logo

স্বাধীনতা নয়, কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে আলবার্টার ৭৬ শতাংশ ভোট

এপি
এপি
স্বাধীনতা নয়, কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে আলবার্টার ৭৬ শতাংশ ভোট
আলবার্টার এডমন্টনে আলবার্টা লেজিসলেচার বিল্ডিংয়ের বাইরে আয়োজিত কানাডা-সমর্থক এক সমাবেশে একজন অংশগ্রহণকারীকে ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ লেখা সংহতিসূচক প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবি: এপি

কানাডার তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশের অধিকাংশ ভোটার দেশটির অংশ হিসেবে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। এতে প্রদেশটির স্বাধীনতার দাবিতে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ও কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকির মধ্যে জাতীয় ঐক্য জোরদারে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রচেষ্টা গতি পেয়েছে।

ইলেকশনস আলবার্টার অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, ১৪ লাখের বেশি ভোট গণনার পর প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রায় ২৪ শতাংশ ভোটার প্রদেশটির বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন।

তবে গণভোটে সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা হয়নি। বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ভবিষ্যতে আলবার্টা কানাডা থেকে আলাদা হবে কি না, সে বিষয়ে আরেকটি গণভোটের পথ তৈরি হতো।

ফলাফল প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, আলবার্টার বাসিন্দারা ঐক্য ও সহযোগিতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি বলেন, এই ফলাফল কানাডীয়দের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে, বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করতে এবং বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি শক্তি হিসেবে কানাডার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে আলবার্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা বলেছেন, ফলাফল তাদের আন্দোলনের প্রতি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থনের প্রমাণ। স্বাধীনতাপন্থি আন্দোলনের পরিচিত মুখ কিথ উইলসন বলেন, অন্তত এক-চতুর্থাংশ আলবার্টাবাসী মনে করেন, ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে প্রদেশটি আরও ভালো আচরণ পাওয়ার যোগ্য। যদিও তখনও চূড়ান্ত ভোট গণনা নিশ্চিত হয়নি।

আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথও প্রাথমিক ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ কানাডার মধ্যে আরও শক্তিশালী একটি প্রদেশের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

স্মিথ নিজে স্বাধীনতার বিরোধী হলেও তার ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির (ইউসিপি) ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপের মুখে তিনি এই গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার পরে প্রদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।

বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিরোধী ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক উপপ্রিমিয়ার থমাস লুকাশুক বলেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে কানাডা আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

সোমবার ভোটকেন্দ্র খুলতে দেরি হওয়ায় ১০০টিরও বেশি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো হয়। এ কারণে ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব ঘটে।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুতের অধিকারী আলবার্টা কানাডার রক্ষণশীল রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি। প্রদেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের মিলও রয়েছে। অটোয়ায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে তা ব্যাপক স্বাধীনতাপন্থি জনসমর্থনে রূপ নেয়নি।

গণভোটে প্রত্যাশিত ফল না পেলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা দাবি করেছেন, তাদের আন্দোলন একসময়ের প্রান্তিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার আলবার্টার রাজধানী এডমন্টনে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী কার্নি প্রদেশটির বাসিন্দাদের জাতীয় ঐক্যের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এডমন্টনেই তার বেড়ে ওঠা।

আলবার্টার সাবেক প্রিমিয়ার জেসন কেনি বলেন, অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো সাধারণত মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ভোট পেত। তার মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে ক্ষোভ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতাপন্থি আন্দোলনে যোগ দেওয়া কর্মীদের সংগঠিত হতে সহায়তা করে।

এদিকে কানাডার ওপর ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার হুমকিও আলবার্টায় জাতীয় ঐক্যের পক্ষে সমর্থন জোরদারে ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রদেশে লিবারেল দলের প্রধানমন্ত্রীদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে।

এডমন্টনের একটি রেস্তোরাঁয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সমর্থকদের এক সমাবেশে ফলাফল আসতে শুরু করলে উপস্থিত ব্যক্তিরা নীরব হয়ে যান।

আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্টের জেফ রাথ বলেন, তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তার দাবি, গত এক বছরে এই আন্দোলন জনপরিসরের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে এবং স্বাধীনতার সম্ভাব্য সুবিধা সম্পর্কে ভোটারদের সচেতন করেছে।

এর আগে রাথ বলেছিলেন, বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ৩০ শতাংশ ভোট পাওয়াকে তিনি শক্তিশালী ফল হিসেবে বিবেচনা করবেন। তিনি স্মিথকে ইউসিপির নেতৃত্ব থেকে সরানোরও আহ্বান জানান। তার মতে, দলটি ভেঙে গিয়ে নতুন একটি স্বাধীনতাপন্থী দলের জন্ম হতে পারে।

বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া কয়েকজন ভোটার বলেছেন, ফেডারেল সরকার দীর্ঘদিন ধরে আলবার্টার সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করে আসছে।

সোমবার ওয়েইনরাইটে ভোট দেওয়া ডাস্টিন ডেগেনহার্ট প্রদেশটিকে ‘উপনিবেশের’ মতো বিবেচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তার দাবি, অটোয়া আলবার্টার সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে, অথচ এর বিপরীতে প্রদেশটি যথেষ্ট সুবিধা পাচ্ছে না।

অন্যদিকে, এডমন্টনের ৫৯ বছর বয়সী বাসিন্দা ডেভ মালকা গণভোটের সময় ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, আরেকটি গণভোট হবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করা যেত।

ট্রাম্পের হুমকির প্রসঙ্গ টেনে মালকা বলেন, কানাডার অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়ানোর পরিবর্তে এখন জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী করা উচিত।