শখের ফোন-গয়না কিনতে নবজাতক বিক্রি, চারবার হাতবদলের পর উদ্ধার

নিজের দুই মাসের কোলের সন্তানকে মাত্র প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন বাবা-মা। সেই টাকা দিয়ে কেনা হয় দামি আইফোন ও স্বর্ণের গয়না। অন্যদিকে হাতবদল হতে হতে শিশুটির দাম উঠে যায় সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। রোমহর্ষক এই শিশু পাচারের ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের মহারাষ্ট্রে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা-মাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে উদ্ধার করে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (সিডব্লিউসি) নির্দেশে ‘সাকার’ নামের একটি অনুমোদিত শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠিয়েছে পুলিশ।
মহারাষ্ট্রের মুকুন্দওয়াড়ির এক দম্পতি তাদের নবজাতক শিশুকে বিক্রি করে দিয়েছেন, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে শিশুটির মা বন্দনা কাম্বলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়।
পুলিশ কমিশনার প্রবীণ পাওয়ার জানান, জেরার মুখে চেপে রাখা সত্য গোপন করতে না পেরে গত ২০ সেপ্টেম্বর শিশুটির মা অপহণের অভিযোগ দায়ের করেন। তবে বেশ কয়েকদিন ধরে ঘটনার পেছনের আসল রহস্য ও সূত্রগুলো একে একে মেলাতে শুরু করে। পরে মুকুন্দওয়াড়ি থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারার পাশাপাশি কিশোর বিচার আইনের ধারায় এফআইআর নথিভুক্ত হয়।
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে তদন্তকারীরা জানান, বন্দনা কাম্বলে ও যোগেশ কাম্বলে গত দুই-তিন বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস (লিভ-ইন) করছিলেন। গত ৫ জুলাই সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বন্দনা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে চাননি বন্দনা।
শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য তিনি তার সহকর্মী কৌশল্যা পাওয়ারের সহযোগিতা চান। কৌশল্যা এ বিষয়ে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়ে তার মেয়ে সীমা রেশওয়ালের সঙ্গে বন্দনার পরিচয় করিয়ে দেন। এরপরই শুরু হয় দ্রুত হাতবদলের দরদাম ও লেনদেন।
জোন-২-এর ডেপুটি পুলিশ কমিশনার রত্নাকর নাভালে বলেন, ‘শিশুটির জন্মের প্রায় এক মাসের মাথায় মা-বাবা মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার নগদ রুপির (প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকায়) বিনিময়ে সন্তানকে সীমা রেশওয়ালের হাতে তুলে দেন। এরপর সীমা রেশওয়াল সেই শিশুটিকে তার এক আত্মীয় সঙ্গীতা আভাদের কাছে ২ লাখ ৭০ হাজার রুপির (প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫০ টাকা) বিক্রি করে দেন।’
পরবর্তী সময়ে সঙ্গীতা শিশুটিকে নান্দেদে নিয়ে যান ও তেলেঙ্গানার জগতিয়াল জেলার বাসিন্দা সুরেশ রাজারাম গুন্টুকার কাছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন বলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গুন্টুকা নিজেকে এমবিবিএস ডাক্তার পরিচয়ে দাবি করলেও আসলে তিনি একজন ভুয়া বা হাতুড়ে চিকিৎসক। তিনি পরে একই টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে হায়দরাবাদে বসবাসকারী তার আত্মীয় উমা গঙ্গাধর খটকামের কাছে হস্তান্তর করেন।
এই অনৈতিক লেনদেন থেকে সীমা রেশওয়াল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পান। আর মাধ্যম হিসেবে কাজ করা কৌশল্যা পান ৪০ হাজার টাকা। ওই টাকা দিকে ঋণ পরিশোধ করেন তিনি। অন্যদিকে, জন্মদাতা মা-বাবা সন্তান বিক্রির দেড় লাখ টাকা ৩২ হাজার টাকার একটি দামি স্মার্টফোন এবং বাকি টাকার স্বর্ণের গয়না কেনেন। পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে ওই মোবাইল ও গয়না জব্দ করেছে।
অবশেষে পুলিশি তৎপরতার মুখে রোববার গুন্টুকা ও খটকাম শিশুটিকে মুকুন্দওয়াড়ি থানায় নিয়ে এসে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। মুকুন্দওয়াড়ি থানার পরিদর্শক বিবেক সোনওয়ানে জানান, চার দিন আগে এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত সীমা রেশওয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শিশুটির মা-বাবাসহ বাকি ছয় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। ঘটনাটি কেবল এই কয়েকটি হাতবদলেই সীমাবদ্ধ নাকি এর পেছনে আন্তরাজ্যভিত্তিক বড় কোনো শিশু পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে গভীর তদন্ত চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

