিছু দূষিত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে।
ন্যাশনাল অ্যাপল দিবস শুধু একটি ফলকে উদ্যাপনের দিন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কৃষি, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিষয়গুলোও। ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজও মানুষকে আপেলের বৈচিত্র্য ও ফলের বাগান সংরক্ষণের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
