ভিটামিন-ই কমে গেলে শরীরে যে ৭ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে

শরীর সুস্থ রাখতে ভিটামিন ও খনিজের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ভিটামিন ই নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা হলেও শরীরের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরের কোষকে ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ চাপ থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কাজেও এর প্রয়োজন রয়েছে।
তবে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি নিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই জানা দরকার। সুস্থ মানুষের মধ্যে এই ঘাটতি খুবই বিরল। সাধারণত শরীরে চর্বি হজম বা শোষণে সমস্যা থাকলে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ক্রোনস রোগ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, কিছু লিভারের সমস্যা এবং কয়েকটি বিরল বংশগত রোগ এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ভিটামিন ই-এর ঘাটতিতে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ঘাটতি হলে লক্ষণগুলো সাধারণত স্নায়ু ও পেশির সমস্যার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। অন্য অনেক রোগ বা পুষ্টির ঘাটতিতেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে।
পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
ভিটামিন ই-এর গুরুতর ঘাটতিতে পেশি দুর্বল হতে পারে। দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে মাঝেমধ্যে পায়ে টান ধরা বা পেশিতে ব্যথা হলেই সেটিকে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি বলা যাবে না। পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত পরিশ্রম, কিছু ওষুধসহ নানা কারণেও পেশিতে টান ধরতে পারে।
হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব
দীর্ঘদিন গুরুতর ঘাটতি থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে হাত-পায়ে অনুভূতি কমে যাওয়া, ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব দেখা দিতে পারে। এ ধরনের সমস্যা নিয়মিত হলে শুধু ভিটামিনের ঘাটতি ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাঁটাচলায় ভারসাম্যের সমস্যা
ভিটামিন ই-এর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হতে পারে। ফলে হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে অ্যাটাক্সিয়া বলা হয়।
এটি ভিটামিন ই-এর ঘাটতির তুলনামূলক গুরুতর লক্ষণ। এমন সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা
গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ভিটামিন ই-এর ঘাটতিতে চোখের দৃষ্টির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তির অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে দৃষ্টির সমস্যা হলেই ভিটামিন ই-এর ঘাটতি হয়েছে এমন ভাবার কারণ নেই। চোখের বিভিন্ন রোগ, ডায়াবেটিস বা বয়সজনিত কারণেও দৃষ্টির পরিবর্তন হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব
ভিটামিন ই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। গুরুতর ঘাটতি হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ঘন ঘন সর্দি-কাশি হলেই ভিটামিন ই-এর ঘাটতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বারবার সংক্রমণের পেছনে ঘুমের অভাব, অন্য পুষ্টির ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী রোগসহ অনেক কারণ থাকতে পারে।
রক্তের লোহিত কণিকায় সমস্যা
গুরুতর ভিটামিন ই-এর ঘাটতিতে লোহিত রক্তকণিকার ক্ষতি হয়ে হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া হতে পারে। তবে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। তাই ক্লান্তি বা দুর্বলতা থাকলেই ভিটামিন ই-এর ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
স্নায়ু ও পেশির সমন্বয়ে সমস্যা
ভিটামিন ই-এর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক সমন্বয়ে সমস্যা তৈরি করতে পারে। হাত-পায়ের অনুভূতি কমে যাওয়া, হাঁটায় ভারসাম্য হারানো বা নড়াচড়ার নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
চুল পড়া বা বলিরেখা কি ভিটামিন ই-এর ঘাটতির লক্ষণ?
এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার।
ভারতীয় একটি অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও অকাল বলিরেখার মতো বিষয়কে ভিটামিন ই-এর ঘাটতির সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিষয়ক সূত্রে ভিটামিন ই-এর ঘাটতির প্রধান লক্ষণ হিসেবে মূলত স্নায়ু ও পেশির ক্ষতি, অনুভূতি কমে যাওয়া, ভারসাম্যের সমস্যা এবং দৃষ্টির সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
তাই শুধু চুল পড়ছে বা ত্বক শুষ্ক হয়ে গেছে বলে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি হয়েছে ধরে নেওয়া উচিত নয়। এসব সমস্যার পেছনে বংশগত কারণ, হরমোনের সমস্যা, ত্বকের রোগ, আয়রন বা অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতিসহ নানা কারণ থাকতে পারে।
কোন খাবারে ভিটামিন ই বেশি?
ভিটামিন ই পাওয়ার জন্য প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত খাবার। বাদাম, বীজ, উদ্ভিজ্জ তেল এবং কিছু সবুজ শাকসবজি এর ভালো উৎস।
কাঠবাদাম: কাঠবাদাম ভিটামিন ই-এর ভালো উৎস। প্রায় ২৮ গ্রাম বা এক আউন্স কাঠবাদামে প্রায় ৬.৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই পাওয়া যায়।
সূর্যমুখীর বীজ: সূর্যমুখীর বীজেও ভিটামিন ই-এর পরিমাণ ভালো। প্রায় এক আউন্স শুকনা ভাজা সূর্যমুখীর বীজে প্রায় ৭.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই থাকতে পারে।
চিনাবাদাম: চিনাবাদাম সহজলভ্য একটি খাবার এবং এতে ভিটামিন ই রয়েছে। প্রায় এক আউন্স ভাজা চিনাবাদামে ২.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই পাওয়া যায়।

উদ্ভিজ্জ তেল: গমের অঙ্কুরের তেল, সূর্যমুখী তেল ও স্যাফফ্লাওয়ার তেল ভিটামিন ই-এর ভালো উৎস। সয়াবিন ও ভুট্টার তেলেও ভিটামিন ই থাকে।
তবে এর অর্থ বেশি তেল খেতে হবে এমন নয়। তেল ভিটামিন ই-এর উৎস হলেও অতিরিক্ত তেল গ্রহণ স্বাস্থ্যকর নয়।
পালংশাক ও ব্রকলি: সবুজ শাকসবজিতেও কিছু পরিমাণ ভিটামিন ই পাওয়া যায়। আধা কাপ রান্না করা পালংশাকে প্রায় ১.৯ মিলিগ্রাম এবং আধা কাপ রান্না করা ব্রকলিতে প্রায় ১.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই থাকতে পারে।
প্রতিদিন কতটা ভিটামিন ই প্রয়োজন?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই প্রয়োজন। স্তন্যদানকারী নারীদের প্রয়োজন প্রায় ১৯ মিলিগ্রাম।
তবে প্রয়োজনীয় মাত্রা পূরণের জন্য আলাদা করে ভিটামিন ই ক্যাপসুল খাওয়ার দরকার হয় না। বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুষম খাবার থেকেই সাধারণত প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
ভিটামিন ই-এর ঘাটতি কেন হয়?
সুস্থ মানুষের শরীরে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি খুবই বিরল। কারণ এটি অনেক খাবারেই পাওয়া যায়। ঘাটতি হলে তার পেছনে সাধারণত শারীরিক কোনো সমস্যা থাকে। যেমন- শরীরে চর্বি শোষণে সমস্যা, ক্রোনস রোগ, সিলিয়াক রোগ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, কিছু লিভারের রোগ, অগ্ন্যাশয়ের কিছু সমস্যা এবং কিছু বিরল বংশগত রোগ।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন অত্যন্ত কম চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিজে থেকে ভিটামিন ই ক্যাপসুল খাবেন না
ভিটামিন ই শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও বেশি মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট খাওয়া নিরাপদ নয়। বিশেষ করে বেশি মাত্রার ভিটামিন ই রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই চুল পড়া, ত্বকের শুষ্কতা বা পেশিতে টান ধরলেই দোকান থেকে ভিটামিন ই ক্যাপসুল কিনে খাওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে ঘাটতি আছে কি না তা নির্ধারণ করবেন।
কীভাবে খাবার থেকে ভিটামিন ই পাবেন?
দৈনন্দিন খাবারে কয়েকটি সহজ পরিবর্তন করা যেতে পারে। সকালের নাশতায় পরিমাণমতো বাদাম রাখা যায়। খাবারে পালংশাক, ব্রকলির মতো সবুজ সবজি রাখা যায়। পরিমিত পরিমাণে চিনাবাদাম বা বীজও খাবারের অংশ হতে পারে।
তবে একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়াই ভালো। এতে ভিটামিন ই-এর পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় অন্যান্য পুষ্টিও পাওয়া যায়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
হাত-পায়ে দীর্ঘদিন ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব, পেশির অস্বাভাবিক দুর্বলতা, হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো বা দৃষ্টির সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে যদি আপনার এমন কোনো রোগ থাকে যার কারণে শরীরে চর্বি শোষণে সমস্যা হতে পারে, তাহলে ভিটামিন ই-এর ঘাটতির ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
শুধু উপসর্গ দেখে ভিটামিন ই-এর ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
ভিটামিন ই শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ঘাটতি নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। সুস্থ মানুষের মধ্যে এই ঘাটতি খুবই বিরল। বরং নিয়মিত বাদাম, বীজ, উদ্ভিজ্জ তেল ও সবুজ শাকসবজিসহ বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খাওয়াই শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ই পাওয়ার সহজ উপায়।
আর চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া বা পেশিতে টান ধরার মতো সাধারণ সমস্যাকে সরাসরি ভিটামিন ই-এর ঘাটতি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস



