ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে থাকা আইজেনকোটের পরিচয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার অবস্থান কী

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক প্রধান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘ইয়াশার’ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত ৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পেয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যাবে।
সামরিক জীবন থেকে রাজনীতিতে
১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া গাদি আইজেনকোটের বাবা-মা মরক্কো থেকে ইসরায়েলে অভিবাসী হয়েছিলেন। তিবেরিয়াস ও ইলাত শহরে বেড়ে ওঠা আইজেনকোট ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি পদাতিক ব্রিগেডে যোগ দেন।
দীর্ঘ চার দশকের সামরিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গোলানি ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পশ্চিম তীরের সামরিক কার্যক্রম, সেনাবাহিনীর অপারেশন বিভাগ এবং উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবেও কাজ করেন।
২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২১তম চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আইজেনকোট। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চার দশকের সম্পর্কের ইতি টানেন তিনি।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে দূরত্ব ও রাজনৈতিক বিরোধ
সেনাপ্রধান থাকাকালে সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিতি পান আইজেনকোট। ২০১৬ সালে হেবরনে এক আহত ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনা এলোর আজারিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চালানোর পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। এ ঘটনায় রাজনৈতিক চাপ থাকলেও সামরিক বাহিনীর নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন সাবেক এই সেনাপ্রধান।
২০২২ সালে বেনি গান্টজের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টিতে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আইজেনকোট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জরুরি সরকারে যোগ দেন তিনি। যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।
তবে গাজা যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে ২০২৪ সালের জুনে বেনি গান্টজের সঙ্গে তিনিও সরকার থেকে পদত্যাগ করেন।
এরপর নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু করেন আইজেনকোট। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী গাজা যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগও তোলেন তিনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিজের রাজনৈতিক দল ‘ইয়াশার’ প্রতিষ্ঠা করেন।
গাজা যুদ্ধে ব্যক্তিগত শোক
গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা আইজেনকোটের ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল মেইর আইজেনকোট নিহত হন। একই যুদ্ধে তার দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান।
পরিবারের সদস্যদের হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। বরং গাজা যুদ্ধের কৌশল, সরকারের জবাবদিহি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে আরও সোচ্চার হন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আইজেনকোটের অবস্থান
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে আইজেনকোটের অবস্থানকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার বলা কঠিন। তিনি মূলত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সামরিক নীতির সমর্থক। গাজায় হামাসের শাসনের অবসান চান এবং ৭ অক্টোবরের হামলার পর ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করেছেন।
তবে পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং সেখানে নতুন বসতি স্থাপনের কিছু উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন তিনি।
তার রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম দাবি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। নেতানিয়াহু সরকার এ ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ ছাড়া বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সমান নিয়ম কার্যকরের পক্ষে আইজেনকোট। বিশেষ করে অতি-ধর্মীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের তরুণদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিশেষ ছাড়ের বিরোধিতা করছেন তিনি।
আইজেনকোটের সামরিক অতীত নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তার সঙ্গে ‘দাহিয়ে ডকট্রিন’-এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ব্যাপক সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সেনাপ্রধান থাকাকালেও গাজা ও পশ্চিম তীরে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ফলে নেতানিয়াহুর পরিবর্তে আইজেনকোট ক্ষমতায় এলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তানীতি কতটা বদলাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকার গঠনে কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে বিরোধী পক্ষও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে ২৭টি আসন পেয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন জোটের মোট আসনসংখ্যা ৫৩। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য বিরোধী জোটের আসন ৪৮টি।
এই পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন বা তাদের সমর্থন নেওয়ার বিষয়ে আইজেনকোটের সম্ভাব্য মিত্রদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা কিংবা নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও নানা রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে রয়েছে।
ফলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও আইজেনকোটকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্য কোনো নেতাকে একই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এরপরও কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে ইসরায়েলে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদল এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে জোটের সমীকরণ, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং সরকার গঠনের আলোচনা শেষ পর্যন্ত দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

