
স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করার পর এবার শ্রেণিকক্ষে ইতালীয় ভাষায় দুর্বল বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে ইতালির সরকার। এ নিয়ে একটি বিতর্কিত বিল অনুমোদন করেছে দেশটির মন্ত্রিসভা। নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৪০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা) জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারের সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরার।
সরকারের এই অধ্যাদেশ পাসের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি লেখেন, ‘নতুন নিয়মে শ্রেণিকক্ষে ইতালীয় ভাষায় অপর্যাপ্ত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের ভাষা শেখার পরিধি বৃদ্ধি এবং স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো শিশু স্কুলে খাপ খাইয়ে কিংবা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে বিষয়টি সামাজিক সেবা সংস্থাকে জানানো হবে। সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের জন্য বিনামূল্যে আয়োজিত ইতালীয় ভাষার ক্লাসে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ হাজার ইউরো (প্রায় ১ হাজার ১৪০ ডলার) পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে হবে।
জরুরি অধ্যাদেশ হওয়ায় এটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ৬০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টে পাস করাতে হবে।
এর আগে গত রোববার মেলোনি তার জাতীয়তাবাদী-রক্ষণশীল দল ‘ব্রাদার্স অফ ইতালি’ (এফডিআই)-এর যুব শাখার এক সমাবেশে এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
এদিকে ইতালির প্রেসিডেন্ট সের্জিও মাত্তারেলা—যিনি এই আইনে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন—ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন কোনো নিয়ম যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকারে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।
তবে শিশু অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, কেবল জাতীয়তা বা ইতালীয় ভাষায় দুর্বলতার কারণে শিশুদের স্কুল বদলাতে বা সহপাঠীদের থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বাধ্য করা হলে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির মতো সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি হবে।
তবে সমালোচনার জবাবে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেন, ভাষাগত দক্ষতার অভাব শিক্ষার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে। তিনি বলেন, সন্তানের শিক্ষাজীবনের সাফল্যের জন্য পাঠ্যক্রমে বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
দেশটির এই শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ইতালির প্রায় ৩৪ হাজার শ্রেণিকক্ষে ৩০ শতাংশের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে তাদের বড় অংশের ওপর এই আইনটি কার্যকর হবে না। কারণ আইনটি নতুন আসা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে; ইতালিতে জন্ম নেওয়া কিংবা এখানকার কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করা শিশুদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
শিক্ষক সংগঠনগুলোও এই পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সম্পদের অভাব রয়েছে বলে সমালোচনা করেছে। স্কুল অধ্যক্ষরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, যেসব এলাকায় অভিবাসী জনসংখ্যা বেশি, সেখানে এই ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে?
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রিন্সিপালসের সভাপতি আন্তোনেল্লো জিয়ানেলি বলেন, ‘শিক্ষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি যৌক্তিক ও যথার্থ, কিন্তু এটিকে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানে রূপ দেওয়া কঠিন।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ইতালির মোট স্কুল-শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ দশমিক ২ শতাংশ ছিল বিদেশি। অন্যদিকে যেসব শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশের বেশি, সেগুলোর সংখ্যা ছিল মোট ক্লাসের ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
এর আগে ২০১০ সালে ইতালির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে ৩০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীর একটি অনানুষ্ঠানিক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও ওই নিয়ম তুলনামূলক কিছুটা নমনীয় ছিল।

