logo

বিশ্ব খাদ্য দিবস/খাবারের প্রতি পাঁচ প্লেটের একটি অপচয় হয়

খাবারের প্রতি পাঁচ প্লেটের একটি অপচয় হয়
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত খাবার। ছবি: এপি

বিশ্বজুড়ে পরিবেশন করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে জমা হয়। এর বার্ষিক পরিমাণ ১০০ কোটি টনের বেশি দাঁড়ায়। অথচ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১৩ জনে একজন, অর্থাৎ ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ অনাহারে কাটিয়েছেন।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবসে এই বৈষম্যের বিষয়টিই বড় করে চোখে পড়ছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। চলতি বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।

বিশ্বে ক্ষুধা ধীরে ধীরে কমছে

টানা তৃতীয় বছরের মতো বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার হার কমেছে। তবে তা এখনো করোনাভাইরাস মহামারির আগের পর্যায়ের চেয়ে বেশি।

জাতিসংঘের বার্ষিক ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করেছেন। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হার ২০২৪ সালের ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালের সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে কম। তবে ২০১৯ সালের তুলনায় এখনও প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত।

কোন অঞ্চলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি

অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সাল নাগাদ আফ্রিকায় আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। অর্থাৎ, মহাদেশটির প্রতি পাঁচজনের একজন অপুষ্টির শিকার। বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই আফ্রিকায় বসবাস করে।

অন্যদিকে, এশিয়ায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ), লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ (৪ দশমিক ৮ শতাংশ) অপুষ্টিতে ভুগছিলেন।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকেও দেশভিত্তিক পরিস্থিতির প্রায় একই চিত্র উঠে এসেছে। এই সূচকে অপুষ্টির পাশাপাশি শিশুদের খর্বতা, কৃশতা ও শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনায় নিয়ে দেশগুলোকে ১০০-এর মধ্যে নম্বর দেওয়া হয়। ৩৫ বা তার বেশি স্কোরকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি দেশই আফ্রিকায় অবস্থিত। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১২২টি দেশের মধ্যে সোমালিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মাদাগাস্কার।

সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে সংঘাত ও তথ্যের ঘাটতির কারণে এসব দেশের স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ কখনোই মানুষের পাতে পৌঁছায় না।

প্রতিবছর কত খাবার অপচয় হয়

খামার থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয়। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল তোলার পর এবং দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এসব খাদ্য নষ্ট হয়। ফল ও সবজির ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

এফএওর হিসাবে, দোকানে পৌঁছানোর আগেই প্রতিবছর যে খাদ্য নষ্ট হয়, তার আর্থিক মূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) হিসাব অনুযায়ী, দোকান, রেস্তোরাঁ ও পরিবারগুলো ভোক্তাদের জন্য সহজলভ্য খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফেলে দেয়। ২০২২ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১০৫ কোটি টন। ২০ টন ধারণক্ষমতার ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাকের সমান এই পরিমাণ খাদ্য।

খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশের জন্য দায়ী পরিবারগুলো। মোট অপচয়ের ৬০ শতাংশই হয় পরিবারে। এরপর রয়েছে রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, যাদের অবদান ২৮ শতাংশ। দোকানের মাধ্যমে অপচয় হয় বাকি ১২ শতাংশ।

কোন দেশে খাদ্য অপচয় বেশি

বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে বছরে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার অপচয় করেন। এর মধ্যে ৭৯ কেজি খাবার অপচয় হয় বাড়িতেই। মোট ১৩২ কেজি খাবারের ওজন প্রায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওজনের সমান।

তবে দেশভেদে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির মতে, উষ্ণ জলবায়ুর দেশগুলোতে বাড়িতে খাদ্য অপচয়ের হার বেশি। এর সম্ভাব্য কারণ, এসব দেশে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া হয় এবং হিমায়ন বা রেফ্রিজারেশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক কম।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মালদ্বীপে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার ফেলে দেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয় হয়।

অন্যদিকে, স্পেনে মাথাপিছু বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তার কম খাবার অপচয় হয়, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর অন্যতম।