দাঁতের হলুদ ভাব দূর করার সহজ ও স্বাস্থ্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি

ঝকঝকে সাদা দাঁত আর প্রাণবন্ত হাসি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। হাসি মানুষের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস আর জিনগত কারণে দাঁতের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যায়।
নিয়মিত ব্রাশ করার পরও অনেকের দাঁত হলুদ দেখায়। দাঁতের বিবর্ণ হওয়া নিয়ে অনেকেই বেশ চিন্তিত থাকেন। দাঁত সাদা করার বিভিন্ন উপায় খোঁজেন।
কেউ দাঁত সাদা করতে বাজারের বিভিন্ন হোয়াইটেনিং টুথপেস্ট ব্যবহার করেন, আবার কেউ লেবু, বেকিং সোডা বা কয়লা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার কৃত্রিমভাবেও দাঁত সাদা করতে চান।
তবে সব পদ্ধতি দাঁতের জন্য নিরাপদ না। ভুল উপায়ে দাঁত সাদা করতে গিয়ে দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দাঁত হলুদ হওয়ার পেছনে অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শারীরিক সমস্যাও দায়ী হতে পারে। তাই দাঁত সাদা করার আগে কেন দাঁতের রং পরিবর্তন হচ্ছে, তা জানা জরুরি। সঠিক পরিচর্যা আর প্রয়োজনে দন্তচিকিৎসকের সাহায্য নিয়ে দাঁতের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দাঁত হলুদ বা বিবর্ণ হয় কেন?
দাঁতের রং পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আপনার প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসে দাঁতের রং হলুদ হতে পারে। যেমন-
ঘন ঘন মাউথওয়াশ ব্যবহার করা
মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে অনেকে দিনে অনেকবার মাউথওয়াশ ব্যবহার করে থাকেন। তবে সব মাউথওয়াশ একই ধরনের না। কিছু মাউথওয়াশে অ্যাসিড থাকে, যা অতিরিক্ত ব্যবহারে দাঁতের এনামেলের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মুখের লালা দাঁতকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মুখের অ্যাসিডের ভারসাম্য বজায় রাখে আর দাঁতের ওপর জমে থাকা খাবারের কণা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তাই শুধু মুখ সতেজ রাখার জন্য বারবার মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত না।
অতিরিক্ত অ্যাসিডযুক্ত খাবার ও পানীয় খাওয়া
লেবু, কমলা, আনারস, টমেটো, ভিনেগার ও কিছু কোমল পানীয়তে অ্যাসিড থাকে। এসব খাবার ও পানীয় ঘন ঘন গ্রহণ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে। এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হলে দাঁতের নিচের হলুদাভ ডেন্টিন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তখন দাঁত স্বাভাবিকের চেয়েও হলুদ লাগে দেখতে।
বারবার কফি পান করার অভ্যাস
কফি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সারাদিনে ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই কয়েক কাপ কফি পান করেন। কিন্তু বারবার কফি পান করলে দাঁতে হলুদ বা বাদামি দাগ পড়তে পারে। কফির রঞ্জক উপাদান দাঁতের বাইরের স্তরে জমে এই দাগ তৈরি করে। চায়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে।
ধূমপান করা
দাঁত হলুদ হওয়ার অন্যতম পরিচিত কারণ হলো ধূমপান। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের রাসায়নিক উপাদান দাঁতের এনামেলে লেগে দাগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে দাঁতের দাগ আরও গাঢ় হতে পারে।
ধূমপান শুধু দাঁতের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি মাড়ির রোগ, দাঁতের ক্ষয় ও মুখের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখতে ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করা
দাঁত নিয়মিত পরিষ্কার না করলে দাঁতের ওপর প্লাক জমে। প্লাক হলো ব্যাকটেরিয়াযুক্ত একটি আঠালো স্তর, যা দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে। সময়মতো পরিষ্কার না করলে এটি শক্ত হয়ে টারটারে পরিণত হয়ে যেতে পারে। প্লাক ও টারটার দাঁতের স্বাভাবিক রং নষ্ট করে হলুদ বা বিবর্ণ দেখাতে পারে।

খুব জোরে দাঁত ব্রাশ করা
দাঁত বেশি জোরে ঘষলে আরও ভালো পরিষ্কার হবে, এমন ধারণা ঠিক না। বরং শক্ত ব্রাশ দিয়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে দাঁত পরিষ্কার করলে এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এনামেল পাতলা হয়ে গেলে দাঁতের ভেতরের হলুদাভ ডেন্টিন আরও স্পষ্ট দেখা যায়। তাই নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহার করুন এবং আলতোভাবে দাঁত পরিষ্কার করুন।
এ ছাড়া দাঁতের গঠনগত সমস্যা, কিছু ওষুধের প্রভাব, দাঁতে আঘাত পাওয়া, ক্ষয় বা পুরোনো ফিলিংয়ের কারণেও দাঁতের রং পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সব ধরনের হলুদ দাঁতের সমস্যা এক না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনামেল পাতলা বা বেশি স্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নিচের ডেন্টিনের হলুদ আভা আরও স্পষ্ট দেখা যায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে হলুদ দাঁতের সমস্যা জিনগত হতে পারে।
দাঁত সাদা করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় কোনটি?
দাঁত সাদা করার পদ্ধতি নির্ভর করে দাঁতের বিবর্ণতার কারণের ওপর। দাঁতের ওপর জমে থাকা দাগ হলে নিয়মিত ব্রাশ, ভালো টুথপেস্ট আর ডেন্টিস্টের মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার করালে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, দাঁতের ভেতরের রং পরিবর্তিত হলে বিশেষ ধরনের হোয়াইটেনিং বা ব্লিচিং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দন্তচিকিৎসক দাঁত ও মাড়ির অবস্থা পরীক্ষা করে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন।
দাঁতে গর্ত, মাড়ির প্রদাহ বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে আগে তার চিকিৎসা করা জরুরি। নিজের ইচ্ছেমতো শক্তিশালী হোয়াইটেনিং জেল ব্যবহার করা উচিত না। আগে দাঁত হলুদ হওয়ার কারণ জানুন, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।
দাঁত সাদা করার ঘরোয়া উপায়
আপনার দাঁত যদি অভ্যাসগত কারণে হলুদ হয়ে যায় তাহলে আপনি ঘরে বসেই এর সমাধান করতে পারেন। হেলথলাইন- এর তথ্য অনুযায়ী দাঁত প্রাকৃতিকভাবে সাদা করার কিছু উপায় হলো-
বেকিং সোডার ব্যবহার
বেকিং সোডা দাঁতের দাগ দূর করতে বেশ কার্যকরী। এটি প্রাকৃতিকভাবে সামান্য দানাদার হওয়ায় দাঁতের উপরের ময়লা ও দাগ ঘষে তুলে ফেলতে সাহায্য করে। অনেক বাণিজ্যিক হোয়াইটনিং টুথপেস্টেও বেকিং সোডা ব্যবহার করা হয়।

সমপরিমাণ বেকিং সোডা ও পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এবার ব্রাশ বা আঙুলের সাহায্যে আলতো করে দাঁতে লাগিয়ে ১/২ মিনিট ব্রাশ করে ধুয়ে ফেলুন। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করতে পারে, তাই সপ্তাহে ১ বা ২ বারের বেশি না করাই ভালো।
অয়েল পুলিং
মুখের ভেতর তেল দিয়ে কুলকুচি করার এই প্রাচীন পদ্ধতিটি দাঁতের স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বলতা রক্ষায় বেশ জনপ্রিয়। নারকেল তেলে থাকা লরিক অ্যাসিড মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও প্লাক দূর করতে কাজ করে।
এক চামচ এক্সট্রা ভার্জিন নারকেল তেল মুখে নিয়ে ১৫/২০ মিনিট কুলি করুন বা মুখের ভেতর এদিক-সেদিক ঘোরাতে থাকুন। এরপর তেল ফেলে দিয়ে ভালোভাবে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি নিয়মিত করলে দাঁতের হলুদ ভাব কাটার পাশাপাশি মুখের দুর্গন্ধও দূর হতে পারে।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড একটি হালকা ব্লিচিং এজেন্ট। এটি দাঁতের দাগ দূর করতে সাহায্য করে।
অনেকেই বেকিং সোডার সঙ্গে সামান্য হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে আলতো ব্রাশ করেন। তবে সংবেদনশীল দাঁত বা মাড়ির সমস্যায় এটি এড়িয়ে চলা উচিত। প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহারের আগে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।
ফলমূল ও ডায়েটের পরিবর্তন
কিছু ফল ও খাবার প্রাকৃতিকভাবে দাঁত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। স্ট্রবেরিতে থাকা ম্যালিক অ্যাসিড দাঁতের উপরিভাগের দাগ দূর করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে আনারসে ‘ব্রোমেলেইন’ নামক এনজাইম থাকে, যা দাঁতের প্লাক ও প্রোটিনের আস্তরণ ভাঙতে সাহায্য করে। আপেল, গাজর বা শসার মতো খাবার চিবিয়ে খেলে মুখের লালার উৎপাদন বাড়ে, যা প্রাকৃতিকভাবে দাঁত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
হোয়াইটেনিং টুথপেস্ট ও মাউথওয়াশ
সাধারণ পেস্টের বদলে হোয়াইটেনিং পেস্ট বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন। এগুলোতে বেকিং সোডা বা হালকা ব্লিচিং থাকে যা ধীরে ধীরে দাঁতের দাগ কমায়।
ডেন্টিস্টের পরামর্শে ঘরে ব্যবহারের পদ্ধতি
ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিয়ে ঘরেই দাঁতের উজ্জ্বলতা বাড়াতে পারেন।
কাস্টম হোয়াইটেনিং ট্রে:
আপনার দাঁতের মাপ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট বিশেষ ট্রে তৈরি করে দেন, যার ভেতরে ব্লিচিং জেল দিয়ে দাঁতে পরতে হয়।

প্রেসক্রিপশন ব্লিচিং জেল
ডেন্টিস্টের পরামর্শে শক্তিশালী পারঅক্সাইডযুক্ত জেল বাড়িতে ব্যবহার করা যায়। এর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন এটি ব্যবহার করতে হয়। তবে ডেন্টিস্টের পরামর্ ছাড়া নিজে থেকে এগুলো ব্যবহার করতে যাবেন না।
ডেন্টাল ক্লিনিকে পেশাদার চিকিৎসা
দন্ত্যচিকিৎসক প্রথমে দাঁত ও মাড়ি পরীক্ষা করে দাঁতের বিবর্ণতার কারণ খুঁজে বের করেন। দাঁতে বাহ্যিক দাগ বা টারটার থাকলে পেশাদারদের মাধ্যমে পরিষ্কার করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ডেন্টিস্ট প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লিনিকে দাঁত সাদা করার চিকিৎসা দিতে পারেন, আবার বাড়িতে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ট্রে ও হোয়াইটেনিং জেল দিতে পারেন। চিকিৎসার সময় মাড়ি সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে চিকিৎসার ফল সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। দাঁতের স্বাভাবিক রং, দাগের ধরন আর দাঁতের স্বাস্থ্য অনুযায়ী ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। খুব কম সময়ে দ্রুত ও স্থায়ী ফলাফল পেতে অনেকে সরাসরি দন্ত্যচিকিৎসকের কাছে যান।
ক্লিনিকস ব্লিচিং: ডেন্টিস্টের তত্ত্বাবধানে শক্তিশালী জেল ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে এই চিকিৎসা করা হয়। এটি দাঁত সাদা করতে বেশ কার্যকরী।
লেজার হোয়াইটেনিং: সবচেয়ে দ্রুত ও আধুনিক পদ্ধতির একটি। লেজার আলোর সাহায্যে দাঁতের ভেতরের দাগগুলো মুছে ফেলা হয়। তবে সংবেদনশীল দাঁতের ক্ষেত্রে এটি একটু সাবধানে করতে হয়।
দাঁত সাদা করলে কি দাঁতের ক্ষতি হয়?
দাঁত সাদা করার উপযুক্ত পদ্ধতি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করলে অনেক ক্ষেত্রে তা নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার বা ভুল পদ্ধতিতে অনেক সময় দাঁতের ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষ করে ঘন ঘন ব্লিচিং পণ্য ব্যবহার করলে দাঁত ও মাড়ির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। দাঁত সাদা করার সময় ব্যথা, শিরশিরে অনুভূতি বা মাড়িতে জ্বালাপোড়া হলে দ্রুত দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেন হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেন্টিস্টের তত্ত্বাবধানে বা নিয়ম মেনে দাঁত সাদা করা হলে তা সাধারণত নিরাপদ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয় নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত হোয়াইটেনিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে বা ভুল পদ্ধতিতে দাঁত পরিষ্কার করলে।
দাঁত সাদা করার পর কিছু সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে। তবে এগুলো সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। যেমন-
দাঁতে শিরশিরানি ভাব: টিথ হোয়াইটেনিংয়ের পর সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটি দেখা যায় তা হলো দাঁতে ঠান্ডা বা গরম লাগা বা শিরশির অনুভূতি। যাদের আগে থেকেই দাঁতে সংবেদনশীলতা আছে বা ব্রাশ করার সময় শিরশির করে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

মাড়িতে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া: অনেক সময় হোয়াইটেনিং ট্রে ঠিকমতো না বসলে বা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্লিচিং এজেন্ট ব্যবহার করলে মাড়িতে জ্বালাভাব হতে পারে।
খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। তবে অতিরিক্ত বা অসচেতনভাবে হোয়াইটেনিং করলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। যেমন-
• দাঁতের এনামেল বা উপরিভাগের সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষয় হয়ে যাওয়া।
• মাড়ি বা দাঁতের গোড়ায় স্থায়ী ক্ষতি।
• মুখের ভেতরের নরম টিস্যুতে কেমিক্যাল বার্ন বা পোড়া দাগ হওয়া।
• ছোপ ছোপ হোয়াইটেনিং, যার ফলে দাঁতের রং অসমান দেখায়।
বিশেষ করে ডেন্টিস্টের পরামর্শ ছাড়া যারা দীর্ঘদিন ধরে পারঅক্সাইড-ভিত্তিক নানা ধরনের পণ্য ব্যবহার করেন, তাদের দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
বেকিং সোডা দিয়ে দাঁত সাদা করা কি নিরাপদ?
বেকিং সোডা দিয়ে দাঁতের উপরের কিছু দাগ পরিষ্কার হতে পারে। তবে রান্নার বেকিং সোডা সরাসরি দাঁতে অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করা বা এর সঙ্গে অন্য রাসায়নিক মেশানো দাঁতের জন্য সবসময় নিরাপদ না-ও হতে পারে।
দাঁতের জন্য তৈরি কিছু টুথপেস্টে বেকিং সোডা থাকতে পারে। এসব পণ্য নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা আর ঘরে তৈরি মিশ্রণ দিয়ে দাঁত ঘষার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই দাঁত সাদা করতে রান্নাঘরের উপকরণ ব্যবহারের পরিবর্তে দাঁতের জন্য তৈরি উপযুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।
লেবু বা ভিনেগার দিয়ে দাঁত সাদা করা যাবে?
লেবু ও ভিনেগারে অ্যাসিড থাকে। এসব উপাদান দাঁতের উপর প্রয়োগ করলে এনামেল ক্ষয় হতে পারে। এনামেল একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা স্বাভাবিকভাবে আগের মতো ফিরে আসে না। এনামেল পাতলা হয়ে গেলে নিচের হলুদাভ ডেন্টিন আরও দৃশ্যমান হতে পারে। এতে দাঁত সাদা হওয়ার পরিবর্তে উল্টো আরও হলুদ দেখাতে পারে। এর সঙ্গে দাঁতে শিরশিরে অনুভূতিও তৈরি হতে পারে।
তাই দাঁত সাদা করার জন্য লেবুর রস, ভিনেগার বা এ ধরনের অ্যাসিডিক উপাদান সরাসরি দাঁতে ব্যবহার করা উচিত না।
কয়লা বা চারকোল টুথপেস্ট দাঁত সাদা করে কি না
চারকোল বা সক্রিয় কয়লাযুক্ত টুথপেস্ট দাঁত সাদা করার জন্য বেশ জনপ্রিয়। তবে এসব পণ্যের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কিছু চারকোলজাত পণ্য বেশি ঘষামাজা করলে দাঁতের উপরিভাগের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

দাঁত সাদা করার জন্য চারকোল পাউডার দিয়ে জোরে ঘষাঘষি করা এড়িয়ে চলুন। এর পরিবর্তে দাঁতের জন্য তৈরি পরীক্ষিত টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারেন।
দাঁতের রং পরিবর্তনের পাশাপাশি নিয়মিত দাঁতের যত্ন নেয়াও জরুরি। আমরা অনেকেই একটি সাধারণ ভুল করি, তা হলো দীর্ঘদিন ধরে এক টুথব্রাশ ব্যবহার করা।
কতদিন পর টুথব্রাশ বদলানো উচিত?
আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস পর টুথব্রাশ বদলানো উচিত। ব্রিসল তার আগেই বেঁকে গেলে, ছড়িয়ে গেলে বা ক্ষয়ে গেলে আরও আগে বদলাতে হবে।
কারণ সময়ের সঙ্গে টুথব্রাশের ব্রিসল নষ্ট হয়ে যায়। তখন আগের মতো কার্যকরভাবে দাঁতের উপর জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করতে পারে না। শিশুদের ক্ষেত্রে আরও দ্রুত ব্রাশ বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে তারা যদি ব্রাশের ওপর বেশি চাপ দেয় বা ব্রিসল দ্রুত ছড়িয়ে যায়।
টুথব্রাশ পরিষ্কার রাখাও খুব জরুরি। প্রতিবার দাঁত মাজার পর পরিষ্কার পানিতে ব্রাশ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর সেটিকে সোজা করে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ব্রাশটি শুকিয়ে যেতে পারে।ভেজা টুথব্রাশ দীর্ঘ সময় বন্ধ পাত্রে রাখা ঠিক না। এতে জীবাণু বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে টুথব্রাশ ভাগাভাগি করা উচিত না। এতে লালা ও জীবাণু এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।
দাঁতের যত্নে যেসব অভ্যাস জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের ছোট কিছু নিয়ম মেনে চললে দাঁত ও মাড়ি দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব। দাঁতের স্বাভাবিক রং ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

দিনে অন্তত দুইবার দাঁত ব্রাশ করুন: ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ও নরম ব্রাশ ব্যবহার করে প্রতিদিন সকালে ও রাতে অন্তত দুই মিনিট ধরে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। এতে দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির সমস্যা কমে।
দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখুন: শুধু ব্রাশ করলেই সব ময়লা দূর হয় না। তাই প্রতিদিন অন্তত একবার ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টারডেন্টাল ক্লিনার ব্যবহার করা ভালো।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: পানি মুখের ভেতর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এটি খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে ভূমিকা রাখে।
চিনি ছাড়া চুইংগাম খেতে পারেন: খাওয়ার পর সুগার-ফ্রি চুইংগাম চিবালে লালা তৈরি বাড়ে। এতে মুখের অ্যাসিড কমে এবং দাঁত সুরক্ষিত থাকে। তবে যাদের ব্রেস বা ক্রাউন আছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি উপযোগী নাও হতে পারে।
অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন: সফট ড্রিংকস, ক্যান্ডি, কেক, বিস্কুট বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার দাঁতের ক্ষতির অন্যতম কারণ। তাই এসব খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস কমান: বারবার স্ন্যাকস খেলে মুখে খাবারের কণা বেশি সময় থাকে। এতে ক্যাভিটির ঝুঁকি বাড়ে।
টক খাবার খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করবেন না: লেবু, ভিনেগার, কোমল পানীয় বা টকজাতীয় খাবার খাওয়ার পর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অপেক্ষা করে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। কারণ তখন দাঁতের উপরিভাগ কিছুটা নরম থাকে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করলে ক্ষতি হতে পারে। এর বদলে পানি দিয়ে কুলি করা ভালো।
নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা করান: দাঁতে শক্ত প্লাক বা টারটার জমলে সাধারণ ব্রাশে তা দূর করা যায় না। প্রয়োজনে দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে পেশাদারভাবে দাঁত পরিষ্কার করান।
ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান বন্ধ করলে নতুন দাগ পড়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি মুখের সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও উপকার হয়।
শুধু দাঁত সাদা করার উদ্দেশ্যে চিকিৎসা নেওয়ার আগে দাঁত ও মাড়ি সুস্থ আছে কি না, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা, প্রতিদিন দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই দাঁতের যত্নের কার্যকর অভ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। দাঁত সাদা করার জন্য লেবু, ভিনেগার বা কয়লার মতো ঘরোয়া উপাদান দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নিন। মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক দাঁতের রং সবার ক্ষেত্রে এক রকম না। তাই অতিরিক্ত সাদা দাঁতের পেছনে না ছুটে দাঁত সুস্থ রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র:
American Dental Association: Whitening
Prevention: The Surprising Reasons Your Teeth Aren’t as White Anymore, According to Dentists
Cary prosthodontics: Teeth Whitening Risks and Side Effects
Cleveland Clinic: Are Teeth Whiteners Safe and Worth Trying?
Mouth Healthy: Natural Teeth Whitening

