logo

শুঁটকির ঝাঁজে পাহাড়ি স্বাদ, গারো-খাসিদের প্রিয় ‘টুংটাপ’ কীভাবে তৈরি হয়

শুঁটকির ঝাঁজে পাহাড়ি স্বাদ, গারো-খাসিদের প্রিয় ‘টুংটাপ’ কীভাবে তৈরি হয়
গারো ও খাসি সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার টুংটাপ

বাংলাদেশে শুঁটকি মাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি দিয়ে নানা ধরনের পদ রান্না করা হয়। তেমনি রয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদের বিভিন্ন শুঁটকির পদ ও।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো ও খাসি সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো টুংটাপ (Tungtap) বা গাঁজনকৃত (fermented) শুঁটকি মাছের চাটনি বা পেস্ট।

এটি মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্য এবং বাংলাদেশের মেঘালয় সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও শেরপুর অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠীর অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। গাঁজানো শুঁটকি মাছ দিয়ে তৈরি এই ঝাল চাটনি খাসি ও গারোসহ মেঘালয়ের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

ভাত কিংবা সেদ্ধ আলুর সঙ্গে খাওয়া এই খাবারের বৈশিষ্ট্য হলো শুঁটকি মাছের তীব্র স্বাদ ও ঘ্রাণের সঙ্গে পোড়া মরিচের ঝাল। মেঘালয় ট্যুরিজমও টুংটাপকে fermented dry fish chutney হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আসলে কী এই টুংটাপ?

এটি তৈরিতে মূলত ছোট আকারের রোদে শুকানো চ্যালা বা পুঁটি জাতীয় শুঁটকি মাছ ব্যবহার করা হয়। শুঁটকি মাছগুলোকে লবণ মাখিয়ে মাটির পাত্রে (মটকা) পাতা দিয়ে মুখ ভালো করে বন্ধ করে দীর্ঘদিন গেঁজিয়ে বা ফারমেন্টেশন (Fermentation) করে রাখা হয়। গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে এতে একটি তীব্র ও ঝাঁঝালো সুগন্ধ এবং চমৎকার নোনতা-টক স্বাদ তৈরি হয়। মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাছ সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি হিসেবে গাঁজনের ব্যবহার হয়ে আসছে। ফলে টুংটাপ শুধু একটি খাবার নয়, স্থানীয় খাদ্য ঐতিহ্যেরও একটি অংশ।

আসুন এবার জেনে নেই টুংটাপ তৈরিতে কি কি উপকরণ লাগে

  • গাঁজানো শুঁটকি মাছ- প্রায় ৫০ গ্রাম
  • কাঁচা মরিচ- ৫ থেকে ৮টি
  • শুকনা লাল মরিচ- ২ থেকে ৩টি
  • টমেটো- ১টি
  • পেঁয়াজ- ১টি
  • লবণ- স্বাদমতো
  • ধনেপাতা- সামান্য, ঐচ্ছিক

যেভাবে বানাবেন

  • প্রথমে শুঁটকি মাছ পরিষ্কার করে শুকনা তাওয়ায় হালকা ভেজে নিন। বেশি সময় বা বেশি আঁচে ভাজার প্রয়োজন নেই।
  • এরপর টমেটো ও শুকনা মরিচ হালকা পুড়িয়ে নিন। টমেটোর খোসা পুড়ে গেলে সেটি ছাড়িয়ে নিতে পারেন।
  • এবার শিলপাটায় বা হামানদিস্তায় শুঁটকি মাছ বেটে নিন। এর সঙ্গে পোড়া টমেটো, শুকনা মরিচ, কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে আবার ভালোভাবে বেটে নিন।
  • মিশ্রণটি খুব মিহি করার প্রয়োজন নেই। সামান্য দানাদার থাকলে শুঁটকির স্বাদ ও টেক্সচার ভালোভাবে পাওয়া যায়।
  • সবশেষে স্বাদমতো লবণ এবং ধনেপাতা মিশিয়ে নিন। ব্যস, প্রস্তুত পাহাড়ি স্বাদের টুংটাপ।

ভাত অথবা আলুর সঙ্গে এর স্বাদ বেশ জমে ওঠে

টুংটাপের স্বাদ সাধারণ শুঁটকি ভর্তার তুলনায় বেশ আলাদা। গাঁজনের কারণে এতে তৈরি হয় তীব্র উমামি স্বাদ ও বিশেষ ঘ্রাণ। তার সঙ্গে পোড়া টমেটো, মরিচ ও পেঁয়াজ যোগ হওয়ায় চাটনিতে আসে ঝাল ও ধোঁয়াটে স্বাদ।

ময়মনসিংহের গারোরা এটি সাধারণত ভাত বা সেদ্ধ আলুর সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। যারা শুঁটকি ও ঝাল খাবার পছন্দ করেন, তাদের কাছে এই পাহাড়ি চাটনি হতে পারে বেশ আকর্ষণীয় ও ভিন্নধর্মী একটি পদ।

ঘরে বানানোর সময় সতর্কতা

টুংটাপের আসল বৈশিষ্ট্য গাঁজানো মাছ। তবে ঘরে কাঁচা মাছ গাঁজন করার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ গাঁজন না করে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে প্রস্তুত গাঁজানো শুঁটকি সংগ্রহ করে রান্নার জন্য ব্যবহার করাই ভালো।