ঘর পরিষ্কার করার পরও জীবাণু থাকতে পারে, কী করবেন

ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার জন্য নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া, মুছে ফেলা ও ধুলা পরিষ্কার করা হয়। তবে পরিষ্কার করা আর জীবাণুমুক্ত করা এক বিষয় নয়। শুধু ময়লা সরালেই সব জীবাণু দূর হয় না, আবার প্রতিদিন ঘরের প্রতিটি জায়গায় জীবাণুনাশক ব্যবহার করাও প্রয়োজন নেই।
সঠিকভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হলে কোন জায়গায় কী ধরনের পরিষ্কারক ব্যবহার করতে হবে, কখন জীবাণুনাশক প্রয়োজন এবং কীভাবে তা নিরাপদে ব্যবহার করতে হবে, সেগুলো জানা জরুরি। সম্প্রতি এ বিষয়েই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন। তবে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর পরামর্শও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পরিষ্কার করা আর জীবাণুমুক্ত করার পার্থক্য কী
পরিষ্কার করার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো জায়গা বা পৃষ্ঠ থেকে ময়লা, ধুলা ও অধিকাংশ জীবাণু সরিয়ে ফেলা। সাধারণত পানি, সাবান বা ডিটারজেন্ট এবং ঘষে পরিষ্কার করার মাধ্যমে এটি করা যায়।
অন্যদিকে জীবাণুমুক্ত করার উদ্দেশ্য হলো পরিষ্কার করার পরও পৃষ্ঠে থাকা ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করা। তাই সাধারণ নিয়ম হলো, আগে পরিষ্কার করতে হবে, এরপর প্রয়োজন হলে জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে। পৃষ্ঠে ময়লা জমে থাকলে জীবাণুনাশক ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে।
প্রতিদিন সবকিছু জীবাণুমুক্ত করার প্রয়োজন নেই
ঘর পরিষ্কার রাখলেই প্রতিদিন সব পৃষ্ঠে জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে, এমন নয়। সাধারণ পরিস্থিতিতে সাবান বা ডিটারজেন্ট ও পানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করাই যথেষ্ট হতে পারে।
তবে বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে, বিশেষ করে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে, অথবা কারও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে কিছু পৃষ্ঠ জীবাণুমুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
যেসব জায়গায় বেশি নজর দেওয়া দরকার
ঘরের সব জায়গায় সমানভাবে জীবাণু ছড়ায় না। যেসব জায়গা বারবার হাত দিয়ে স্পর্শ করা হয়, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন - দরজার হাতল, আলোর সুইচ, টেবিল ও কাউন্টার, কলের হাতল, সিঙ্ক, টয়লেটের বিভিন্ন অংশ, রিমোট কন্ট্রোল, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিবোর্ড এবং বারবার ব্যবহৃত অন্যান্য হাতল ও বোতাম।
এ ধরনের পৃষ্ঠ নিয়মিত পরিষ্কার করলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
রান্নাঘর পরিষ্কারে বাড়তি সতর্কতা
রান্নাঘরের কাউন্টার বা খাবার তৈরির জায়গায় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার। কাঁচা মাংস, মুরগি বা তাদের রস কোনো পৃষ্ঠে লাগলে প্রথমে সেটি সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
খাবারের সংস্পর্শে আসে এমন পৃষ্ঠে যে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করার আগে পণ্যের লেবেলে দেওয়া নির্দেশনা অবশ্যই দেখতে হবে।
জীবাণুনাশক ব্যবহারের সময় যে ভুল করা যাবে না
জীবাণুনাশক ব্যবহার করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পণ্যের লেবেলের নির্দেশনা অনুসরণ করা। প্রতিটি পণ্যের ঘনত্ব, ব্যবহারের পদ্ধতি এবং কতক্ষণ পৃষ্ঠে রাখতে হবে, তা আলাদা হতে পারে।
জীবাণুনাশক ব্যবহারের সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
প্রথমত, প্রয়োজন হলে গ্লাভস বা লেবেলে উল্লেখ করা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঘরের ভেতরে ব্যবহার করলে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জানালা ও দরজা খোলা বা ফ্যান ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে।
তৃতীয়ত, কোনো জীবাণুনাশক দ্রুত মুছে ফেললে সেটি ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। পণ্যের নির্দেশনায় যে সময় পৃষ্ঠ ভেজা রাখার কথা বলা হয়েছে, সেটি মেনে চলতে হবে। এই সময়কে কন্টাক্ট টাইম (contact time) বলা হয়।
একসঙ্গে বিভিন্ন পরিষ্কারক মেশাবেন না
পরিষ্কার করার সময় একটি বড় ভুল হলো বিভিন্ন রাসায়নিক একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা। এতে বিপজ্জনক রাসায়নিক গ্যাস তৈরি হতে পারে এবং চোখ, ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।
তাই ব্লিচ, অ্যাসিডযুক্ত পরিষ্কারক, অ্যামোনিয়াসহ অন্য কোনো পরিষ্কারক একসঙ্গে মেশানো উচিত নয়। কোন পণ্যের সঙ্গে কী ব্যবহার করা যাবে, তা না জানলে মেশানো থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। CDC-ও পরিষ্কার বা জীবাণুনাশক পণ্য একে অন্যের সঙ্গে না মেশানোর পরামর্শ দেয়।
মোবাইল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র পরিষ্কার করবেন যেভাবে
মোবাইল ফোন, ট্যাব, কিবোর্ড ও রিমোট কন্ট্রোল নিয়মিত হাতের সংস্পর্শে আসে। তাই এগুলোও পরিষ্কার করা দরকার। তবে এসব যন্ত্রে সরাসরি পানি বা কোনো রাসায়নিক ঢেলে দেওয়া যাবে না।
প্রথমে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখে নিতে হবে। কোন ধরনের কাপড় বা পরিষ্কারক ব্যবহার করা যাবে, তা পণ্যের ওপর নির্ভর করে। CDC ইলেকট্রনিক যন্ত্র পরিষ্কারের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলেছে।
পরিষ্কার করার পর হাত ধুয়ে নিন
ঘর পরিষ্কার করার পর হাত ধোয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার করার সময় ময়লা ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারেন। তাই কাজ শেষে সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
গ্লাভস ব্যবহার করলেও গ্লাভস খুলে হাত পরিষ্কার করা জরুরি।
পরিষ্কার ঘর মানেই অতিরিক্ত রাসায়নিক নয়
ঘর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য অনেক ধরনের পরিষ্কারক বাজারে পাওয়া যায়। তবে বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করলেই ঘর বেশি নিরাপদ হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
কোথায় শুধু পরিষ্কার করা যথেষ্ট, কোথায় স্যানিটাইজ করা প্রয়োজন এবং কোথায় জীবাণুমুক্ত করা দরকার, তা পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করা উচিত। নিয়মিত পরিষ্কার করা, বেশি স্পর্শ করা জায়গাগুলোতে নজর দেওয়া এবং অসুস্থতার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করাই বেশি কার্যকর পদ্ধতি।
ঘর পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে মূল কথা হলো সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা। প্রতিদিন ঘরের প্রতিটি পৃষ্ঠে জীবাণুনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত পরিষ্কার করা, বেশি স্পর্শ করা জায়গাগুলোতে নজর দেওয়া এবং কেউ অসুস্থ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিষ্কার করার আগে পণ্যের লেবেল পড়া, বিভিন্ন রাসায়নিক না মেশানো এবং ব্যবহারের সময় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা। এতে ঘর যেমন পরিচ্ছন্ন থাকবে, তেমনি পরিষ্কার করার সময় রাসায়নিকের কারণে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিও কমবে।
সূত্র: সিডিসি



