logo
Advertisement

চুল পড়া বাড়ছে, এই খাবারগুলো খাওয়ার অভ্যাসে সতর্ক হোন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
চুল পড়া বাড়ছে, এই খাবারগুলো খাওয়ার অভ্যাসে সতর্ক হোন
চুল পড়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। ছবি : সংগৃহীত

চিরুনিতে আগের চেয়ে বেশি চুল উঠছে, গোসলের পর মেঝেতে পড়ে থাকছে একগুচ্ছ চুল, কিংবা আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাথার ত্বক বেশি দেখা যাচ্ছে। চুল পড়ার এমন সমস্যায় অনেকেই প্রথমে শ্যাম্পু, তেল বা চুলের যত্নের পণ্য বদলানোর কথা ভাবেন। কিন্তু চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে খাবারের সম্পর্কও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Advertisement

চুলের গোড়া বা ফলিকল সব সময় সক্রিয় থাকে এবং নতুন চুল তৈরির জন্য এর নিয়মিত পুষ্টি প্রয়োজন। তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চুলের বৃদ্ধি ও গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বা অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসও চুলের জন্য ভালো নয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো একটি খাবার খেলেই চুল পড়া শুরু হয়ে যায়, এমন সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ নেই। চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, কিছু শারীরিক সমস্যা, মানসিক চাপসহ নানা কারণ থাকতে পারে। খাবার এসব সমস্যার কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অতিরিক্ত চিনি কতটা দায়ী

চিনি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়ার কারণ হলো এটি সরাসরি চুল ঝরিয়ে দেয় এমন না বরং অতিরিক্ত চিনি শরীরে এমন কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে চুলের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বেশি চিনি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে শরীরে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ, বিপাকীয় সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। কিছু গবেষণায় পুরুষদের চুল পড়ার একটি সাধারণ ধরন, পুরুষালি ধরনের টাকের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ ও বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত চিনি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। প্রদাহ চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার নিয়মিত মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমে গেলে চুল প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।

তাই মাঝে মধ্যে মিষ্টি, পায়েস বা এক টুকরা কেক খেলে চুল পড়ে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন অতিরিক্ত চিনি নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে যায়।

মিষ্টি পানীয়তে বাড়তে পারে ঝুঁকি

চিনি শুধু মিষ্টি বা কেকেই থাকে না। কোমল পানীয়, মিষ্টি চা-কফি, এনার্জি ড্রিংক, প্যাকেটজাত ফলের পানীয়সহ নানা ধরনের পানীয়তেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি থাকতে পারে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় চিনি মেশানো পানীয় এবং অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় বেশি খাওয়ার সঙ্গে চুল পড়ার বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বিভিন্ন ধরনের গবেষণা বিশ্লেষণ করে খাদ্যাভ্যাস ও চুলের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পর্যালোচনা করেছেন। তবে এমন গবেষণা কোনো একটি খাবারকে চুল পড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে প্রমাণ করে না।

আরেকটি গবেষণায় ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় দুই হাজার চীনা পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে চিনি মেশানো পানীয় বেশি খাওয়ার সঙ্গে পুরুষালি ধরনের চুল পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা নিজেরাও উল্লেখ করেছেন, শুধু চিনিই এই সমস্যার জন্য দায়ী কি না তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তাই তৃষ্ণা মেটাতে নিয়মিত কোমল পানীয়ের বদলে পানি, চিনি ছাড়া চা বা অন্যান্য কম চিনি থাকা পানীয় বেছে নেওয়া ভালো।

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারেও সতর্কতা

চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্যাকেটজাত খাবার, কিছু হিমায়িত খাবার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্রস্তুত খাবারসহ অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসও খাদ্যতালিকার জন্য ভালো নয়।

এ ধরনের খাবারে অনেক সময় লবণ, চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে, অথচ প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে। দীর্ঘদিন এসব খাবারের ওপর বেশি নির্ভর করলে পুষ্টিকর খাবারের জায়গা কমে যায়। ফলে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পর্যাপ্ত পরিমাণে না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে যারা নিয়মিত নাশতা বা দুপুরের খাবারের বদলে প্যাকেটজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা ফাস্টফুড খেয়ে থাকেন, তাদের খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনা দরকার।

বেশি চর্বিযুক্ত খাবারও ভালো নয়

ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত মাংস, অতিরিক্ত মাখন বা বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকা খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়। এসব খাবারের সঙ্গে হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের নানা সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

চুলের ক্ষেত্রেও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সরাসরি চুল পড়ার কারণ না হলেও চুলের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাবারে অতিরিক্ত তেল ও চর্বির বদলে মাছ, ডাল, বাদাম, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখার চেষ্টা করা উচিত।

শুধু বেশি খাবার নয়, পুষ্টির ঘাটতিও সমস্যা

চুল ভালো রাখতে শুধু ক্ষতিকর খাবার বাদ দিলেই হবে না। শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও দিতে হবে।

চুলের গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান কেরাটিন। এটি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। খাদ্যে দীর্ঘদিন প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে চুলের গঠন ও বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া আয়রন, জিংক, ভিটামিন ডি, বায়োটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় ভিটামিন ডি ও আয়রনের ঘাটতির সঙ্গে কিছু ধরনের চুল পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই পুষ্টির ঘাটতি থাকবে এমন নয়।

তাই চুল পড়ছে দেখে নিজের ইচ্ছায় একের পর এক ভিটামিন বা খাদ্য-পরিপূরক খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। কোনো পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া ভালো।

তাহলে কী খাবেন?

চুলের জন্য আলাদা কোনো জাদুকরি খাবার নেই। বরং প্রতিদিনের খাবার যত বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হবে, ততই শরীর ও চুল প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ পাবে।

খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল, দুধ ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। পাশাপাশি শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের ফল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ খাওয়া যেতে পারে। মাছ থেকে প্রোটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। বাদাম ও কিছু বীজেও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রেও খুব কঠিন কোনো নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই। ভাতের সঙ্গে মাছ, ডাল, শাকসবজি, ডিম বা মুরগির মতো পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয় করা যায়। প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য রাখাই মূল কথা।

চুল পড়া শুরু হলে কী করবেন

খাদ্যাভ্যাস ঠিক করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু খাবার পরিবর্তন করলেই সব ধরনের চুল পড়া বন্ধ হবে, এমন নয়।

যদি কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চুল পড়ে, মাথার কোনো নির্দিষ্ট অংশ পাতলা হয়ে যায়, টাকের জায়গা তৈরি হয়, চুলের গোড়া থেকে ব্যাপকভাবে চুল ঝরতে থাকে কিংবা মাথার ত্বকে অন্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

চুল পড়ার কারণ জানা গেলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে বংশগত চুল পড়া, পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু তেল বা খাবার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, চুল পড়া অনেক সময় শরীরের ভেতরের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই একদিকে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমাতে হবে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শুধু চুল নয়, পুরো শরীরের জন্যই উপকারী।

সূত্র: হেল্থলাইন, মাস্টারপিস হসপিটাল, হিমস