লৌহ যুগের নারীর খুলিতে রহস্যময় দাগ, কী হয়েছিল মৃত্যুর পর

স্কটল্যান্ডের লৌহ যুগের এক নারীর দেহাবশেষ নিয়ে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে অস্বাভাবিক ও রহস্যময় কিছু তথ্য। গবেষকদের ধারণা, মৃত্যুর পর তার মাথার ভেতর থেকে সম্ভবত মস্তিষ্ক বের করে নেওয়া হয়েছিল। এটি সেই সময়কার জটিল ও অদ্ভুত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া রীতির অংশ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই গবেষণাটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয় এবং ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে Antiquity জার্নালে।
খুলির ভেতরের দাগ ও অস্বাভাবিক ভাঙন
গবেষকদের মতে, ওই নারীর বয়স মৃত্যুর সময় ৩০ বছরের বেশি ছিল। তার খুলির ভেতরে সরল ও সমান্তরাল কাটার দাগ পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত কোনো ধারালো যন্ত্র দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল।
এ ছাড়া খুলির নিচের অংশে অস্বাভাবিক ভাঙন দেখা গেছে, যা স্বাভাবিক নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, এটি মৃত্যুর পর পরিকল্পিতভাবে করা আঘাতের ফল হতে পারে।
এই দুটি লক্ষণ একসঙ্গে ইঙ্গিত দেয় যে মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই দেহ থেকে মস্তিষ্ক আলাদা করা হয়ে থাকতে পারে।
কীভাবে মস্তিষ্ক অপসারণ করা সম্ভব ছিল
গবেষকদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, খুলির নিচের অংশ দিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছানো অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। সেখানে থাকা সংযোগস্থল ও নরম টিস্যু কেটে দিলে মস্তিষ্ক বের করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক লরা ক্যাসেলস নাভারো জানিয়েছেন, ভাঙনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটি মৃত্যুর পরপরই ঘটেছে, যা ইচ্ছাকৃত প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে।
হাড়ের পরিবর্তনে আরও রহস্য
শুধু মাথার অংশ নয়, ওই নারীর শরীরের চারটি দীর্ঘ হাড়েও পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুই হাতের হিউমেরাস, একটি আলনা এবং উরুর ফিমার অন্তর্ভুক্ত।
প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল এগুলো প্রাণীর কামড়ে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে গবেষকদের মতে, চিহ্নগুলো মসৃণ এবং ইঁদুরের কামড়ের সঙ্গে মেলে না। বরং মনে হচ্ছে হাড়গুলো ভেঙে বা আকার পরিবর্তন করা হয়েছিল।
আশ্চর্যের বিষয় হলো- এসব পরিবর্তনের পরও হাড়গুলো সঠিক শারীরিক অবস্থান অনুযায়ী কবর দেওয়া হয়েছিল।
সম্মান না অবমাননা, প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত
এই অস্বাভাবিক আচরণের ব্যাখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি কি কোনো বিশেষ মর্যাদার ব্যক্তির প্রতি সম্মান, নাকি ভিন্ন কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আচারের অংশ ছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তবে দেহকে যত্নসহকারে কবর দেওয়ার বিষয়টি কিছুটা সম্মানের ইঙ্গিত দেয় বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একই স্থানে আরও একটি কবর
২০০০ সালে উত্তর স্কটল্যান্ডের একটি পাথরের ঢিবির নিচে দুটি দেহাবশেষ পাওয়া যায়। একটি ছিল ওই নারী, অন্যটি প্রায় ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরের।
কিশোরের দেহে তেমন কোনো গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ডিএনএ ও রেডিওকার্বন বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, তারা পরস্পরের আত্মীয় ছিলেন এবং সম্ভবত মাতৃসূত্রে দ্বিতীয় চাচাতো ভাইবোনের মতো সম্পর্ক ছিল। তাদের মৃত্যুর সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৭০ সালের মধ্যে।
লৌহ যুগের দাফন রীতি নিয়ে নতুন ধারণা
গবেষকদের মতে, লোহার যুগে দাফন রীতি ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কোথাও দেহ মাটিতে, কোথাও গুহায়, আবার কোথাও পাথরের ঢিবির নিচে রাখা হতো।
কখনো কখনো শরীরের অংশ আলাদাভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবহার করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
এই নতুন আবিষ্কার সেই সময়কার মানুষের মৃত্যুসংক্রান্ত আচার ও বিশ্বাস সম্পর্কে আরও জটিল ও বিস্তৃত ধারণা দিচ্ছে।
এই ঘটনা যতটা অস্বাভাবিক, ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে লৌহ যুগের সমাজে মৃত্যুর পর দেহ ব্যবস্থাপনা ছিল বহুস্তরীয় এবং প্রতীকী অর্থে সমৃদ্ধ। তবে এই আচারের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা বুঝতে গবেষকদের আরও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন