জেলেনস্কিকে সরিয়ে ইউক্রেনে নতুন নেতৃত্ব আনার আহ্বান ট্রাম্পের

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতায় পৌঁছানোর যথেষ্ট উদ্যোগ নেননি জেলেনস্কি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির জন্যও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেছেন তিনি।
শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। টেনেসি অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করার আগে তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নেতা প্রয়োজন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, জেলেনস্কির পক্ষে একাধিকবার চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও তিনি তা কাজে লাগাননি। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের নতুন নেতৃত্ব খোঁজা উচিত বলে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যকে স্বাগত জানাল রাশিয়া
জেলেনস্কির নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক আলোচক ও ক্রেমলিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন। তার মতে, ট্রাম্পসহ অনেকেই মনে করেন, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেশি গুরুত্ব দেবে।
রাশিয়ার ডিজেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটন-কিয়েভ বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সমঝোতার পর ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এল। তবে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন জেলেনস্কি। ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান বাড়তে পারে।
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এ ছাড়া নভেম্বর মাসে আরও পাঁচ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলেনস্কি এ উদ্যোগকে পুতিনের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, রাশিয়াকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে না। বরং এতে এমন একটি যুদ্ধের অর্থায়ন সহজ হতে পারে, যা ইতিমধ্যে বন্ধ হওয়া উচিত।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে পারস্পরিক ভিত্তিতে উত্তেজনা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তার মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য জেলেনস্কিকে দায়ী করলেন ট্রাম্প
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়েছে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ; দুটিই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠেছে। তবে ট্রাম্প বিশেষভাবে জেলেনস্কির কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করছেন।
এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার দাবি, এসব স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, জেলেনস্কির কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে সমস্যা তৈরি করছে এবং এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও খামারিদের ওপরও পড়ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ডিজেল নিয়ে বিশ্ববাজারে সংকট থাকায় ইউক্রেনকে এ ধরনের জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা না চালানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে হামলা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ
এদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের জনসমর্থন কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা, মস্কো থেকে জ্বালানি কেনার পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি--সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন, কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বেড়েছে।
বিশেষ করে জেলেনস্কির নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
