পৃথিবীর মহাকর্ষে আটকা নতুন ‘মিনি চাঁদ’, কতদিন পর্যন্ত থাকবে কক্ষপথে

পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। তবে এবার সাময়িক সময়ের জন্য পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়েছে আরেকটি মহাকাশ শিলা। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ‘২০২৬ কিউকিউ৮’। আকারে ছোট হওয়ায় একে বলা হচ্ছে পৃথিবীর নতুন ‘মিনি চাঁদ’। ধারণা করা হচ্ছে, বড়দিনের সময় পর্যন্ত এটি পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান করবে। এরপর ২০২৭ সালের শুরুতে আবার গভীর মহাকাশে ফিরে যাবে।
মহাকাশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম স্পেস ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্টে প্রথম শনাক্ত করা হয় এই মহাকাশ শিলাটিকে। বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, গত এপ্রিল মাসে এটি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মধ্যে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারও এ আবিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করেছে।
গবেষকদের মতে, কিউকিউ৮ পৃথিবীর স্থায়ী উপগ্রহ নয়। এটি একটি অস্থায়ী উপগ্রহ, যা পৃথিবীর মহাকর্ষের কারণে কিছু সময়ের জন্য আমাদের গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে। বিজ্ঞানীরা এর কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, শিলাটি সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ৩৫০ দিনেরও বেশি সময় নেয়, যা পৃথিবীর এক বছরের কাছাকাছি।
প্রায় প্রতি ১০ বছর পরপর শিলাটি পৃথিবীর কাছাকাছি আসে। তবে এবার তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি চলে আসায় পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে এটি সাময়িকভাবে আটকা পড়েছে।
পৃথিবী থেকে কত দূরে এই মিনি চাঁদ?
মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে আসার সময় কিউকিউ৮-এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার মাইল। অর্থাৎ পৃথিবী ও চাঁদের গড় দূরত্বের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মাইল বেশি দূরে।
মহাকাশ শিলাটির ব্যাস আনুমানিক ৬ ফুট বা ২ মিটার। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি কখনো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলেও ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই পুড়ে ধ্বংস হয়ে যেত। সে ক্ষেত্রে আকাশে উজ্জ্বল অগ্নিগোলকের মতো দৃশ্য তৈরি হতে পারত।
আগেও পৃথিবীর অস্থায়ী চাঁদ ছিল
পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে ছোট ছোট গ্রহাণু বা মহাকাশ শিলা সাময়িকভাবে আটকা পড়ার ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে এমন অস্থায়ী উপগ্রহ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে।
গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেকোনো সময় পৃথিবীর চারপাশে একাধিক ক্ষুদ্র অস্থায়ী উপগ্রহ থাকতে পারে। এগুলোর কিছু চাঁদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাথরের টুকরাও হতে পারে।
কিউকিউ৮ আকারে সাধারণ মিনি চাঁদের তুলনায় বড়। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত একটি মডেলভিত্তিক গবেষণায় অস্থায়ী উপগ্রহের গড় আকার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার বা ৩০ ইঞ্চি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বস্তুর গড় স্থায়িত্বকাল প্রায় নয় মাস হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, প্রায় ১০ ফুট বা ৩ মিটার ব্যাসের কোনো মহাকাশ শিলা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়লে সেটি ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত অস্থায়ী উপগ্রহ হিসেবে থাকতে পারে। তবে ছোট আকারের শিলাগুলো সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব কাটিয়ে মহাশূন্যে চলে যায়।
গবেষণায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মিনি চাঁদ?
কিউকিউ৮-এর মতো ক্ষুদ্র মহাকাশ বস্তু বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সুযোগ তৈরি করে। এগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে গ্রহাণুর গঠন, সৌরজগতের গতিবিদ্যা এবং পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা উন্নত টেলিস্কোপ ও বিশেষ কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে কিউকিউ৮-এর গতিপথ বিশ্লেষণ করছেন। এসব মডেলের মাধ্যমে শিলাটি কীভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রভাবে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে আকারে ছোট হওয়ায় কিউকিউ৮-কে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। এর উপস্থিতি শনাক্ত ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী টেলিস্কোপ এবং উন্নত প্রযুক্তি।
সব মিলিয়ে, পৃথিবীর এই সাময়িক মহাকাশ অতিথি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বড়দিনের সময় পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবে থাকার পর ২০২৭ সালের শুরুতে এটি আবার মহাশূন্যের পথে পাড়ি জমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
