সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় কারাগারে ভারতীয় যুবক, শঙ্কায় পরিবার

মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। ওই মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে আলোচনার মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক যুবকের সৌদি কারাগারে বন্দি থাকার তথ্য। অভিযোগ, সৌদি আরবে আলোড়ন ফেলা ওই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ছিলেন তিনি।
কারাবন্দি যুবকের নাম সাহাবুদ্দিন শেখ (৩২)। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রানীনগর এলাকার বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় শ্রমিক সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সাল থেকে সৌদি আরবের কারাগারে রুদ্ধদ্বারে দিন কাটাচ্ছেন বলে তাঁর পরিবার ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সাহাবুদ্দিনের পরিবার ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত আট বছর ধরে সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন সাহাবুদ্দিন। মক্কার এক চত্বরে ডিউটিতে থাকাকালে দুই বাংলাদেশি যুবকের একটি আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের দৃশ্য দৃশ্যধারণের ঘটনা ঘটে।
সাহাবুদ্দিনের স্বজনদের দাবি, ঘটনার দিন সেখানে উপস্থিত এক পাকিস্তানি সহকর্মী সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোনটি চেয়ে নিয়ে ওই ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে নিছক ‘মজা’ করার উদ্দেশ্যে সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া (আপলোড) হয়। কিন্তু পবিত্র নগরী মক্কার মতো সংবেদনশীল এলাকায় ধারণ করা এই ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে উঠলে নড়েচড়ে বসে সৌদি নিরাপত্তা সংস্থা।
ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন ও সামাজিক অবমাননার অভিযোগে সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে রিয়াদ পুলিশ।
সাহাবুদ্দিনের মা কোহিনুর বিবি বলেন,“আমার ছেলে বুঝতে পারেনি একটা সামান্য ভিডিওর ফল কতটা মারাত্মক হতে পারে। ও তো কোনো অন্যায় অপরাধে সরাসরি যুক্ত ছিল না। ওটা স্রেফ একটা বোকামি ছিল,” মুর্শিদাবাদের বলরামপুর গ্রাম থেকে ফোনে কথা বলার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ কথা বলেন
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সরকারি বিবৃতিতে জানায়, পবিত্র স্থানের মার্যাদা ও শালীনতা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের দণ্ড মক্কা অঞ্চলে কার্যকর করা হয়েছে। সৌদি আইন অনুযায়ী, কড়া গোপনীয়তা বজায় রেখে এই রায় কার্যকর হওয়ায় ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের খবর মুর্শিদাবাদে পৌঁছাতেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাহাবুদ্দিনের পরিবার। মধ্যপ্রাচ্যের চরম রক্ষণশীল আইন এবং কঠোর বিচার ব্যবস্থার কারণে সাহাবুদ্দিনের পরিণতি নিয়ে মারাত্মক শঙ্কায় পড়েছে তাঁর স্বজনেরা।
কোহিনুর বিবি জানান, সাহাবুদ্দিনই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর পাঠানো টাকায় চলত পুরো সংসার। গত দেড় বছর ধরে ছেলে কারাবন্দি থাকায় আর্থিক অনটনের পাশাপাশি আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্যও হারিয়েছেন তাঁরা।
সাহাবুদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং তাঁকে আইনি সহায়তা দিতে ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে তাঁর পরিবার। তবে রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বা সৌদি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সাহাবুদ্দিনের বর্তমান মামলার অবস্থা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা নির্দিষ্ট ধারার শাস্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সৌদি আরবে কঠোর সাইবার অপরাধ আইন রয়েছে, যেখানে সামাজিক মাধ্যমে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা ভিডিও প্রকাশ বা প্রচার করাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাহাবুদ্দিনের মামলার সুনির্দিষ্ট নথি হাতে না আসা পর্যন্ত তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কিছু বলা কঠিন।
মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম বলরামপুরে এখন একটাই অপেক্ষা,কখন সরকারি কোনো আশ্বাসের খবর আসবে আর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে।