ডিপফেক ভয়েস দিয়ে ব্যাংকের ১ হাজার ২৪৮ কোটি হাতিয়ে নিল প্রতারকেরা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কণ্ঠস্বর নকল করে ইতালির সর্ববৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইন্তেসা সানপাওলোর বেসরকারি ব্যাংকিং শাখা ফিদেউরাম থেকে ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো হাতিয়ে নিয়েছে একদল সাইবার প্রতারক। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৪৮ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যাংকটি বিশ্বের ৩৮তম বৃহত্তম।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঘটনাটির বিষয়ে অবগত দুটি কূটনৈতিক ও আর্থিক সূত্র তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। ঘটনার পর জোরদার আইনি ব্যবস্থা নিয়ে চুরি হওয়া অর্থের অর্ধেকের বেশি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রায় ৫০৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার এখনও কোনো হদিশ মেলেনি।
দেশটির সংবাদমাধ্যম কোরিয়েরে দেলা সেরা-তে প্রথম প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নজিরবিহীন এই ডিজিটাল জালিয়াতির সূচনা হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় ফিদেউরামের তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন পাওলো মোলেসিনি।
তিনি ইন্তেসা সানপাওলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কার্লো মেসিনা পরিচয়ধারী এক ব্যক্তির কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বেশ কিছু জরুরি বার্তা পান। ওই বার্তায় একটি বিশেষ বৈদেশিক লেনদেনের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তার অনুরোধ করা হয়।
বার্তা পাঠানোর পরপরই প্রতারকেরা নিজেদের একটি আন্তর্জাতিকভাবে নামকরা আইন প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ অংশীদার বা শীর্ষ আইনজীবী পরিচয়ে ব্যাংকে ফোন করে ওই লেনদেনের বিষয়টি দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেয়।
সূত্র জানিয়েছে, ফোনকারী ব্যক্তি ওই প্রখ্যাত আইনজীবীর কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে উচ্চমানের ডিপ এআই (ডিপফেক ভয়েস) প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন।
সিইওর বার্তা ও আইনজীবীর ফোনের সত্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না কর মোলেসিনি তার ব্যাংকের অর্থ বিভাগকে ধারাবাহিকভাবে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। নির্দেশ পাওয়ার পর ওই বিশাল অংকের অর্থ মূলত চীন ও হংকংয়ের একাধিক বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠায় ব্যাংকের অর্থ বিভাগ।
তবে অর্থ লেনদেনের কিছুদিনের মধ্যেই ফিদেউরামের অভ্যন্তরীণ তদারকি দল আন্তর্জাতিক এই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করে। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
পরবর্তীতে চীন, পর্তুগাল ও ইতালির আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যৌথ সহযোগিতায় প্রায় ৭৪৩ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত ও উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তদন্তকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাকি প্রায় ৫০৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা মুহূর্তেই বিদেশে থাকা একাধিক বেনামি অ্যাকাউন্টের জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডাইভার্ট বা স্থানান্তর করা হয়। পরে সেই অর্থ দিয়ে দ্রুত ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনে নেওয়ার পর থেকে চোরদের আর কোনো সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
ইতালীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চেয়ারম্যান পাওলো মোলেসিনি বা ফিদেউরামের অন্য কোনো কর্মকর্তা সরাসরি এই প্রতারণার ষড়যন্ত্রে জড়িত নন। বিধায় তারা কোনো আইনি তদন্তের আওতায় নেই।
তবে মিলানের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ কম্পিউটার জালিয়াতির প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ইউরোপের বাইরে বসবাসকারী এক বিদেশি নাগরিককে শনাক্ত করে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
এই ঘটনার পরপরই গত মার্চ মাসে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মোলেসিনি। তবে সে সময় ফিদেউরাম তার আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি।
ইতালিতে এআই ব্যবহার করে এমন জালিয়াতি এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালেও এক ইতালীয় মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর হুবহু এআই দিয়ে নকল করে জালিয়াতি করা হয়েছিল। সে সময় ব্যবসায়ী মাসিমো মোরাত্তিকে বিভ্রান্ত করে প্রায় ১০ লাখ ইউরো একটি বিদেশি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। যদিও পরে সেই অর্থ উদ্ধার করে পুলিশ।

