বর্ষাকালে কোন ফল ফ্রিজে রাখবেন, কোনটি বাইরে রাখবেন

বর্ষাকালে বাজার থেকে ফল কিনে এনে সরাসরি ফ্রিজে ঢুকিয়ে দেওয়াটা অনেকেরই অভ্যাস। মনে করা হয়, ঠান্ডায় রাখলে ফল বেশি দিন ভালো থাকবে। কিন্তু সব ফলের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। কিছু ফল ফ্রিজে রাখলে দ্রুত নষ্ট হতে পারে, আবার কিছু ফলের স্বাদ, গন্ধ ও গঠনেরও পরিবর্তন হতে পারে।
বিশেষ করে কলা, কাঁচা আমের মতো কিছু ফল ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখাই ভালো। অন্যদিকে কাটা ফল বা পাকতে শুরু করা কিছু ফল ফ্রিজে রাখলে তুলনামূলক বেশি সময় ভালো রাখা যায়। তাই বর্ষায় ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোন ফল কোথায় রাখবেন, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সব ফল ফ্রিজে রাখা ঠিক নয়
ফ্রিজের ঠান্ডা তাপমাত্রা অনেক ফলের জন্য উপকারী হলেও কিছু ফলের স্বাভাবিক পাকানোর প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কিছু ফল অতিরিক্ত ঠান্ডায় রাখলে স্বাভাবিক স্বাদ ও গন্ধ হারাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলার মতো কিছু ফল সাধারণত ফ্রিজে না রেখে শুকনো জায়গায় রাখাই ভালো।
তাই বাজার থেকে ফল এনে সবকিছু একসঙ্গে ফ্রিজে রাখার বদলে ফলের ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণ করা ভালো।
কলা
কলা ফ্রিজে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। কাঁচা বা পুরোপুরি না-পাকা কলা ফ্রিজে রাখলে এর খোসা দ্রুত কালচে হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ঠান্ডায় কলার স্বাভাবিক পাকানোর প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।
তাই কলা সাধারণত ঘরের তুলনামূলক ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় রাখা ভালো। সরাসরি রোদ বা চুলার পাশেও রাখা উচিত নয়।
তবে কলা খুব বেশি পেকে গেলে এবং দ্রুত খাওয়ার প্রয়োজন হলে কিছু সময়ের জন্য ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে খোসা কালচে হয়ে গেলেও ভেতরের অংশ সব সময় নষ্ট হয়ে গেছে, এমন নয়।
আম
আম সাধারণত পাকানোর আগে ঘরের তাপমাত্রায় রাখা ভালো। কাঁচা আম ফ্রিজে রাখলে পাকতে সময় বেশি লাগতে পারে এবং স্বাভাবিক স্বাদ ও গন্ধে পরিবর্তন আসতে পারে।
আম পেকে গেলে কয়েক দিন বেশি ভালো রাখার জন্য ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। তবে ফ্রিজে রাখার আগে আম পরিষ্কার ও শুকনো থাকা জরুরি।
কাটা আম অবশ্যই ঢাকনাযুক্ত পরিষ্কার পাত্রে রেখে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত।
তরমুজ
পুরো তরমুজ না কেটে থাকলে সাধারণত ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা যায়, যদি জায়গাটি ঠান্ডা, শুকনো ও সরাসরি রোদমুক্ত হয়।
তবে তরমুজ কেটে ফেললে বিষয়টি আলাদা। কাটা তরমুজ দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই কেটে ফেলার পর পরিষ্কার, ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রেখে দ্রুত ফ্রিজে রাখা উচিত।
বর্ষাকালে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে কাটা ফল বেশি দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই কাটা ফল দীর্ঘ সময় বাইরে না রাখাই ভালো।
পেঁপে
কাঁচা পেঁপে সাধারণত ঘরের তাপমাত্রায় রেখে পাকানো যায়। পাকা পেঁপে কয়েক দিনের মধ্যে খাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ঘরের ঠান্ডা জায়গায় রাখা যেতে পারে।
পেঁপে কেটে ফেললে অবশ্যই ফ্রিজে রাখা ভালো। কাটা অংশ ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখলে বাইরের গন্ধ ও জীবাণুর সংস্পর্শ কমে।
আনারস
পুরো আনারস সাধারণত ঘরের তাপমাত্রায় রাখা যায়। তবে একবার কেটে ফেললে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত।
কাটা আনারস পরিষ্কার, শুকনো ও ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখলে তুলনামূলক বেশি সময় ভালো থাকে।
আপেল ও নাশপাতি
আপেল ও নাশপাতি ফ্রিজে রাখা যায়। বিশেষ করে বেশি দিন সংরক্ষণ করতে চাইলে ফ্রিজ উপকারী হতে পারে।
তবে এসব ফল অন্য ফলের সঙ্গে একসঙ্গে রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার। ফল থেকে বের হওয়া ইথিলিন গ্যাস আশপাশের কিছু ফল ও সবজির পাকনোর গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। USDA-ও ইথিলিন উৎপাদনকারী ফল আলাদা করে রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
তাই ফ্রিজের ফল রাখার ড্রয়ার ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
বেরি জাতীয় ফল
স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি বা অন্যান্য নরম বেরি জাতীয় ফল খুব দ্রুত নষ্ট হতে পারে। এগুলো সাধারণত ফ্রিজে রাখা ভালো।
তবে কেনার পর সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ভিজিয়ে রেখে দেওয়া ঠিক নয়। ফলের গায়ে অতিরিক্ত পানি থাকলে ছত্রাক দ্রুত বাড়তে পারে। তাই খাওয়ার ঠিক আগে ধুয়ে নেওয়া ভালো।
যদি আগে ধুয়ে রাখতে হয়, তাহলে ভালোভাবে শুকিয়ে তারপর ফ্রিজে রাখতে হবে।
বর্ষায় ফল রাখার আগে একটি ভুল করবেন না
অনেকে বাজার থেকে ফল এনে প্রথমেই সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে তারপর ফ্রিজে রাখেন। এটি নিরাপদ পদ্ধতি নয়। ফল পরিষ্কারের জন্য সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করে প্রবাহিত পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়াই উপযুক্ত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফল ধোয়ার পর যদি সংরক্ষণ করতে হয়, তাহলে পানি ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। ভেজা অবস্থায় ফল ফ্রিজে রাখলে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফ্রিজে রাখলে কীভাবে রাখবেন
ফল ফ্রিজে রাখার ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
ফল আলাদা করুন: একটি ফল পচতে শুরু করলে সেটি অন্য ফলের সংস্পর্শে থাকলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নরম বা পচা ফল আলাদা করে ফেলুন।
কাটা ফল ঢেকে রাখুন: কাটা ফল কখনোই ফ্রিজে খোলা অবস্থায় রাখবেন না। পরিষ্কার ঢাকনাযুক্ত পাত্র ব্যবহার করুন।
অতিরিক্ত ভিড় করবেন না: ফ্রিজে ফল গাদাগাদি করে রাখলে বাতাস চলাচল কমে যায় এবং আর্দ্রতা জমতে পারে।
ফ্রিজের উপযুক্ত অংশ ব্যবহার করুন: ফল রাখার জন্য সাধারণত ক্রিসপার ড্রয়ার ব্যবহার করা সুবিধাজনক। এখানে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
খবরের কাগজে মুড়িয়ে রাখা কি ঠিক?
ফল সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতিগুলোর মধ্যে খবরের কাগজে মুড়িয়ে রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু খাবারের সরাসরি সংস্পর্শে খবরের কাগজ ব্যবহার না করাই ভালো। কাগজের কালি বা অন্যান্য উপাদান খাবারের সংস্পর্শে আসতে পারে।
এর বদলে খাবার সংরক্ষণের জন্য উপযোগী পরিষ্কার পাত্র বা ফুড-গ্রেড ব্যাগ ব্যবহার করা ভালো।
ফ্রিজের তাপমাত্রা খুব কমিয়ে রাখবেন না
ফ্রিজে ফল রাখলেই যত ঠান্ডা হবে তত ভালো থাকবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়। কিছু ফল অতিরিক্ত ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
USDA সাধারণভাবে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার কথা বলে। তবে কোন ফল কত তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো থাকবে, তা ফলের ধরন ও পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করে।
বর্ষায় ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ার কারণ কী?
বর্ষায় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে। ঘরের তাপমাত্রাও অনেক সময় ফল সংরক্ষণের জন্য আদর্শ থাকে না। ফলে ফলের গায়ে ছত্রাক তৈরি হওয়া বা দ্রুত পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বাজার থেকে আনা ফল অনেকক্ষণ ভেজা অবস্থায় থাকলে সমস্যাটি আরও বাড়তে পারে। তাই ফল কেনার পর ভালোভাবে দেখে নিন। কোনো ফল থেঁতলে গেলে বা কেটে গেলে সেটি আলাদা করে রাখুন।
ফল পচেছে বুঝবেন কীভাবে
ফলের গায়ে ছত্রাক, অস্বাভাবিক গন্ধ, অতিরিক্ত নরম হয়ে যাওয়া, রংয়ের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা পচা অংশ দেখা গেলে সেটি খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
বিশেষ করে নরম ফলের ক্ষেত্রে একটি অংশে ছত্রাক দেখা দিলে শুধু সেই অংশ কেটে বাকি অংশ খাওয়া নিরাপদ নাও হতে পারে। এমন ফল ফেলে দেওয়াই ভালো।
তাহলে কোন ফল কোথায় রাখবেন?
সহজভাবে মনে রাখলে বিষয়টি এমন-
- কলা ঘরের তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে
- কাঁচা আম ঘরের তাপমাত্রায় পাকানো ভালো
- পাকা আম কয়েক দিন রাখতে ফ্রিজে রাখা যায়
- পুরো তরমুজ ঠান্ডা জায়গায়, কাটা হলে ফ্রিজে রাখতে হবে
- পেঁপে কাঁচা হলে বাইরে, কাটা বা পাকা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্রিজে
- আনারস পুরো থাকলে বাইরে, কাটা হলে ফ্রিজে রাখতে হবে
- আপেল ফ্রিজে রাখা যায়
- নাশপাতি পাকানোর আগে বাইরে, পরে ফ্রিজে রাখা যায়
- বেরি জাতীয় ফল ফ্রিজে রাখা ভালো
তবে ফলের জাত, পরিপক্বতা, ঘরের তাপমাত্রা এবং ফ্রিজের অবস্থার ওপর সংরক্ষণের সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ফল সাত দিন বা তার বেশি ভালো থাকবেই, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়।
বর্ষায় ফল ভালো রাখার জন্য সব ফল ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখাই সমাধান নয়। কলা বা কাঁচা আমের মতো কিছু ফল ঘরের তাপমাত্রায় রাখাই ভালো। আবার কাটা ফল, বেরি জাতীয় নরম ফল কিংবা পেকে যাওয়া কিছু ফল ফ্রিজে রাখলে তুলনামূলক বেশি সময় ভালো রাখা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফল ভেজা অবস্থায় না রাখা, পচা ফল আলাদা করা, কাটা ফল ঢেকে ফ্রিজে রাখা এবং ফলের ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণের পদ্ধতি বেছে নেওয়া। এতে বর্ষাকালে ফলের অপচয় যেমন কমবে, তেমনি নিরাপদে ফল খাওয়াও সহজ হবে।
সূত্র: নিউজ ১৮



