চীনে কমেছে স্বর্ণালংকারের ব্যবহার, বিশ্বের বৃহত্তম বাজার এখন ভারত

চীনে স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে স্বর্ণের অলংকারের চাহিদা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কমে ১৩২ টনে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বাজার হিসেবে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিচ্ছেন চীনের গয়না ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে ভারত স্বর্ণালংকারের বিশ্বের বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) চীনবিষয়ক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াং লিশিন বলেছেন, স্বর্ণের দামের অস্থিরতার মধ্যেও চীনের গয়না প্রস্তুতকারকেরা উন্নত কারিগরি ও নকশার মাধ্যমে বিদেশের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ খুঁজছেন।
সম্প্রতি হংকংয়ে অনুষ্ঠিত জুয়েলারি অ্যান্ড জেম ওয়ার্ল্ড মেলায় ভারত ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ওয়াং লিশিনের মতে, স্বর্ণের দামের ওঠানামার পাশাপাশি নতুন ধরনের অলংকারের প্রতি এসব বাজারের ক্রেতাদের আগ্রহ চীনা উৎপাদকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘হার্ড পিওর গোল্ড’ নামে একটি নতুন ধরনের অলংকার তৈরিতে দক্ষতা অর্জন করেছে। বিশেষ কারিগরি পদ্ধতিতে তৈরি এসব অলংকার তুলনামূলক পাতলা ও শক্ত হয়, অথচ এতে অতিরিক্ত সোনা ব্যবহার করতে হয় না।
ওয়াং লিশিন বলেন, অতীতে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতারা মূলত কম দামে প্রচলিত নকশার গয়না তৈরির জন্য চীনা উৎপাদকদের কাছে আসতেন। এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই হবে না; পণ্যে নতুন নকশা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বাড়তি মূল্য যোগ করতে হবে।
চীন গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনে সোনার অলংকারের ব্যবহার কমে ১৩২ টনে দাঁড়িয়েছে। এক বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৩৪ শতাংশ কম। তবে একই সময়ে বিনিয়োগের জন্য সোনার বার ও কয়েনের চাহিদা ২৮ শতাংশ বেড়ে ৩৩৯ টনে পৌঁছেছে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারত স্বর্ণালংকারের বিশ্বের বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বৈশ্বিক সোনার গয়নার চাহিদার ২৭ শতাংশ ছিল ভারতের বাজারে।
ওয়াং লিশিন বলেন, উচ্চ সোনার দাম ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণের প্রভাবে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার বর্তমানে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ শিগগিরই কমার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চীনা উৎপাদকদের যোগাযোগ বাড়াতে বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিল মধ্যপ্রাচ্যের বড় পাইকারি ক্রেতাদের শেনঝেনে বিভিন্ন কারখানা ও প্রদর্শনীকেন্দ্র পরিদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। ভারতের বড় খুচরা বিক্রেতাদেরও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে নিয়ে গিয়ে সম্ভাব্য অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
শেনঝেনভিত্তিক গয়না প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইউয়েহাও জুয়েলারি মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের ক্রেতাদের সংখ্যা বাড়ার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার থেকেও আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ডিং ও পণ্য বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্যারন ওয়েং।
জাপানের বাজারের কথা মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ নামে দুটি গয়নার সিরিজও বাজারে এনেছে। এতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় স্বর্ণকে কালো রূপ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও বাড়াতে পারে—এমন সম্ভাবনা থাকলেও স্বর্ণের দাম তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণের বাজারকে সমর্থন দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াং লিশিনের মতে, চীনা গয়না উৎপাদকদের উচ্চ কাঁচামাল ব্যয়ের দিকে শুধু নজর না দিয়ে উৎপাদন প্রযুক্তি ও নকশার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গত পাঁচ বছরে চীনের গয়না উৎপাদকদের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
