অ্যালার্ম ছাড়াই কি প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সম্ভব

সকালে অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ঠিক যে সময় প্রতিদিন অ্যালার্ম দিয়ে ওঠেন, সেই সময়েই চোখ খুলেছে। অনেকের কাছেই বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, শরীর কি তাহলে নিজেই ঘড়ির কাজ করছে?
আসলে কিছুটা তাই। মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবঘড়ি রয়েছে, যা কখন ঘুমাতে হবে, কখন জাগতে হবে এবং দিনের কোন সময়ে শরীর বেশি সক্রিয় থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস থাকলে এই জৈবঘড়ি আরও নিয়মিত হয়ে উঠতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সবাই অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে উঠে যেতে পারবেন। ঘুমের সময়, বয়স, জীবনযাপন, মানসিক চাপ, আলো এবং ব্যক্তিভেদে শরীরের জৈবিক ছন্দের পার্থক্য, সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখে।
শরীরের ভেতরেই রয়েছে একটি ঘড়ি
আমাদের মস্তিষ্কে একটি বিশেষ জৈবিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা শরীরের প্রায় ২৪ ঘণ্টার ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম ও জাগরণের সময় নির্ধারণে এই ছন্দের বড় ভূমিকা রয়েছে।
দিনের আলো এই জৈবঘড়ির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোর একটি। সকালে আলো চোখে পৌঁছালে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে দিনের শুরু হয়েছে। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর আলো কমে এলে শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় মেলাটোনিন নামের একটি হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্ধকার বাড়লে মেলাটোনিনের মাত্রা সাধারণত বাড়তে থাকে এবং শরীর ঘুমের দিকে এগিয়ে যায়।
প্রতিদিন একই সময়ে উঠলে কী হয়?
ধরুন, একজন ব্যক্তি প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে ঘুমান এবং সকাল ৭টায় ওঠেন। কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে একই রুটিন চলতে থাকলে শরীর সেই সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
একসময় সকাল ৭টার কাছাকাছি ঘুম ভাঙার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এমনকি অ্যালার্ম না থাকলেও শরীর জেগে উঠতে পারে।
এর পেছনে শুধু ঘুমের অভ্যাস নয়, শরীরের হরমোন ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক পরিবর্তনও কাজ করে। ঘুম থেকে ওঠার সময়ের দিকে শরীর ধীরে ধীরে জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
তাহলে কি অ্যালার্মের দরকার নেই?
সব সময় না। যারা দীর্ঘদিন ধরে একই সময়ে ঘুমান এবং ওঠেন, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং নিয়মিত জীবনযাপন করেন, তাদের অনেকের অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠতে হলে শুধু শরীরের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে আগের রাতে দেরি করে ঘুমালে, ঘুমের ঘাটতি থাকলে বা স্বাভাবিক রুটিন বদলে গেলে শরীর আগের সময় অনুযায়ী জেগে নাও উঠতে পারে।
তাই পরীক্ষা, বিমান ধরার সময়, গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যালার্ম ব্যবহার করাই নিরাপদ।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কী হবে?
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ যদি প্রতিদিন রাত ১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় উঠে অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে শরীরের জৈবঘড়ি ঠিকমতো কাজ করলেও ঘুমের প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা কমবেশি হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম শুধু সকালে সময়মতো ওঠার জন্য নয়, স্মৃতি, মনোযোগ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া এবং মানসিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠতে পারছেন কি না, সেটিকে ভালো ঘুমের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অ্যালার্মের আগেই চোখ খুলে যাওয়ার কারণ কী?
অনেকের অ্যালার্ম বাজার কয়েক মিনিট আগেই ঘুম ভেঙে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে শরীরের তৈরি হয়ে যাওয়া নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস।
শরীর যদি দীর্ঘদিন ধরে একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠে, তাহলে সেই সময়ের কাছাকাছি জাগরণের জন্য শারীরবৃত্তীয় প্রস্তুতি শুরু হতে পারে।
তবে শুধু জৈবঘড়িই নয়, চিন্তা বা উদ্বেগও অ্যালার্মের আগে ঘুম ভাঙার কারণ হতে পারে। পরদিন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ থাকলে মস্তিষ্ক সেটি নিয়ে সচেতন থাকতে পারে। ফলে ঘুম তুলনামূলক হালকা হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের কাছাকাছি ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
সকালে আলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যালার্ম ছাড়াই নিয়মিত সময়ে ওঠার অভ্যাস তৈরি করতে চাইলে সকালের আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘুম থেকে ওঠার পর প্রাকৃতিক আলোতে থাকা শরীরের জৈবঘড়িকে দিনের সময় সম্পর্কে সংকেত দেয়। একইভাবে রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো, বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা, শরীরের ঘুমের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সকালে আলো পাওয়া এবং রাতে আলো কমানোর অভ্যাস ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
ছুটির দিনে রুটিন বদলালে সমস্যা হতে পারে?
সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৭টায় ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমান। এমন অভ্যাস শরীরের ঘুম ও জাগরণের ছন্দকে এলোমেলো করতে পারে।
এ কারণে ছুটির দিনেও ঘুমানোর ও ওঠার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করাই ভালো। তবে প্রতিদিন হুবহু একই সময়ে উঠতেই হবে, এমন কঠোর নিয়মও নেই।
মূল বিষয় হলো, শরীরকে মোটামুটি একটি নিয়মিত ছন্দে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
অ্যালার্ম ছাড়া ওঠার অভ্যাস করতে চাইলে
যারা ধীরে ধীরে অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমাতে চান, তারা কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন।
প্রথমত, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান। শুধু সকালে একই সময়ে ওঠার চেষ্টা করলেই হবে না। রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন। ছুটির দিনেও সময়ের পার্থক্য খুব বেশি না রাখাই ভালো।
তৃতীয়ত, সকালে আলোতে থাকুন। সম্ভব হলে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকুন।
চতুর্থত, রাতে আলো কমান। ঘুমানোর আগে ঘরের আলো কমিয়ে শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে দিন।
পঞ্চমত, রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন। চা, কফি বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের প্রভাব অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে।
ষষ্ঠত, ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত উত্তেজনামূলক কাজ কমান। বিছানায় যাওয়ার ঠিক আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার, কাজ বা মানসিক চাপের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ঘুমাতে দেরি হতে পারে।
বয়সের সঙ্গে ঘুমের ধরনও বদলায়
সব মানুষের ঘুমের প্রয়োজন ও জৈবঘড়ি এক নয়। শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক মানুষের ঘুমের ধরনে পার্থক্য রয়েছে।
কিশোরদের অনেক সময় রাতে দেরিতে ঘুমানোর স্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যায়। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের ঘুমের সময় এগিয়ে আসতে পারে এবং সকালে তুলনামূলক তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙতে পারে।
এ ছাড়া কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সকালে বেশি সক্রিয়, আবার কেউ রাতে বেশি সতর্ক থাকেন। একে অনেক সময় মানুষের ক্রোনোটাইপ বলা হয়।
তাই একজন ব্যক্তি অ্যালার্ম ছাড়া সকাল ৬টায় উঠে যেতে পারছেন বলেই অন্য সবারও একইভাবে ওঠা উচিত, এমন নয়।
কখন অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভাঙা ভালো লক্ষণ?
যদি আপনি পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পর প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠেন এবং দিনের বেলায় সতেজ থাকেন, তাহলে এটি আপনার নিয়মিত ঘুমের ছন্দের একটি ভালো লক্ষণ হতে পারে।
কিন্তু যদি খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় অথচ শরীর ক্লান্ত থাকে, আবার ঘুমাতে না পারেন, অথবা দিনের বেলায় প্রচণ্ড ঘুম পায়, তাহলে বিষয়টি আলাদা।
একইভাবে নিয়মিত ঘুমানোর পরও যদি সকালে উঠতে খুব কষ্ট হয়, দিনে অতিরিক্ত ঘুম পায় বা দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
অ্যালার্ম ছাড়াই ওঠা মানেই ভালো ঘুম নয়
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সকালে অ্যালার্ম ছাড়াই উঠে যাওয়া নিঃসন্দেহে শরীরের নিয়মিত ঘুমের ছন্দের ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু এটিই ভালো ঘুমের প্রমাণ নয়।
ঘুমের মান বিচার করতে হলে দেখতে হবে আপনি যথেষ্ট সময় ঘুমাচ্ছেন কি না, ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে কি না এবং সকালে ওঠার পর শরীর ও মন কেমন অনুভব করছে।
কেউ ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে প্রতিদিন অ্যালার্ম ছাড়াই উঠতে পারেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছেন।
অ্যালার্ম ছাড়াই প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সম্ভব। নিয়মিত ঘুমের সময়, পর্যাপ্ত ঘুম, সকালের আলো এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি একসঙ্গে কাজ করলে অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে।
তবে এর জন্য শরীরকে জোর করে নির্দিষ্ট সময়ে জাগিয়ে তোলার চেয়ে নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমান, প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যান ও উঠুন, সকালে আলোতে থাকুন এবং রাতে শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করুন। সময়ের সঙ্গে আপনার শরীর নিজেই একটি ছন্দ তৈরি করতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে সময়মতো ওঠা জরুরি হলে অ্যালার্ম ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না। শরীরের জৈবঘড়ি বেশ নির্ভরযোগ্য হতে পারে, কিন্তু সেটি নিখুঁত ঘড়ি নয়।
সূত্র:বিবিসি



