রাখাইনে আরাকান আর্মির তীব্র প্রতিরোধের মুখে পিছু হটল সেনাবাহিনী

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে জান্তা বাহিনীর পরিচালিত বহুল আলোচিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ৪৯২৬’ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে বড় আকারের স্থল, নৌ ও আকাশ হামলা চালানো হয়। কিন্তু আরাকান আর্মির তীব্র প্রতিরোধের মুখে জান্তা বাহিনীকে ব্যাপক হতাহতের শিকার হয়ে পিছু হটতে হয়েছে।
সম্মুখসারির সূত্র ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্যাপক বিমান হামলা, ড্রোন ও ভারী কামানের সহায়তা নিয়ে এগোতে গিয়েও জান্তা বাহিনী কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি। উল্টো অনেক এলাকায় নিজেদের নিহত ও আহত সেনাদের ফেলে রেখে বিশৃঙ্খলভাবে তাদের পিছু হটতে হয়েছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে সিত্তেওয়ে অঞ্চলে তিনটি সেনাদল মিন চাউং সেতু, ওয়ারবো দ্বীপ ও শ্বে মিন গান নৌঘাঁটি থেকে পোন্নাগিউনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তবে ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর আরাকান আর্মি তাদের আক্রমণ পুরোপুরি প্রতিহত করে। স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে দুটি সেনাদল পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে কেবল ওয়ারবো দ্বীপ থেকে আসা একটি দল লড়াইয়ে টিকে থাকলেও সেখানে সংঘাত চরম রূপ নিয়েছে।
একই সময়ে কিয়াউকফিউ অঞ্চলের টাউং মাও উ নৌঘাঁটি থেকে সানের দিকে অগ্রসর হওয়া অপর একটি সেনাদল আরাকান আর্মির অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। প্রায় তিন দিনের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়ে দলটি সেখান থেকেও পিছু হটে।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী-কে সিত্তেওয়ের এক বাসিন্দা জানান, ‘প্রথম দিকে দিনরাত বিকট বিস্ফোরণ ও গোলাগুলি চলেছে। লড়াই এতটাই ভয়াবহ ছিল যে জান্তা বাহিনী তাদের নিহত ও আহত সৈন্যদেরও উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারেনি।’
মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেয়ে জান্তা সরকার এখন রাখাইনের সাধারণ আবাসিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বিমান হামলা ও অনবরত গোলাবর্ষণের কারণে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
পকটাউ ও পোন্নাগিউন টাউনশিপে অনবরত বোমা হামলায় ঐতিহাসিক প্যাগোডা, স্থানীয় স্কুল এবং বহু বসতবাড়ি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্যাগোডা ও কৃষিজমিতে অনবরত কামানের গোলাবর্ষণ করায় হাজার হাজার গ্রামবাসী নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এক স্থানীয় কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্ষার বৃষ্টির মতো চারদিক থেকে কামানের গোলা বর্ষণ করা হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে খেতখামার ফেলে আমাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে।’
রাখাইন রাজ্যের ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ টাউনশিপ ও প্রতিবেশী চিন রাজ্যের পালেটওয়ার নিয়ন্ত্রণ ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। খোয়ানো এলাকাগুলো উদ্ধার করতে মাগওয়ে, বাগো এবং আয়েয়্যারওয়াদি অঞ্চল থেকে নতুন করে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হলেও তা মাঠপর্যায়ে সামরিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারছে না।
সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ‘অপারেশন ৪৯২৬’ ছিল মূলত রাখাইনে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের চূড়ান্ত চেষ্টা, যা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কার্যকর কোনো কৌশলগত অগ্রগতি না পাওয়ায় সেনাশাসকদের নিয়ন্ত্রণ এখন চরম সংকটের মুখোমুখি।

