নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিপর্যয়ে ব্রাজিলেরে বলসোনারো পরিবার, ভবিষ্যৎ কী

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো গৃহবন্দি, তার স্ত্রী মিশেল বলসোনারো সিনেটর, দুই ছেলে কংগ্রেসের সদস্য এবং আরেক ছেলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসন শুরু করেছেন। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ব্রাজিলের প্রভাবশালী বলসোনারো পরিবার এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন জাইর বলসোনারো। এরপর ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় অনেকেই মনে করেছিলেন, ব্রাজিলের রাজনীতিতে বলসোনারো পরিবারের প্রভাব কমে আসবে।
কিন্তু পরিবারের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেমে থাকেনি। জাইরের ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় উঠে আসেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেন।
তবে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার ভোটে প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন ফ্লাভিও। এরপর দুর্নীতি ও অর্থ পাচরের অভিযোগের মধ্যে তিনি ব্রাজিল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে যান।
পরিবারের প্রধান জাইর বলসোনারো: গৃহবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট
৭১ বছর বয়সী জাইর বলসোনারো আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ‘ঈশ্বর, মাতৃভূমি ও পরিবার’ এই আদর্শের পক্ষে অবস্থানের কারণে ব্রাজিলের রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। তবে সমকামীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য এবং নারীদের হেয় করার বক্তব্যের কারণে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে লুলা দা সিলভাকে ক্ষমতা গ্রহণে বাধা দেওয়ার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বর্তমানে তিনি গৃহবন্দি রয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে বাবাকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ফ্লাভিও। কিন্তু তার পরাজয়ের পর জাইরের মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফ্লাভিও: মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি গড়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন
জাইর বলসোনারোর পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ফ্লাভিওর বয়স ৪৫ বছর। বাবার কট্টর রক্ষণশীল সমর্থকদের ধরে রাখার পাশাপাশি তুলনামূলক মধ্যপন্থী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি নিজেকে বাবার চেয়ে কিছুটা সংযত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রথম দফার ভোটে ভালো ফল করার পর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে তাকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন তিনি।
এদিকে, বাবাকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ নামের একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রের অর্থায়ন ঘিরে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগসহ একাধিক ঘটনায় ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। বিতর্কিত ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারো চলচ্চিত্রটির অর্থায়ন করেছিলেন।
ভোরকারোর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা প্রথমে অস্বীকার করেছিলেন ফ্লাভিও। কিন্তু ব্যাংকারকে বকেয়া অর্থ পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে তার দেওয়া একটি অডিও রেকর্ডিং ফাঁস হওয়ার পর ফ্লাভিওকে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়।
ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট চেয়েছিল। তবে বুধবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছান।
মিশেল বলসোনারো: সৎমা থেকে সিনেটর
৪৪ বছর বয়সী মিশেল বলসোনারো সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইরের স্ত্রী। স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের অবস্থানও গড়ে তুলেছেন তিনি। ধর্মপ্রাণ ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান মিশেল ব্রাসিলিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
দারিদ্র্যের মধ্যে এবং মাদক পাচারকারীদের প্রভাবযুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা মিশেল কংগ্রেসে চাকরির সুযোগ পাওয়ার পর জাইর বলসোনারোর সঙ্গে পরিচিত হন।
তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সৎছেলে ফ্লাভিওর সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। মিশেল তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।
ফেব্রুয়ারিতে জাইরের আরেক ছেলে এদুয়ার্দো বলসোনারো ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণায় যথেষ্ট সমর্থন না দেওয়ার জন্য মিশেলের সমালোচনা করেন। জবাবে মিশেল স্বামীর জন্য ভাজা কলা তৈরির একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ঘটনাটিকে এদুয়ার্দোর প্রতি কটাক্ষ হিসেবে দেখা হয়। তাকে বিদ্রূপ করে ‘ছোট কলা’ নামেও ডাকা হয়।
এরপর এদুয়ার্দো এক সমর্থকের পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, তিনি ও ফ্লাভিও যখন ‘দেশকে উদ্ধার’ করতে ব্যস্ত, তখন মিশেলের ভাজা কলা তৈরি করাই উচিত।
এদুয়ার্দো: অস্ত্রের প্রচার ও ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ
৪২ বছর বয়সী এদুয়ার্দো ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন রক্ষণশীল রাজনৈতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
ব্রাজিল সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় তিনি ব্রাজিলের আইনপ্রণেতা হিসেবে নিজের আসন হারান।
ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির করার ঘটনায় জুনে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে চার বছর দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জাইর বলসোনারোর ছেলেদের মধ্যে এদুয়ার্দোকে সবচেয়ে কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রাজিলে অস্ত্র আইন শিথিল করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি নিজের কেনা রাইফেল ও আগ্নেয়াস্ত্রের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের ‘পিটবুল’ কার্লোস এবং অন্য সদস্যরা
জাইর বলসোনারো তার দ্বিতীয় ছেলে ৪৩ বছর বয়সী কার্লোসকে পরিবারের ‘পিটবুল’ বলে ডাকেন। বাবার উদ্যোগেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন কার্লোস।
নিজের সাবেক স্ত্রী রোজেরিয়ার বিরুদ্ধে রিও ডি জেনেইরো নগর পরিষদের নির্বাচনে কার্লোসকে প্রার্থী করেছিলেন জাইর। এর আগের বছর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। কার্লোস ওই নির্বাচনে জয়ী হন। পরে তিনি পুরো ঘটনাটিকে মানসিকভাবে আঘাতকর বলে বর্ণনা করেন।
পরবর্তী সময়ে বাবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিষয়ক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কার্লোস। চলতি বছর দক্ষিণাঞ্চলীয় সান্তা কাতারিনা রাজ্য থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
জাইর বলসোনারোর আরেক ছেলে ২৮ বছর বয়সী জাইর রেনানও একই রাজ্য থেকে আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে, জাইরের ৬২ বছর বয়সী ভাই রেনাতো বলসোনারো একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তিনিও সাও পাওলো রাজ্য থেকে ডেপুটি নির্বাচিত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে বলসোনারো পরিবারের সদস্যরা ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। তবে সাবেক প্রেসিডেন্টের কারাদণ্ড, ফ্লাভিওর নির্বাচনী পরাজয়, এদুয়ার্দোর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
