logo

বারবার ঝগড়া ও কথা বন্ধ, দম্পতিরা সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে যা করবেন

বারবার ঝগড়া ও কথা বন্ধ, দম্পতিরা সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে যা করবেন
ছবি: বিবিসি বাংলা

একটি সম্পর্কে থাকলেও অনেক সময় মনে হতে পারে, সঙ্গীর সঙ্গে যেন দূরত্ব বাড়ছে। ছোট বিষয় নিয়ে বারবার ঝগড়া, একে অন্যের কথা না শোনা কিংবা দীর্ঘ সময় কথা না বলার মতো পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সম্পর্ককে কঠিন করে তুলতে পারে। এর প্রভাব শুধু মনের ওপর পড়ে না, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘুম ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে মতবিরোধ থাকলেই যে একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, এমন নয়। গবেষণা বলছে, সম্পর্কের সমস্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দম্পতিরা মতবিরোধ কীভাবে সামলাচ্ছেন। একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা, মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে অনেক সম্পর্কেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।


দম্পতিদের ঝগড়া হয় কেন?

একটি সম্পর্কে ঝগড়ার বিষয় একেক দম্পতির ক্ষেত্রে একেক রকম হলেও কিছু বিষয় বারবার ফিরে আসে। অর্থ, সন্তান লালন-পালন, যৌনজীবন, ঘরের কাজ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কে নেবেন, এসব নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে দম্পতি থেরাপি নিয়ে কাজ করা গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোলের মতে, একটি সম্পর্কের অনেক সমস্যাই বারবার ফিরে আসে।

মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান ও তার সহকর্মীদের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাতেও দেখা যায়, চার বছর পরও প্রায় ৬৯ শতাংশ দম্পতি একই ধরনের বিষয় নিয়ে মতবিরোধে জড়াচ্ছিলেন।

অর্থাৎ সব সমস্যা একবার আলোচনা করলেই চিরতরে সমাধান হয়ে যাবে, এমন নয়। একই বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য আবারও তৈরি হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই মতবিরোধ কীভাবে সামলানো হচ্ছে।

ঝগড়া করলেই সম্পর্ক খারাপ হয় না

সুখী ও অসুখী উভয় ধরনের দম্পতির মধ্যেই মতবিরোধ হতে পারে। তাই ঝগড়া হচ্ছে মানেই সম্পর্কটি খারাপ, এমনটা বলা যায় না।

বরং মতবিরোধ কখনও কখনও সঙ্গীর প্রয়োজন, প্রত্যাশা ও অনুভূতি বোঝার সুযোগ তৈরি করে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মতবিরোধের সময় একে অন্যকে অপমান করা, দোষারোপ করা বা কথা বলা বন্ধ করে দেওয়ার মতো আচরণ নিয়মিত হয়ে ওঠে।

গবেষণার ভিত্তিতে ক্যারি কোল সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর চার ধরনের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো-

  • অতিরিক্ত সমালোচনা
  • অবজ্ঞা বা অসম্মান
  • সব সময় আত্মপক্ষ সমর্থন করা
  • নীরব থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া

এ ধরনের আচরণ সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে। তবে এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব।

সমালোচনার বদলে সমস্যার কথা বলুন

সঙ্গীর কোনো আচরণ ভালো না লাগলে সরাসরি তাকে খারাপ বা অযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার বদলে নির্দিষ্ট সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা বেশি কার্যকর হতে পারে।

ছবি: বিবিসি বাংলা
ছবি: বিবিসি বাংলা

উদাহরণ হিসেবে, ঘরের কাজ নিয়ে সমস্যা হলে সঙ্গীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন না তুলে কোন কাজটি ভাগ করে নেওয়া দরকার, সেটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এতে কথাবার্তা ব্যক্তিগত আক্রমণের দিকে না গিয়ে সমস্যার সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

সঙ্গীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন

সম্পর্ক ভালো রাখার ক্ষেত্রে সঙ্গী আপনার কথা শুনছেন এবং আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, এই অনুভূতিটি গুরুত্বপূর্ণ।

এর অর্থ এই নয় যে সঙ্গীর প্রতিটি মতের সঙ্গে একমত হতে হবে। বরং তার দৃষ্টিভঙ্গি কেন এমন, সেটি বোঝার চেষ্টা করা দরকার।

সঙ্গী কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়েছেন বললে সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করে আগে তার কথাটি মন দিয়ে শোনা যেতে পারে।

ঘরের কাজ ও সিদ্ধান্ত ভাগ করে নিন

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, দম্পতিরা যখন একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন এবং ঘরের কাজ তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ভাগ করে নেন, তখন দাম্পত্য সন্তুষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

তাই কে বেশি কাজ করছেন বা কে বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন, তা নিয়ে অসন্তোষ থাকলে বিষয়টি চেপে না রেখে খোলাখুলি আলোচনা করা ভালো।

একসঙ্গে বসে দৈনন্দিন কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া অনেক অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব কমাতে পারে।

সঙ্গীর স্বপ্ন ও লক্ষ্য বোঝার চেষ্টা করুন

একই বিষয়ে দুজন মানুষের চাওয়া আলাদা হতে পারে। এর পেছনে তাদের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যারি কোল একটি দম্পতির উদাহরণ দিয়েছেন, যারা নিয়মিত অর্থ নিয়ে ঝগড়া করতেন। দুজনেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হলেও অর্থের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা।

স্ত্রী ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বেশি সঞ্চয় করতে চাইতেন। অন্যদিকে স্বামী নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে ভালোভাবে জীবন উপভোগ করতে চাইতেন।

তাদের ঝগড়ার মূল বিষয় ছিল টাকা। কিন্তু থেরাপির মাধ্যমে তারা বুঝতে পারেন, অর্থ নিয়ে তাদের ভিন্ন অবস্থানের পেছনে রয়েছে শৈশবের ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন লক্ষ্য।

এরপর তারা কত টাকা সঞ্চয় করবেন এবং কতটা খরচ করতে পারবেন, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছান।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, একই বিষয় নিয়ে বারবার ঝগড়া হলে শুধু কে ঠিক বা কে ভুল, সেটি নিয়ে না ভেবে দুজনের কাছে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার।

মন দিয়ে শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা

ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের কাপল থেরাপিস্ট ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক জে লেবোর মতে, সম্পর্কের সমস্যা কমার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো দুজনের কথা বলা ও শোনার ক্ষেত্রে উন্নতি হওয়া।

সম্পর্কে দীর্ঘদিন সমস্যা চললে সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই কথোপকথনের সময় নিজের উত্তর তৈরি করার বদলে সঙ্গী আসলে কী বলতে চাইছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, সঙ্গী কেন এই বিষয়টিকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন? তার জায়গায় থাকলে আমি বিষয়টি কীভাবে দেখতাম?

এ ধরনের প্রশ্ন একে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

প্রয়োজন হলে কাপল থেরাপি

সব সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারবেন, এমন নয়। দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, যোগাযোগের সমস্যা বা সম্পর্কের দূরত্ব বেশি হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

ছবি: বিবিসি বাংলা
ছবি: বিবিসি বাংলা

গবেষণায় কাপল থেরাপির ইতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্পর্কের সমস্যা কমানোর পাশাপাশি যোগাযোগ, মানসিক ঘনিষ্ঠতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রেও থেরাপি সহায়ক হতে পারে।

তবে থেরাপি কোনো জাদুর সমাধান নয়। দুজনেরই সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

জে লেবোর মতে, একজন দক্ষ থেরাপিস্ট থাকলেও সম্পর্ক ঠিক করার বিষয়ে দুজনের আগ্রহ না থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে।

সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়

একটি সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব বা প্রয়োজনীয় নয়। কখনও কখনও দীর্ঘ আলোচনার পরও দুজন আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এমন পরিস্থিতিতেও একে অপরের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে সন্তান থাকলে বিচ্ছেদের সময় তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।


সম্পর্ক ভালো রাখার মূল চাবিকাঠি

অসুখী সম্পর্ককে আবার ভালো করার কোনো একক সূত্র নেই। তবে একে অন্যকে সম্মান করা, মন দিয়ে শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং মতবিরোধের সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে।

আর সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং নিজেরা সমাধান করতে না পারেন, তাহলে কাপল থেরাপিস্ট বা সংশ্লিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পর্কের সমস্যা দেখা দিলে কে জিতল বা কে হারল, তার বদলে দুজন মিলে সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া।

সূত্র: বিবিসি বাংলা